Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

ব্রাজিল কেন ছুটছে ইউরোপীয় কোচের আশায় ?

আহসান হাবীব সুমন/ক্রীড়ালোকঃ

কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয়ার দায় মাথায় নিয়ে সরে গেছেন ব্রাজিলের কোচ তিতে । এখনও জাতীয় দলের জন্য নতুন কোচ নিয়োগ দেয় নি ব্রাজিলের ফুটবল ফেডারেশন (সিবিএফ) । তবে আগামীর জন্য ‘সিবিএফ’ খুঁজছে একজন ইউরোপিয়ান কোচ । কিন্তু কেন ?

অতীতে ব্রাজিল জাতীয় দলের ডাগ আউটে কখনও ভিনদেশী কোচ দেখা যায় নি , ইউরোপিয়ান কিংবা অন্য মহাদেশের দুরের কথা । ব্রাজিল পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতেছে নিজের দেশের কোচের অধীনে । সর্বশেষ ২০০২ সালে ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছেন লুইস ফিলিপ্পো স্কোলারি । আবার সেই স্কোলারির অধীনেই নিজ দেশের মাটিতে ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ সেমি ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে ঐতিহাসিক হারের লজ্জায় ডোবে ব্রাজিল ।

স্কোলারির পর দায়িত্ব পাওয়া তিতের অধীনে দুইটি বিশ্বকাপ খেলেছে ব্রাজিল । দুইবারই পেরুতে পারেনি কোয়ার্টারের বাঁধা । যদিও তিতে ব্রাজিলের হয়ে ব্যর্থ হয়েছেন , এমন বলা যাবে না । তিতের অধীনে ব্রাজিল ৮১ ম্যাচে জয় পেয়েছে ৬০টি , ড্র ১৫ আর ৬টি হারের মুখ দেখেছে । সাফল্যের হার ৭৪.৭ । যা বিশ্বের যে কোন কোচের মানদণ্ডে দারুণ সাফল্য । তিতের অধীনে ব্রাজিল কোপা আমেরিকাও জিতেছে । কিন্তু সমস্যা হচ্ছে , ব্রাজিলের ফুটবলে বিশ্বকাপ সাফল্য মুল কথা । যে কারণে তিতের দুইটি বিশ্বকাপ ব্যর্থতাই আলোচনা-সমালোচনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে । তাঁকে সরে যেতে হয়েছে ব্রাজিলের দায়িত্ব থেকে ।

তিতে সরে যাওয়ার পর ব্রাজিল খুঁজছে নতুন কোচ । তবে এবার আর দেশী নয় , বরং ইউরোপ থেকে কোচ আমদানি করতে চায় ব্রাজিল । আসলে গত পাঁচ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ব্যর্থতা ইউরোপিয়ান দলগুলোর বিপক্ষে । চারবার ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনালে হেরেছে ফ্রান্স , হল্যান্ড , বেলজিয়াম আর ক্রোয়েশিয়ার কাছে । ২০১৪ সালে সেমিতে হার ছিল জার্মানির বিপক্ষে । ব্রাজিলের চিন্তা-চেতনায় এখন ইউরোপিয়ানদের সাথে কুলিয়ে উঠতে না পারার সমাধান খুঁজে পাওয়া । ইউরোপিয়ানদের টেকনিক্যাল ফুটবলের জবাব তারা দিতে চায় ইউরোপিয়ান কোচদের কাছে দীক্ষা নিয়ে ।

ইতোমধ্যে ব্রাজিলের পরবর্তী কোচ হিসেবে জিনেদিন জিদান , পেপে গার্দিওলা , হোসে মারিনিও আর লুইস এনরিকের নাম বলছেন কেউ কেউ । এমনকি কার্লো আঞ্চেলত্তির নামও শোনা গেছে । কিন্তু গার্দিওলা আর আঞ্চেলোত্তিরা ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে ব্যস্ত । এনরিকে আছেন স্পেনের দায়িত্বে । একমাত্র জিদান কোন দলের সাথে জড়িয়ে নেই । তাহলে কি জিদানই হচ্ছেন ব্রাজিলের পরবর্তী কোচ ?

জানা গেছে , সিবিএফ সভাপতি এডনাল্ডো রদ্রিগেজ আগামী মাসে ইউরোপ সফরে আসছেন । তিনি ব্রাজিলের সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা কোচদের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করবেন । অবশ্য ব্রাজিল জাতীয় দলে বিদেশি, বিশেষ করে ইউরোপীয় কোচ নিয়োগ দেওয়ার খবর বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। ব্রাজিলের কিংবদন্তি অনেক খেলোয়াড়ই জাতীয় দলের কোচ হিসেবে কোনো ব্রাজিলীয়কেই দেখতে চান। ২০০২ সালে ব্রাজিলকে সর্বশেষ বিশ্বকাপ জেতানো কোচ লুইস ফেলিপে স্কলারির চাওয়াও একই রকম। কিন্তু সিবিএফ’র ভাবনা অন্যরকম ।

ব্রাজিলের কোচদের সমস্যা হচ্ছে , ইউরোপে তাদের পদচারনা কম । স্কোলারি , জিকো , ভ্যান্ডারলেই লুক্সেমবার্গো আর অ্যাবেল ব্রাগা ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপে কাজ করা ব্রাজিলিয়ান কোচের দেখা মেলা ভার । জিকো আর ব্রাগা তো ইউরোপের শীর্ষ কোন ক্লাব বা দেশের হয়েও কাজ করেন নি । এমনকি , ল্যাটিনের অন্য কোন দেশের বড় ক্লাবেও ব্রাজিলের কোচ হাতেগোনা । তুলনায় আর্জেন্টিনা দিয়াগী সিমিওনে , মৌরিসিও পচেত্তনি , মার্সেলো বিয়েলসা , জর্জ সাম্পাওলি , জেরার্ডো মার্টিনো , রিকার্ডো গ্যারেকা আর হেক্টর কুপাররা অনেক বেশী কার্যকর । তারা কেউ ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবকে কোচিং করিয়েছেন বা করাচ্ছেন । আবার কেউ ল্যাটিন বা অন্য কোন মহাদেশের দেশকে নিয়ে এসেছেন বিশ্বকাপের মঞ্চে । অর্থাৎ ব্রাজিলের চেয়ে আর্জেন্টিনার কোচদের আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব আর সাফল্য অনেক বেশী । সারা বিশ্বে ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, জার্মানির পরে আর্জেন্টিনার কোচরা কোচিং করিয়ে যাচ্ছেন যথেষ্ট সুনামের সঙ্গে। কারণ তাদের দেশে জাতীয়ভাবে কোচ তৈরি করার কর্মশালা হাতে নেওয়া হয়েছিল সেই ১৯৬৫ সালে। আর তাদের দেশে এসে বিদেশিরা কোচিং করানো শুরু করেছিলেন ১৯১১ সাল থেকে। অথচ ব্রাজিলের কোচরা কোচিং করানোর ক্ষেত্রে বিশ্বের সেরা দশের মধ্যেও নেই।‌

সঙ্গত কারণেই ব্রাজিলকে ঝুঁকতে হচ্ছে ভিনদেশী কোচের দিকে । এই মুহূর্তে ব্রাজিলের নিজ দেশের কোচদের মধ্যে ফ্লুমিনিসের ফার্নান্দো দিনিজ , ফ্লেমিঙ্গোর রেনাতো গাউচোরা শীর্ষে রয়েছেন । তারা ঘরোয়া আর মহাদেশীয় ক্লাব আসরে বেশ সফল । কিন্তু নিজ দেশেও তারা একক আধিপত্যে নেই । কারনা সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাজিলের ঘরোয়া ফুটবলে জর্জ হেসুসের মতো বিদেশী কোচ দারুণ সফল । এই পর্তুগীজ কোচ ফ্লেমিঙ্গোকে ২০১৯ সালে ব্রাজিলিয়ান লিগে ও কোপা লিবার্তাদোরেসের শিরোপা জিতিয়েছেন । ফ্ল্যামেঙ্গোকে ২০১৯ বিশ্ব ক্লাব কাপে রানার্সআপও করেছিলেন। তিনি ব্রাজিলিয়ান ক্লাব দলে প্রথম বিদেশি কোচ ছিলেন যিনি আন্তর্জাতিক শিরোপা (কোপা লিবার্তাদোরেস) জিতিয়েছিলেন এবং ব্রাজিলের ঘরোয়া লিগের শিরোপা জিতিয়েছিলেন দ্বিতীয় বিদেশি হিসেবে ৬০ বছর পর।

সাম্প্রতিককালে ব্রাজিলের লীগে দেখা গেছে পর্তুগিজ কোচ রিকার্ডো সা পিন্টো , আবেইল ফেরেইরাদের । যারা সফলতাও পাচ্ছেন । যে কারণে ব্রাজিলের ফুটবলে বিদেশী আর ইউরোপের কোচদের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে । ব্রাজিলে প্রতিভাসম্পন্ন ফুটবলারের অভাব কখনোই ছিল না । এখনও নেই । নেইমার জুনিয়র , ভিনিসিয়াস জুনিয়র , রাফিনিয়া , গ্যাব্রিয়েল হেসুস , মার্তিনেল্লি , রিচার্লিশন আর ফির্মিনিওরা সবাই খেলছেন ইউরোপের বড় বড় ক্লাবে ।, দলকে এনে দিচ্ছেন সাফল্য । কিন্তু তাদের কেন ব্রাজিলের জাতীয় দলে একসুত্রে গাঁথা যাচ্ছে না ?

‘সিবিএফ’ সম্ভবত মনে করছে , ইউরোপে টানা খেলে ব্রাজিলিয়ানরা নিজেদের ফুটবলের স্বকীয়তা হারাচ্ছে । তাদের কৌশল উন্মোচিত হয়ে পড়ছে ইউরোপের দলগুলোর কাছে । নেইমার আর ভিনিদের সাথে সারাবছর খেলা ইউরোপের ফুটবলার আর কোচরা সহজেই তাদের দেয়ার কৌশল বের করে ফেলছে । কিন্তু খেলোয়াড়দের তো ইউরোপে খেলা বন্ধ করা সম্ভব না । তাই ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা’ তোলার মতো ইউরোপের দলগুলোর বিরুদ্ধে ইউরোপিয়ান কোচদের কৌশল কাজে লাগাতে চায় ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ফেডারেশন । সেই কারণেই তারা হন্যে হয়ে খুঁজছে একজন ইউরোপিয়ান কোচ ।

আহাস/ক্রী/০০৫