Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

সোনালী ইতিহাস উরুগুয়ের সম্বল

আহসান হাবীব সুমন/ক্রীড়ালোকঃ

বিশ্বকাপের কুলীন , কিন্ত বর্তমান সামর্থ্যে ‘মধ্যবিত্ত’ উরুগুয়ে । যারা হারিয়েছে অতীতের দাপট আর জৌলুশ । কিন্তু রয়ে গেছে আভিজাত্যের গর্ব ।  সেটাই  মাঝেমাঝে চোখ রাঙায় । কাতার বিশ্বকাপেও একদা বিশ্বসেরা উরুগুয়ে আসছে নিজেদের ‘হারানো গৌরব’ সঙ্গী করে ।

ফুটবলে উরুগুয়ের যাত্রা শুরুঃ

উরুগুয়ে ১৯০২ সাল

উরুগুয়ে ১৯০২ সাল

ল্যাটিন আমেরিকায় আর্জেন্টিনার পরেই উরুগুয়ে আর ব্রাজিলের ফুটবল অভিযাত্রা শুরু । তাদের প্রথম ম্যাচটিও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে । ১৯০১ সালের ১৬ মে সেই ম্যাচ অবশ্য স্বাগতিক উরুগুয়ে ২-৩ গোলে । সেই ম্যাচে উরুগুয়ের পক্ষে প্রথম গোলটি করেন বলিভার কেসপেডস । যদিও সেই ম্যাচটি ফিফা’র অফিসিয়াল স্বীকৃতি পায় নি । কারণ ম্যাচটির আয়োজক উরুগুয়ের ফুটবল ফেডারেশন ছিল না ।

পরের বছরেই উরুগুয়ে ফেডারেশনের আয়োজনে আবারও মন্টেভিডিওতে মুখোমুখি হয় দুই দেশ । এবার উরুগুয়ের পরাজয় ছিল আরও শোচনীয় । তারা হেরে যায় ০-৬ গোলে ।

উরুগুয়ের ফুটবল অভিষেক পরাজয় দিয়ে শুরু হলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যে তারা পরিনত হয় বিশ্বশক্তিতে । জয় করে ১৯২৪ আর ১৯২৮ সালের অলিম্পিক গেমসের সোনার পদক ।

অভিষেক বিশ্বকাপ এবং সাফল্যঃ

প্রথম  বিশ্বকাপজয়ী উরুগুয়ে দল

প্রথম বিশ্বকাপজয়ী উরুগুয়ে দল 

হঠাৎই ১৯৩০ সালে ঘোষণা আসে , ১৯৩২ সালের অলিম্পিক থেকে ফুটবল খেলাটি আর থাকবে না! ফুটবলের প্রতি অসীম ভালবাসা থেকে তৎকালীন ফিফার প্রেসিডেন্ট জুলে রিমে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন , কেবল ফুটবল খেলাকে নিয়ে বিশ্বকাপ আয়োজন করার । তিনি ফুটবল  খেলুড়ে  দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানান। এভাবেই জন্ম নেয় বিশ্বকাপ ফুটবল। আর প্রথম আয়োজক দেশ হিসেবে সম্মান পায় দক্ষিণ আমেরিকার ক্ষুদ্রতম দেশ উরুগুয়ে। উপলক্ষ্য  ছিল,  শেষ দুই ফুটবল অলিম্পিকে উরুগুয়ে  চ্যাম্পিয়ন  আর দেশটির ছিল শততম স্বাধীনতা বার্ষিকী!

ব্যাস! উরুগুয়ে হয়ে গেলো প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবলের স্বাগতিক দেশ।ইউরোপের  বেশীরভাগ দেশ  আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে খেলতে যেতে রাজি ছিল না কোন ভাবেই । শেষ পর্যন্ত ইউরোপ থেকে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, যুগোস্লাভিয়া, রোমানিয়া অংশ নেয় । দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আসে সাতটি দেশ । আর উত্তর আমেরিকা থেকে মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র। প্রথম বিশ্বকাপে আরেকটি ব্যতিক্রম ছিল,  বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটিই একমাত্র বিশ্বকাপ যেটিতে কোন বাছাই পর্ব ছিল না।

১৯৩০ সালের ১৩ জুলাই ১৩ দেশ নিয়ে মাঠে গড়ায় ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ । যদিও উরুগুয়ে মাঠে নেমেছিল ১৮ জুলাই । প্রথম ম্যাচে হেক্টর ক্যাস্ট্রোর গোলে স্বাগতিকরা জয় পায় পেরুর বিপক্ষে । দ্বিতীয় ম্যাচে উরুগুয়ের কাছে পাত্তা পায় নি ইউরোপের প্রতিনিধি রোমানিয়া । উরুগুয়ে জয় পায় ৪-০ গোলে ।

সেমি ফাইনালে উরুগুয়ে ৬-১ গোলে হারায় যুগোস্লোভিয়াকে । ম্যাচে উরুগুয়ের পক্ষে প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাট্রিক করেন হোসে পেদ্রো চিয়া । অন্যদিকে , গ্রুপ আর সেমির বাঁধা পেরিয়ে ফাইনালে উঠে আসে উরুগুয়ের পুরনো প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা ।

প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনাল নিয়ে আছে মজার ঘটনা । সেই সময় কমিটি কোন ‘বল’ দিত না । তাই ফাইনালে তর্ক বেঁধে যায় , কোন দলের বল দিয়ে খেলা হবে । শেষ পর্যন্ত অফিশিয়ালরা দেন অভিনব সিদ্ধান্ত । দুই অর্ধে দুই দলের আনা ‘চামড়ার গোলক’ দিয়ে খেলাটি শেষ হয় ।  মন্টেভিডিওর সেন্টানিরিও স্টেডিয়ামের  ৯৩০০০ দর্শককে স্বাক্ষী রেখে ৪-২ গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জিতে নেয় উরুগুয়ে । পাকা জায়গা করে নেয় ইতিহাসে । 

আসরে পাঁচ গোল করা পেদ্রো চিয়া ছিলেন দ্বিতীয় সেরা গোলদাতা । আট গোল করে সেরার সম্মান পান আর্জেন্টিনার গুলের্মো স্টাবিলে । তিনি বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে প্রথম হ্যাট্রিকের মালিক । করেছিলেন গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে মেক্সিকোর বিপক্ষে ।

১৯৫০ সালে উরুগুয়ের চমকঃ

উরুগুয়ে ১৯৫০  সালে জিতেছিল বিশ্বকাপ

উরুগুয়ে ১৯৫০ সালে জিতেছিল বিশ্বকাপ 

উরুগুয়ে পরবর্তী দুইটি বিশ্বকাপে অংশ নেয় নি । দ্বিতীয়বারের মতো তারা বিশ্বকাপ ফুটবলে উপস্থিত হয় ১৯৫০ সালে । ততদিনে টানা দুইটি বিশ্বকাপ জয় করা হয়ে গেছে ইটালির । আর ফুটবলের শক্তি হিসেবে আর্জেন্টিনা , ব্রাজিলসহ অন্যরা দ্রুত উঠে আসছে । ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ আয়োজক ছিল ব্রাজিল । তারাই ছিল আসরের হট ফেভারিট ।

ব্রাজিলের মাটিতেও তিন মহাদেশ থেকে ১৩ দেশ অংশ নেয় । প্রথম দুই পর্ব ছিল গ্রুপ ভিত্তিক । ছিল না কোন ফাইনালের ব্যবস্থা ।চার গ্রুপের সেরা দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় পরবর্তী রবিন লীগ । পয়েন্ট তালিকার শীর্ষ দলের কাছে তুলে দেয়া হয় বিশ্বকাপ । 

মজার ব্যাপার হচ্ছে , উরুগুয়ের গ্রুপে ছিল একটি দল । বলিভয়া । যাদের ৮-০ গোলে উড়িয়ে উরুগুয়ে উঠে আসে পরবর্তী রাউন্ডে । সেই ম্যাচে উরুগুয়ের জার্সিতে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় হ্যাট্রিক করেন অস্কার মিগুয়েজ । অন্যদিকে , ব্রাজিলের গ্রুপে ছিল চার দল !

দ্বিতীয় রাউন্ডের শেষ ম্যাচে উরুগুয়ের মুখোমুখি হবার আগে টানা পাঁচ ম্যাচ অপরাজিত ছিল ব্রাজিল । গোল করেছিল ২১টি ! আর উরুগুয়ে  দ্বিতীয় রাউন্ডে স্পেনের সাথে ড্র করে এবং কোনমতে হারায় সুইডেনকে । ব্রাজিল দ্বিতীয় রাউন্ডের দুই ম্যাচে ১৩ গোল দেয় স্পেন আর সুইডেনকে । উরুগুয়ের বিপক্ষে শেষ ম্যাচ ড্র করলেও সেলেসাওরা জিতবে বিশ্বকাপ । এমন পরিস্থিতিতে বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয় দুই দল ।

ব্রাজিল খুব কাছে গিয়েও হাতছাড়া করে শিরোপা। ওই হারের ব্যথা এখনও বুকে বয়ে বেড়ায় ব্রাজিলিয়ানরা, যা পরিচিত’ মারাকানা ট্র্যাজেডি’ নামে। ম্যাচে উরুগুয়ে ২-১ গোলে হারায় ব্রাজিলকে। অথচ ৪৭ মিনিটে আলবিনো ফ্রিয়াকার গোলে এগিয়ে গিয়েছিল ব্রাজিল । কিন্তু বিধিবাম । শেষ পর্যন্ত ৩ ম্যাচে ৫ পয়েন্ট নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় প্রথম বিশ্বকাপের বিজয়ী উরুগুয়ে। ১১ মিনিট বাকি থাকতে ঘিগিয়ার লক্ষ্যভেদী শটে মারাকানায় উপস্থিত হাজার হাজার ব্রাজিলিয়ানের হৃদয়ে শুরু হয় রক্তক্ষরণ। 

হিসেব করলে ইটালির পর টানা দুইটি বিশ্বকাপ জিতেছে উরুগুয়েই । কারণ ইটালির জয়ের দুই বিশ্বকাপে তারা অংশই নেয় নি । নিজেদের অংশ নেয়া প্রথম দুইটি বিশ্বকাপ ট্রফি তারাই জিতেছে ।পরে ব্রাজিল ১৯৫৮ আর ১৯৬২ সালে ইটালির রেকর্ড  ছুঁয়েছিল । 

উরুগুয়ের বিশ্বকাপ পরিসংখ্যানঃ

বল পায়ে অস্কার মিগুয়েজ

বল পায়ে অস্কার মিগুয়েজ

২০১৮ সাল অবধি উরুগুয়ে ১৩টি বিশ্বকাপের মুল পর্বে খেলেছে । যার মধ্যে শিরোপা জিতেছে দুইবার । ১৯৫৪,১৯৭০ আর ২০১০ সালে পেয়েছে চতুর্থ স্থান । ১৯৬৬ সালের পর সর্বশেষ ২০১৮ সালে খেলেছে কোয়ার্টার ফাইনাল । তিনবার বিদায় নিতে হয়েছে গ্রুপ পর্ব থেকে । নক আউট পর্ব থেকে বিদায়ের ঘটনা ঘটিয়েছে আরও তিনবার ।

বিশ্বকাপে মোট ৫৬ ম্যাচে উরুগুয়ের জয় ২৪টি । ড্র ১২টি আর পরাজয় ২০টি । গোল করেছে ৮৭টি । আর হজম করেছে ৭৪টি ।

বিশ্বকাপে উত্রুগুয়ের পক্ষে সবচেয়ে বেশী ১৬ ম্যাচ খেলেছেন ফার্নান্দো মুসলেরা । তিনি ২০১০-১৮ পর্যন্ত তিনটি বিশ্বকাপে উরুগুয়ের প্রতিনিধিত্ব করেছেন । ২০২২ সালে  তিনি খেলবেন  তার চতুর্থ বিশ্বকাপ । এই কিপার অপেক্ষায় আছেন পেদ্রো রোচার রেকর্ড ছোঁয়ার । অবশ্য বিশ্বকাপে ১৪ ম্যাচ খেলা এডিসন কাভানি আর ১৩ ম্যাচ খেলা লুইস সুয়ারেজও সেই রেকর্ডে ভাগ বসাবেন ।

উরুগুয়ের পক্ষে সর্বোচ্চ আটটি বিশ্বকাপ গোল অস্কার মিগুয়েজের । সাত গোল নিয়ে সেই রেকর্ড ভাঙার জন্য তৈরি উরুগুয়ের সর্বকালের  সেরা স্ট্রাইকার সুয়ারেজ

উরুগুয়ের আন্তর্জাতিক সাফল্যঃ

উরুগুয়ে দুইটি করে বিশ্বকাপ আর অলিম্পিক ছাড়াও জিতেছে সর্বোচ্চ ১৫টি কোপা আমেরিকা । উরুগুয়ে  যখন অলিম্পিক সোনার পদক জিতেছে , সেই সময়ে খেলা হত জাতীয় দলের মধ্যে । এখনকার মতো অনূর্ধ্ব-২৩ দল ভিত্তিক না ।

১৯৮০ সালে লা সেলেস্তেরা জিতেছে ‘ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন গোল্ড কাপ’ । ইটালি , পশ্চিম জার্মানি , হল্যান্ড , ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা খেলেছিল সেই আসরে । ফাইনালে সক্রেটিসদের  ব্রাজিলকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল উরুগুয়ে । গ্রুপ পর্বে হারিয়েছিল হল্যান্ড আর ইটালিকে । সেই আসরে আর্জেন্টিনার দিয়াগো ম্যারাডোনাও খেলেছিলেন । প্রতিটা দেশ নিয়ে গিয়েছিল তাদের সেরা স্কোয়াড ।তাই এটি উরুগুয়ের ফুটবলের অনেক বড় সাফল্য । যা অনেকেই জানে না । 

এছাড়া দক্ষিণ আমেরিকায় কোপা লিপটনের মতো ছোট শিরোপা আছে ৫৫টি । যার বেশীরভাগ আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে । সব মিলিয়ে বিশ্বফুটবলে সবচেয়ে বেশী ট্রফিজয়ী দলটি কিন্তু উরুগুয়ে ! 

উরুগুয়ের কিংবদন্তীঃ

হুয়ান আলবার্তো শাফিনো

হুয়ান আলবার্তো শাফিনো

হুয়ান আলবার্তো শাফিনোকে দেয়া হয় উরুগুয়ের সর্বকালের সেরা ফুটবলারের মর্যাদা । ১৯৪৬-৫৪ খেলেছেন জাতীয় দলে । বিশ্বযুদ্ধের কারণে খেলতে পেরেছেন মাত্র ২১ ম্যাচ । করেছেন ৯ গোল । বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এসি মিলান আর রোমার মতো দলে খেলে ইটালি কাঁপিয়েছেন । তিনিই উরুগুয়ের প্রথম আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়া ফুটবলার । জিতেছেন ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ । আসরের দ্বিতীয় সেরা ফুটবলারও তিনি হয়েছিলেন । তাঁকে IFFHS উরুগুয়ের বিংশ শতাব্দীর সেরা ফুটবলার নির্বাচিত করেছে । ল্যাটিন আমেরিকার বিংশ শতাব্দীর সেরার তালিকায় তার অবস্থান ষষ্ঠ ।

হেক্টর স্কারোনি

হেক্টর স্কারোনি

হেক্টর স্কারোনি উরুগুয়ের আরেক কিংবদন্তী । ক্লাব ফুটবলে ৩৬৯ ম্যাচে তাঁর গোলের সংখ্যা ৩২১টি । ফরোয়ার্ড হিসেবে অসাধারণ প্রতিভার স্কারোনি ক্লাব ফুটবলে জিতেছেন ২১টি শিরোপা । নিজ দেশের ন্যাশিওনাল ছাড়াও খেলেছেন স্পেনের বার্সেলোনা , ইটালির ইন্টার মিলান আর পালের্মো ক্লাবে । ১৯৩০ সালে উরুগুয়ের প্রথম বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক । সারা বিশ্বেরও । জিতেছেন দুইটি অলিম্পিক সোনা । দেশের হয়ে ৫১ ম্যাচে তাঁর আন্তর্জাতিক গোলের সংখ্যা ৩১টি ।

সাম্প্রতিক সময়ের দিয়াগো ফোরলান উরুগুয়ের সর্বকালের সেরাদের অন্যতম । দেশের হয়ে সপ্তম সর্বোচ্চ ১১২ ম্যাচ খেলেছেন । করেছেন তৃতীয় সর্বোচ্চ  ৩৬ গোল । ক্লাব ফুটবলে নিজের দেশ ছাড়াও ইংল্যান্ড , স্পেন , ইটালি এমনকি ভারতের আইএসএলে খেলেছেন । ক্লাব ট্রফি ৯টি । ২০১১ সালে উরুগুয়ের হয়ে কোপা আমেরিকা জিতেছেন । ২০১০ সালের বিশ্বকাপে জিতেছেন গোল্ডেন-বল । দুইবার স্পেনের পিচিচি আর ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শ্যু জিতেছেন । ২০১০ সালের ফিফা বিশ্বকাপের সেরা গোলদাতার গোল্ডেন-বুট জিতেছেন ।

এছাড়া এঞ্জো ফ্রান্সিস কোলি , ওবদুইলো ভারেলা, লুইস কাবিলাদের নাম লেখা আছে উরুগুয়ের ফুটবল ইতিহাসে ।

রোড টু কাতারঃ

উরুগুয়ে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ  টিকেট পেয়েছে  ল্যাটিনের তৃতীয় সেরা দল হিসেবে । ১৮ ম্যাচে তাদের পয়েন্ট ছিল ২৮ । ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পরেই অবস্থান । বাছাই পর্বে উরুগুয়ে যেমন ২২ গোল দিয়েছে , খেয়েছেও সমান সংখ্যক গোল ।

বাছাই পর্বে উরুগুয়ের লুইস সুয়ারেজ আট গোল করে ছিলেন ব্রাজিলিয়ান নেইমারের সাথে দ্বিতীয় সর্বাধিক গোলের যৌথ মালিক । এছাড়া জিওর্জিয়ান বেনেদেত্তি করেছেন পাঁচ গোল ।

বর্তমান সময়ের বড় তারকাঃ

উরুগুয়ের হয়ে তিনটি বিশ্বকাপ খেলা লুইস সুয়ারেজ শুধু বর্তমান সময়ের না , সর্বকালের সেরাদের কাতারে উঠে গেছেন । অনেকেই তাঁকে সময়ের সেরা ‘নাম্বার নাইন’ হিসেবে বিবেচিত করে । রেকর্ডও সেই কথা বলে । দেশের হয়ে ১৩৪ ম্যাচে সর্বোচ্চ ৬৮ গোলের মালিক তিনি । ক্লাব ফুটবলেও ৭৮৬ ম্যাচে ৪৬০ গোল তাঁর । খেলেছেন ইউরোপের আয়াক্স , বার্সেলোনা , লিভারপুল আর এথলেটিকো মাদ্রিদের মতো বড় বড় ক্লাবে । ২০২২ সালে ফিরে গেছেন নিজের  ক্লাব ন্যাশিওনালে । যদিও ক্লাব এবং জাতীয় দলের হয়ে দুইবার ‘কামড়-কাণ্ডে’ নিন্দিত এবং নিষিদ্ধ থেকেছেন । আবার ২০১০ সালে ঘানার নিশ্চিত গোল বাঁচাতে কোয়ার্টার ফাইনালে হ্যান্ডবল করে লাল কার্ড দেখেছেন । এতে ঘানা আর অন্যদের কাছে ‘ভিলেন’ হলেও সুয়ারেজ নিজের দেশে নায়ক বনে যান !

সুয়ারেজ ক্লাব ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন্স লীগসহ জিতেছেন ২১টি শিরোপা । ২০১১ সালে দেশকে এনে দিয়েছেন কোপা আমেরিকা ট্রফি । সেই আসরের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন । উরুগুয়ের হারানো গৌরব অনেকটাই ফিরে এসেছে সুয়ারেজ আর ফোরলানদের সময়ে । হয়েছেন হল্যান্ড , ইংল্যান্ড আর স্পেনের লীগে সেরা গোলদাতা । জিতেছেন ইউরোপের সেরা গোলদাতার ‘গোল্ডেন শ্যু’ ।

দলের এডিসন কাভানিও অনেক বড় তারকা আর অন্যতম অভিজ্ঞ । দেশের হয়ে তৃতীয় সর্বোচ্চ ১৩৩ ম্যাচ খেলেছেন । করেছেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫৮ গোল । পালের্মো , পিএসজি , ম্যান ইউ হয়ে এখন আছেন স্পেনের বড় দল ভ্যালেন্সিয়ায় । চলতি মৌসুমে করেছেন সাত ম্যাচে চার গোল । সেরা সময় কাটিয়েছেন পিএসজিতে । সাত মৌসুমে জিতেছেন ২১টি ঘরোয়া শিরোপা । পিএসজির হয়ে খেলেছেন চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনাল । ক্লাবের সবচেয়ে বেশী ২০০ গোলের মালিক কাভানি । ক্লাব ক্যারিয়ারে গোলের সংখ্যা ৩৭৬টি ।

উরুগুয়ের জার্সিতে সবচেয়ে বেশী ১৫৯ ম্যাচ খেলেছেন দিয়াগো গোডিন । এছাড়া ৩৬ বছরের গোলরক্ষক ফার্নান্দো মুসলেরার আছে উরুগুয়ের হয়ে ১৩৩ ম্যাচ খেলার ব্যাপক অভিজ্ঞতা । 

উঠতি তারকাঃ

নুনেজ , আরাউহো , ভেলভার্দে

নুনেজ , আরাউহো , ভেলভার্দে

অভিজ্ঞদের সাথে উরুগুয়ের বর্তমান স্কোয়াডে আছে ডারউইন নুনেজের মতো তরুণ খেলোয়াড় । বয়স মাত্র ২৩ বছর । খেলছেন লিভারপুলের মতো বিশ্বসেরা একটি দলে । ২০২০-২২ মৌসুমে পর্তুগীজ ক্লাব বেনফিকায় খেলে পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন । দুই মৌসুমের ৮৫ ম্যাচে হাঁকান ৪৮ গোল । লিভারপুলেও চলতি মৌসুমে করেছেন ১৮ ম্যাচে ৯ গোল । যার মানে হচ্ছে , প্রথম বিশ্বকাপটি ডারউইন খেলতে চলেছেন বেশ ভাল ফর্ম নিয়ে । ২০২১-২২ মৌসুমে পর্তুগীজ প্রিমিয়ার লীগার সেরা খেলোয়াড় আর সেরা গোলদাতা ছিলেন । দেশের জার্সিতে তাঁর গোলের সংখ্যা ১৩ ম্যাচে তিনটি । উরুগুয়ে দলে কাভানি আর সুয়ারেজ পরবর্তী তারকা হিসেবে ধরা হচ্ছে তাঁকে । 

২৪ বছরের ফ্রেডরিকো ভেলভার্দের দিকেও রাখতে হবে আলাদা নজর । রিয়েল মাদ্রিদের নিয়মিত একাদশের সদস্য হয়ে উঠেছেন । ২৪ বছরের এই মিডফিল্ডার খেলতে পারেন রাইট উইঙ্গার আর রাইট ব্যাক পজিশনেও । ২০১৮ সালে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত স্কোয়াড থেকে বাদ পড়েছিলেন । তাই কাতারে হতে চলেছে তাঁর বিশ্বকাপ অভিষেক । এখন পর্যন্ত দেশের জার্সিতে ৪৪ ম্যাচে তাঁর গোলের সংখ্যা ৪টি । সময়ের অন্যতম তরুণ আর ক্রিয়েটিভ এই মধ্যমাঠের খেলোয়াড় ২০২২-২৩ মৌসুমে ২০ ম্যাচে করে ফেলেছেন ৮ গোল । জিতেছেন ক্লাবের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লীগসহ আটটি শিরোপা । যার সাতটি রিয়েল মাদ্রিদের পক্ষে ।

এছাড়া পঁচিশের মধ্যে বয়সে থাকা রোনাল্ড আরাউহো , রদ্রিগো বেন্তাকুর , ম্যাতিয়াস ওলিভেরা , নিকোলাস ডি লা ক্রুজরা দলের অন্যতম ভরসা হয়ে উঠছেন । যারা আগামীদিনে উরুগুয়ে আর বিশ্বফুটবলে বড় তারকা হয়ে ওঠার লক্ষণ ইতোমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছেন ।

সাম্প্রতিক পারফর্মেন্সঃ

উরুগুয়ে বনাম মেক্সিকো ২০২২

উরুগুয়ে বনাম মেক্সিকো ২০২২

২০২১ সালের কোপা আমেরিকায় হতাশ করেছে ১৫বারের চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে । যদিও পাঁচ দলের গ্রুপ থেকে দ্বিতীয় হয়েই তারা পা রেখেছিল নক আউট পর্বে । কিন্তু শেষ আটের লড়াইয়ে টাইব্রেকারে তাদের হারিয়ে দেয় কলম্বিয়া । গ্রুপ পর্বেও তারা হেরেছিল আর্জেন্টিনার কাছে ।

চলতি ২০২২ সালে নয়টি ম্যাচ খেলে সাতটিই জিতেছে উরুগুয়ে । হেরেছে কেবল ইরানের কাছে । ড্র করেছে আমেরিকার সাথে । চলতি বছর বিশ্বকাপ খেলতে আসা মেক্সিকো আর ক্যানাডার বিপক্ষে উরুগুয়ে পেয়েছে সহজ জয় । সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের আগে উরুগুয়ে ভাল ছন্দেই আছে , প্রতীয়মান হয় ।

কোচ এবং কৌশলঃ

উরুগুয়ের কোচ হিসেবে ২০২২ সালের শুরুতে যোগ দিয়েছেন দিয়াগো আলোনসো । ১৫ বছর দায়িত্বে থাকা অস্কার তাবারেজের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তিনি । তাবারেজের সময়ে উরুগুয়ের ফুটবলের পুনরুত্থান হয়েছে বললে ভুল হবে না । তাই আলোনসোর জন্য দায়িত্বটি বেশ কঠিন , কোন সন্দেহ নেই । যদিও দায়িত্ব নিয়েই টানা চার ম্যাচে আলোনসো জয় এনে দিয়েছেন দলকে । প্যারাগুয়ে , ভেনেজুয়েলা , পেরু আর চিলির বিরুদ্ধে সেই জয়েই নিশ্চিত হয়েছে উরুগুয়ের ২০২২ বিশ্বকাপ । নতুবা দলটি ছিল শংকার মধ্যে ।

আলোনসোর অধীনে ৯ ম্যাচে ৭ জয় প্রমাণ করে , উরুগুয়ে আবার নিজেকে ফিরে পেয়েছে । আর সেটাও একেবারে মোক্ষম সময়ে । বিশ্বকাপে উরুগুয়ের সেরা একাদশ হতে পারে – ফার্নান্দো মুসলেরা (গোলরক্ষক) , রোনাল্ড আরাউহো , দিয়াগো গোডিন , হোসে গিমেনেজ , ম্যাতিয়াস ভিনা , রদ্রিগো বেন্তাকুর , ফ্রেডরিকো ভেলভার্দে , ম্যাতিয়াস ভেসিনো , ডারউইন নুনেজ , লুইস সুয়ারেজ , ফাকুন্দো পেল্লিস্ত্রি

উরুগুয়ে স্কোয়াডঃ

গোলরক্ষক- ফার্নান্দো মুসলেরা , সার্জিও রোচেট , সেবাস্তিয়ান সোসা

রক্ষণভাগ- রোনাল্ড আরাউহো , মার্টিন সাসেরেস , সেবাস্তিয়ান কোটস , হোসে গেমিনেজ , দিয়াগো গোডিন , ম্যাতিয়াস ওলিভেরা , হোসে লুইস রদ্রিগেজ , গুইলের্মো ভ্যারেলা

মধ্যমাঠ- জর্জিয়ান ডি আরাস্কায়েতা , রদ্রিগো বেন্তাকুর , নিকোলাস ডি লা ক্রুজ , লুকাস টোরেইরা , ম্যানুয়েল উগার্তে , ফ্রেডরিকো ভেলভার্দে

ফরোয়ার্ড- আগুস্টিন ক্যানোবিও , এডিসন কাভানি , ম্যাক্সি গোমেজ , ডারউইন নুনেজ , ফাকুন্দো পেল্লিস্ত্রি , লুইস সুয়ারেজ , ফাকুন্দো টোরেস

বিশ্বকাপে লক্ষ্যঃ

কাতার বিশ্বকাপে উরুগুয়ে খেলবে ‘এইচ’ গ্রুপে । যেখানে আছে অন্যতম ফেভারিট পর্তুগাল , এশিয়ার পাওয়ার হাউজ দক্ষিণ কোরিয়া আর আফ্রিকান দেশ ঘানা । গত আসরে পর্তুগালকে নক আউট পর্ব থেকে বিদায় দিয়েছিল উরুগুয়ে । আর ঘানাকে ২০১০ সালে বিতর্কিত কোয়ার্টার ফাইনালে হারিয়েছিল পেনাল্টি শুট আউটে । একই আসরে নক আউট পর্বে দক্ষিণ কোরিয়াকে হারিয়েছিল ২-১ গোলে । অর্থাৎ গ্রুপের তিন দলের সাথেই বিশ্বকাপের সর্বশেষ দেখায় বিজয়ী উরুগুয়ে । কিন্তু প্রতিটা আসর যেহেতু আলাদা , তাই ২০২২ সাল নিয়ে আগাম ভবিষ্যৎবানীর উপায় নেই ।আর গত তিনটি আসরে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের রেকর্ড নেই লা সেলেস্তেদের । তাই ‘এইচ’ গ্রুপ থেকে সম্ভাবনার বিচারে সেরা ষোল পর্বে উরুগুয়ের উত্তরণ আশা করা যায় ।

আগামী ২৪ নভেম্বর উরুগুয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করবে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে । ২৮ নভেম্বর তাদের প্রতিপক্ষ পর্তুগাল । আর ২ ডিসেম্বর ঘানার বিপক্ষে গ্রুপের শেষ ম্যাচ খেলবে উরুগুয়ে ।

সবশেষঃ

বিশ্বকাপ ফুটবলের শুরুর দিকে উরুগুয়ের দুইটি বিশ্বকাপ জয় ইতিহাসের বড় ঘটনা । যা তাদের দিয়েছে ফুটবলের আভিজাত্য । পরবর্তীতে ক্ষয়িষ্ণু অভিজাতদের কাতারে নেমে আসা উরগুয়ের ফুটবলে ফের আলোর দেখা মিলেছে । উঠে আসছে একের পর এক বিশ্বমানের তারকা । যাদের নিয়ে উরুগুয়ের স্বপ্ন দিনদিন বিস্তৃত হচ্ছে ।

আহসান/বিশ্বকাপ-২৯