Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

একজন ফুটবলপুত্র অন্যজন ফিফাপুত্র

ক্রীড়ালোক প্রতিবেদকঃ

বিশ্ব ফুটবলে ব্যক্তিগত লড়াইয়ে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো আর লিওনেল মেসির দ্বৈরথ ইতিহাসের সেরা । প্রায় দেড় যুগ ধরে বিশ্ব ফুটবল শাসন করেছেন দুই মহানায়ক । দুইজনেই রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ে ফুটবলের ইতিহাসকে করেছেন সমৃদ্ধ । ইতোমধ্যেই তারা জায়গা করে নিয়েছেন ইতিহাসের সেরা ফুটবলারদের তালিকায় ।

একজন ক্রিশিয়ানো রোনালদোকে বলা হয় আধুনিক ফুটবলের সম্রাট । যার ছিল না প্রকৃতিপদত্ত সেরা প্রতিভা । কিন্তু কঠিন অধ্যাবসায় , অনুশীলন আর হার না মানার মানসিকতা তাঁকে করেছে জগতশ্রেষ্ঠ । অন্যদিকে , লিওনেল মেসিকে বলা হয় ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভা । ছোটবেলা থেকে দুরারোগ্য ব্যাধিকে জয় করে তিনি ফুটবলার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন । তবে তাঁর সেই প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে ফুটবলের বিশ্ব শাসক সংস্থা ‘ফিফা’ থেকে শুরু করে ফুটবল মাফিয়াদের হাত । যাদের প্রত্যক্ষ মদদে মেসি প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলারে ।

শুরুতেই আসা যাক মেসির কথায় । একটা সময় পর্যন্ত আন্তর্জাতিক শিরোপার জন্য হাহাকার করছিলেন । ২০২১ সালের পাতানো কোপায় সেই না পাওয়ার বেদনা ভুলেছেন । আর ২০২২ সালে তো ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে জগন্যতম কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েছে ফিফা বিশ্বকাপ । আসরে একের পর এক পেনাল্টির অন্যায্য সুবিধা , অবধারিত কার্ড থেকে বাঁচিয়ে আর পাতানো ম্যাচে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠাসহ সবই করা হয়েছে আর্জেন্টিনার পক্ষে । যার ফলাফল মেসির হাতে উঠেছে বিশ্বকাপ ।

মেসি গোটা ক্যারিয়ারে জিতেছেন সাতটি ব্যালন ডি’অর আর একটি ফিফা বর্ষসেরা । সেই ফিফা বর্ষসেরা নিয়েও আছে কেলেঙ্কারি । ২০১৯ সালে মেসিকে দেয়া ফিফা এ্যাওয়ার্ডে চুরির অভিযোগ এসেছে সরাসরি । মিশরের অধিনায়ক আহমেদ এল মোহামাদি , সুদানের কোচ দ্রাভকো লুগারিসিচ , নিকারাগুয়ার দলের অধিনায়ক হুয়ান বারেরা , মিশরীয় কোচ সাকি ঘারিব অভিযোগ করেন ফিফা বর্ষসেরায় তারা কেউই মেসিকে ভোট দেন নি । কিন্তু তাদের ভোট দেখানো হয়েছে মেসিকে ।

২০২১ সালে মেসিকে ব্যালন দেয়া ছিল আরও লজ্জার । অথচ সেই মৌসুমে রবার্ট লেভেন্ডস্কি ছিলেন দুর্দান্ত । ৪১ গোল করে ভেঙেছেন বুন্দেসলিগায় এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের কিংবদন্তি গার্ড মুলারের ৪৯ বছরের রেকর্ড। ব্যালনের হিসেব পর্যন্ত করেছিলেন বায়ার্নের হয়ে ২০ ম্যাচ খেলে করেছেন ২৫ গোল ।

অন্যদিকে একই মৌসুমে ক্লাব ফুটবলে তেমন কিছুই জিততে পারেননি মেসি । বার্সেলোনার জার্সিতে ভুলে যাওয়ার মতো একটি মৌসুমই কাটিয়েছেন আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড। পরবর্তীতে পিএসজিতে নাম লেখালেও চোট–টোট মিলিয়ে অনেকটা সময়ই ছিলেন মাঠের বাইরে। তবে আর্জেন্টিনার হয়ে কাটিয়েছেন শিরোপা–খরা। প্রথমবারের মতো জাতীয় দলের হয়ে জিতেছেন বড় কোনো শিরোপা , কোপা আমেরিকা । মেসি নিজেও মনে করেন, আর্জেন্টিনার হয়ে ২০২১ কোপা আমেরিকা জয়ই তাঁকে এনে দিয়েছে ক্যারিয়ারের সপ্তম ব্যালন ডি’অর।

শুধুমাত্র কোপার মতো একটি টুর্নামেন্ট জয়ে মেসির হাতে ব্যালন তুলে দেয়ার প্রতিবাদ করেছে জার্মানসহ নানা দেশের ফুটবল বিশেষজ্ঞ । তারা প্রকাশ্যেই সমালোচনা করেছেন মেসিকে ব্যালন দেয়ার হাস্যকর সিদ্ধান্তের । ১৯৯০ সালে জার্মানির বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক লোথার ম্যাথিউজ বলেছিলেন , ‘ লিওনেল মেসি এবং মনোনীত বাকি সব খেলোয়াড়ের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, লেভানডফস্কির চেয়ে বড় দাবিদার আর কেউই নয়। ফ্রান্স ফুটবল গত বছর পুরস্কারটি দেয়নি। তবে শুধু শিরোপার হিসাব করা হলেও ২০২০ সালে লেভানডফস্কি ব্যালন ডি’অর জয়ে ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী।’

ম্যাথিউজ বলেছিলেন , ‘ ‘এমনকি শুধু ২০২১ সালকেও যদি বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলেও বাকিদের চেয়ে এগিয়ে সে। সে গার্ড মুলারের রেকর্ড ভেঙেছে। সব ধরনের প্রতিযোগিতারই সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় আছে সে। জাতীয় আর আন্তর্জাতিকভাবে বাকি সবাইকে সে পেছনে ফেলেছে।’

অন্যদিকে , ২০১৮ সালে একটি নিশ্চিত ব্যালন দেয়া হয় নি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে । তিনি রিয়েলের হয়ে টানা তৃতীয় উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জেতেন । ছিলেন ইউরোপের সেরা ক্লাব আসরে ১৫ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা । জিতেছিলেন জাতীয় দলের হয়ে উয়েফা নেশন্স লীগ । সেমি ফাইনালে করেছিলেন হ্যাট্রিক । এমনকি রাশিয়া বিশ্বকাপে ছিল তাঁর চার গোল । কিন্তু এসব কিছুই ব্যালনে বিবেচিত হয় নি । ব্যালন তুলে দেয়া হয় বিশ্বকাপ রানার্স আপ ক্রোয়েশিয়ার অধিনায়ক লুকা মদ্রিচের হাতে ।

এগুলো খুব সাম্প্রতিক আর ছোট উদাহরণ । মেসিকে এগিয়ে রাখার প্রয়াসে রোনালদোকে বঞ্চিত রাখার প্রক্রিয়া চলেছে গত এক দশক ধরেই । কিন্তু তবু ঠেকানো যায় নি রোনালদোকে । তিনি ঠিকই হয়েছেন ক্লাব আর বিশ্ব ফুটবলে সেরা গোলদাতা । তিনি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ইতিহাসের সেরা গোলদাতা আর সেরা খেলোয়াড় । বিশ্বের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে ইউরোপের সেরা তিন লীগে পেয়েছেন বর্ষসেরা ফুটবলারের সম্মান । করেছেন ইউরোপের সেরা তিন ক্লাবে শতাধিক গোল । যা ইতিহাসের অন্য কোন ফুটবলারের নেই ।

ইতমধ্যেই মেসি পরিচিতি পেয়েছেন ফিফা-পুত্র হিসেবে । যাকে লালন করে আসছে খোদ ফিফা । চেষ্টা করা হয়েছে ফুটবলের ‘রাজা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেবার । কিন্তু পাতানো বিশ্বকাপ জয়ের পরেও মেসি রয়ে গেছেন ফুটবলের ‘নকল-রাজা’ হিসেবে । অন্যদিকে সততার সাথে ফুটবল খেলে আসা রোনালদোকে দুহাত উজাড় করে দিয়েছে ফুটবল-দেবতা । বঞ্চিত করেন নি । বরং সকল প্রতিকুলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে রোনালদোকে জিতিয়ে চলেছেন ফুটবল-দেবতা । তা করবেনই বা না কেন ? সত্যিকার ফুটবল পুত্র যে রোনালদোই ।

আহাস/ক্রী/০০২