Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

সুইজারল্যান্ড ভেঙে দিতে পারে যে কারো স্বপ্ন

আহসান হাবীব সুমন/ক্রীড়ালোকঃ

কাতার বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডকে কেউ শিরোপা প্রত্যাশী দলের তালিকায় রাখছে না । কিন্তু ইউরোপের মাঝারীশক্তি হিসেবে দলটিকে হিসেবের বাইরে রাখারও কোন উপায় নেই । নিজেরা বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও তারা ভেঙে দিতে পারে যে কোন দলের স্বপ্ন । তাই সুইসদের হাল্কাভাবে নেয়ার কোন উপায় নেই ।

বিশ্বকাপ ফুটবলে সুইসদের অর্জনঃ

১৯৩৪ সালে সুইসদের বিশ্বকাপ দল

সুইজারল্যান্ড প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশ নেয় ১৯৩৪ সালে । সেটি ছিল ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন । ইটালির মাটিতে সেই বিশ্বকাপ সরাসরি নক আউট দিয়ে শুরু হয়েছিল । নিজেদের বিশ্বকাপ অভিষেক ম্যাচেই সুইসরা ৩-২ গোলে হারিয়ে দেয় নেদারল্যান্ডকে । ম্যাচের সাত মিনিটে সুইসদের হয়ে বিশ্বকাপ অভিষেক গোল করেন পোল্ডি কিয়েলহোলজ । কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ড হেরেছে চেকদের কাছে । আসরে কিয়েলহোলজ তিনটি গোল করেন ।

বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সুইজারল্যান্ড ১১বার অংশ নিয়েছে । বড় সাফল্য কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তরণ । ১৯৫৪ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পথে সুইজারল্যান্ড দুইবার হারায় ইটালিকে । আর শেষ আটের লড়াইয়ে ৫-৭ গোলে হেরে যায় অস্ট্রিয়ার কাছে । সেই ম্যাচে সুইসদের হয়ে বিশ্বকাপের একমাত্র হ্যাট্রিক করেছিলেন জোসেফ হুইগি

১৯৩৪-৫৪ পর্যন্ত টানা চারটি বিশ্বকাপ খেলেছে সুইজারল্যান্ড । আর বাদ পড়েনি ২০০৬ সাল থেকে । কাতারে প্রথমবারের মতো টানা পঞ্চম বিশ্বকাপ খেলতে চলেছে দেশটি ।

বিশ্বকাপে সুইসরা ম্যাচ খেলেছে ৩৭টি । জয় ১২ ম্যাচে । ড্র ৮ আর পরাজয় ১৭ । তাদের পক্ষে গোল হয়েছে ৫০টি আর বিপক্ষে ৬৪টি ।

সুইজারল্যান্ডের হয়ে ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে ছয়টি গোল করেছিলেন হুইগি । একটিমাত্র বিশ্বকাপ খেলা হুইগি বিশ্বকাপে  সুইসদের সেরা গোলদাতা । সবচেয়ে বেশী চারটি বিশ্বকাপ খেলেছেন ভেলন বেহরামি । ২০০৬-১৮ পর্যন্ত বিশ্বকাপে সুইসদের হয়ে যৌথ সর্বোচ্চ ১০  ম্যাচও খেলেছেন ।  এই রেকর্ডে নাম  আছে আরেক সুইস তারকা স্টেফান লিচস্টেইনার । তিনি ২০১০-১৮ বিশ্বকাপ খেলেছেন ।

সুইজারল্যান্ডের মহাতারকা ছিলেন যারাঃ

স্টেফেন চাপুশাট

স্টেফেন চাপুশাট

স্টেফান চাপুইসাটকে সুইজারল্যান্ডের ইতিহাসের সেরা ফুটবলার হিসেবে বিবেচনা করা হয় । ১৯৯১-৯৯ পর্যন্ত তিনি খেলেছেন জার্মানির বুরুশিয়া ডর্টমুণ্ডে । ১৯৯৪ বিশ্বকাপ ছাড়াও খেলেছেন দুইটি ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ । ক্লাব ফুটবলে জিতেছেন দুইটি বুন্দেস লিগা আর চ্যাম্পিয়ন্স লীগসহ সাতটি শিরোপা । দেশের হয়ে ১০৩ ম্যাচে তাঁর গোলের সংখ্যা ২১টি । ২০০৩ সালে তাঁকে ‘গোল্ডেন প্লেয়ার’ নির্বাচিত করেছে সুইস ফেডারেশন । নির্বাচিত হয়েছেন সুইসদের ৫০ বছরের ইতিহাসে সেরা ফুটবলার ।

সুইজারল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী ৪২ গোল করেছেন অ্যালেক্সান্ডার ফ্রেই । জাতীয় দলে খেলেছেন ২০০১-১১ , পুরো এক দশক । ম্যাচের সংখ্যা ৮৪ । অর্থাৎ প্রতি দুই ম্যাচে একটি করে গোল তাঁর দেশের জার্সিতে । নিজ দেশের সেরা ক্লাব ব্যাসেল থেকে ক্যারিয়ার শুরু এবং শেষ । মাঝে খেলেছেন ফ্রান্সের রেনে আর জার্মানির বুরুশিয়ায় । ২০০৪-০৫ মৌসুমে ছিলেন ফরাসী লীগ ওয়ানের সেরা গোলদাতা । নিজ দেশের বর্ষসেরা হয়েছেন তিনবার ।

সুইজারল্যান্ডের প্রথম সুপারস্টার জোসেফ হুইগি । জাতীয় দলে ৩৪ ম্যাচে ২২ গোলের মালিক । এছাড়া সুইসদের জার্সিতে সবচেয়ে বেশী ১১৮ ম্যাচ খেলার রেকর্ড হেইঞ্জ হারম্যানের । মিডফিল্ডার হিসেবে জাতীয় দলে তাঁর গোলের সংখ্যা ১৫টি । সবচেয়ে বেশী পাঁচবার সুইজারল্যান্ডের বর্ষসেরা ফুটবলার নির্বাচিত হয়েছেন ।

রোড টু কাতারঃ 

ইউরোপের বাছাই পর্ব সব সময়েই কঠিন ।  ২০২২ সালের বিশ্বকাপে জায়গা পেতে সুইসদের ‘সি’ গ্রুপে খেলতে হয়েছে ইটালি , নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড , বুলগেরিয়া এবং লিথুনিয়ার বিপক্ষে  । শক্তির বিচারে লিথুনিয়া ছাড়া সবাই ছিল বিশ্বকাপ টিকেটের দাবীদার । কিন্তু গ্রুপে শীর্ষস্থান পাওয়া সুইজারল্যান্ড নিজেদের প্রমাণ করেছে সেরা হিসেবে । আট ম্যাচে পাঁচটি জয় আর তিনটি ড্র থেকে পাওয়া ১৮ পয়েন্টে তারাই সরাসরি পেয়ে যায় বিশ্বকাপের ছাড়পত্র । অন্যদিকে,  ১৬ পয়েন্ট নিয়ে ইটালি চলে যায় প্লে-অফে । যেখানে মেসিডোনিয়ার কাছে হেরে টানা দুইটি বিশ্বকাপের বাইরে আজ্জুরিরা । 

বিশ্বকাপ বাছাইয়ে সুইজারল্যান্ড গোল করেছে ১৫টি । খেয়েছে ২টি । বাছাই পর্বে সুইসদের পক্ষে সবচেয়ে তিনটি গোল পেয়েছেন ব্রিল এমবোলো

বর্তমান সময়ের সেরা তারকাঃ

সুইজারল্যান্ড মুল চালিকা শক্তি জার্দান শাকিরি আর গ্রানিত শাকা । উইঙ্গার হিসেবে ভক্তদের দারুণ পছন্দের  শাকিরি । দেশের হয়ে খেলেছেন তৃতীয় সর্বোচ্চ ১০৮ ম্যাচ । ৩১ বছরের শাকিরি আগামী দিনে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়বেন , এটা নিশ্চিত । জাতীয় দলে গোলের সংখ্যা ২৮টি । দুইবার পেয়েছেন ‘সুইস ফুটবলার অফ দা ইয়ার’ সম্মান । 

নিজের দেশ এফসি ব্যাসেলের হয়ে ক্লাব ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন শাকিরি । পরবর্তীতে বায়ার্ন মিউনিখ , ইন্টার মিলান , স্টোক সিটি , লিভারপুল আর অলিম্পিক লিও হয়ে এখন খেলছেন আমেরিকার শিকাগো ফায়ার দলে । ২০২২ সালে ক্লাবের হয়ে করেছেন ২৯ ম্যাচে ৭ গোল । সুইস সুপার লীগ , বুন্দেস লীগা , ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ আর চ্যাম্পিয়ন্স লীগসহ সব শিরোপার স্বাদ নিয়েছেন । ক্লাব ফুটবলে শিরোপা সংখ্যা ১৯টি ।

গ্রানিত শাকা সুইস দলের অধিনায়ক । মধ্যমাঠের এই তারকা খেলেছেন জাতীয় দলের হয়ে ১০৬ ম্যাচ । গোল আছে ১২টি । ২০১৬ সাল থেকে খেলছেন ইংল্যান্ডের অন্যতম জায়ান্ট আর্সেনালে । ক্লাব ফুটবলে ৪৭০ ম্যাচে ২৯ গোল তাঁর । সর্বশেষ দুইটি বিশ্বকাপ আর ইউরো খেলা শাকা দলের নির্ভরতা । জিতেছেন সুইস বর্ষসেরার সম্মান ।

এছাড়া , সুইসদের গোলরক্ষক ইয়ান সোমারের আছে ৭৬ আন্তর্জাতিক ম্যাচের অভিজ্ঞতা । রিকার্ডো রদ্রিগেজ খেলেছেন ১০০ ম্যাচ । ফ্যাবিয়ান শার খেলেছেন ৭২ ম্যাচ । ফরোয়ার্ড সেভেরোভিচের আছে ৮৮ ম্যাচে ২৫ গোলের রেকর্ড । যারা প্রত্যেকেই ইউরোপের সেরা লীগে খেলছেন । তাদের নিয়ে দলটি বেশ ব্যালেন্সড ।

কোচ এবং কৌশলঃ

২০২১ সাল থেকে সুইসদের কোচ মুরাত ইয়াকিন । তাঁর অধীনে ১৫ ম্যাচের ৭টি জিতেছে সুইজারল্যান্ড । ড্র আর হার সমান চারটি করে । সুইজারল্যান্ডকে মুলত খেলান ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে । যেখানে বিশ্বকাপে তাঁর পছন্দের একাদশ হতে পারে – ইয়ান সোমার (গোলরক্ষক) , সিলভান উইডমার, নিকো এলভেডি , ফ্যাবিয়ান শার , রিকার্ডো রদ্রিগেজ, রেমো ফ্রেউলার , জেনিত শাকা , জার্দান শাকিরি , জিব্রিল শ , রুবেল ভার্গাস, ব্রিল এমবোলো

সাম্প্রতিক পারফর্মেন্সঃ

২০২১ সালে অনুষ্ঠিত ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে একটি জয় আর একটি ড্র নিয়ে গ্রুপের তৃতীয় দল হিসেবে কোনমতে পা রাখে নক আউট পর্বে ।  গ্রুপে ইটালির  কাছে ৩-০ গোলে শোচনীয়ভাবে হেরেছিল তারা । অবশ্য ওয়েলসের সাথে ড্র আর তুর্কির সাথে জয়ে খেলার সুযোগ মেলে সেরা ষোল পর্বে । তবে নক আউট পর্বে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে বিদায় করে দিয়ে দারুণ সাফল্য পায় । আবার কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের কাছে  টাইব্রেকারে হেরেই বিদায় নেয় ।

২০২২ সালে উয়েফা নেশন্স লীগে নিজেদের গ্রুপে তৃতীয় হয়েছে সুইজারল্যান্ড । গ্রুপের অন্য তিন দল ছিল স্পেন , পর্তুগাল আর চেক প্রজাতন্ত্র । কঠিন গ্রুপেও তিনটি জয়ের দেখা পেয়েছে সুইসরা । হারিয়েছে তিনটি দলকেই । হেরেছেও তিন দলের  সাথেই ।

চলতি বছর শুরুটা ছিল সুইজারল্যান্ডের জন্য ভীষণ বাজে । প্রথম পাঁচ ম্যাচের চারটিতে হারের মুখ দেখে তারা । মার্চে ইংল্যান্ডের কাছে হার দিয়ে শুরু হয় তাদের ২০২২ সালের যাত্রা । ড্র শুধুমাত্র দুর্বল কসোভোর বিপক্ষে । কিন্তু বিশ্বকাপ এগিয়ে আসার সাথে সাথে যেন বদলে গেছে সুইস দল । সর্বশেষ তিন ম্যাচে টানা হারিয়েছে পর্তুগাল , স্পেন আর চেকদের । যা বিশ্বকাপের আগে দলটি নিয়ে আশায় বুক বাঁধার মতো । বলা যায় , দারুণ ফর্ম নিয়েই কাতারে আসছে সুইসরা ।

সুইজারল্যান্ডের চূড়ান্ত স্কোয়াডঃ

গোলরক্ষক –ইয়ান সোমার , গ্রেগর কোবেল , ফিলিপ কোন, জোনাস ওমলিন

রক্ষণভাগ- ম্যানুয়েল আকাঞ্জি , ইরে কোমার্ট , নিকো এলভেদি , ফ্যাবিয়ান শার , সিলভান উইডমার , রিকার্ডো রদ্রিগেজ , এডিমিলসন ফার্নান্দেজ

মধ্যমাঠ- মিশেল আয়েবিশচার , জার্দান শাকিরি , রেনাটো স্টেফান , গ্রানিত শাকা , ডেনিস জাকারিয়া , ফ্যাবিয়েন ফ্রেই , রেমো ফ্রিউলার , নোয়াহ ওকাফোর , ফ্যাবিয়েন রেইডার , আর্ডন জাশারি

ফরোয়ার্ড- ব্রিল এমবোলো , রুবেন ভার্গাস , জিব্রিল শ , হ্যারিস সোফেরোভিচ , ক্রিস্টিয়ান ফাসানাখট

কাতারে লক্ষ্যঃ

কাতার বিশ্বকাপে ‘জি’ গ্রুপে সুইজারল্যান্ডের প্রতিপক্ষ ব্রাজিল , সার্বিয়া আর ক্যামেরুন । গ্রুপটি দারুণ শক্তিশালী সন্দেহ নেই । এমনকি , পাঁচবারের বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল গ্রুপ পর্ব পেরুবে সেই গ্যারান্টি নাই । বলা যায় , সুইসদের দারুণ  সুযোগ রয়েছে গ্রুপ পর্ব থেকে উত্তরণের ।

আগামী ২৪ নভেম্বর সুইজারল্যান্ডের প্রথম ম্যাচ আফ্রিকার অদম্য সিংহ ক্যামেরুনের বিপক্ষে । ২৮ নভেম্বর তাদের প্রতিপক্ষ ব্রাজিল । আর ৩ ডিসেম্বর সুইসরা খেলবে সার্বিয়ার বিপক্ষে ।

উপসংহার-

সুইস দলে একজন বিশ্বমানের স্ট্রাইকারের অভাব রয়েছে । তবে বিশ্বকাপ হচ্ছে যে কোন ফুটবলারের নিজেকে প্রমাণের আসর । তাই স্ট্রাইকারদের সাথে অন্যরা গোল করার দায়িত্ব নিলে সুইসদের অন্তত কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত দেখতে পাওয়া বিচিত্র না ।