Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

ব্রাজিল, পারবে?

আহসান হাবীব সুমন/ক্রীড়ালোকঃ 

বিশ্বফুটবলে ব্রাজিলের সাফল্য নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই । ফিফা বিশ্বকাপ আসরে সর্বাধিক পাঁচবার শিরোপা জিতেছে ব্রাজিল । জিতেছে জগতের প্রায় সব বড়  শিরোপা ।  এছাড়া ,  প্রায় প্রতিটা বিশ্বকাপেই ব্রাজিল থাকে হট ফেভারিটদের তালিকায় । ২০২২ সালে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপেও যার বাত্যয় ঘটছে না ।কিন্তু সত্যি কি এই মুহূর্তে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ের সক্ষমতা আছে ?

বিশ্বকাপে ব্রাজিলের দুঃখ ‘মারাকানাঃ

ব্রাজিল একমাত্র দেশ , যারা কখনও বিশ্বকাপের মুলমঞ্চের বাইরে থাকে নি । খেলেছে প্রতিটা বিশ্বকাপ । যদিও ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে ব্রাজিলের অভিষেক হয়েছিল যুগোস্লাভিয়ার কাছে ১-২ গোলে হার দিয়ে । সেই ম্যাচে বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে অভিষেক গোলটি করেন হোয়াও প্রেগুইনহো । তবে দ্বিতীয় ম্যাচেই ব্রাজিল পেয়ে যায় প্রথম জয়ের দেখা । ৪-০ গোলে হারায় বলিভিয়াকে । যদিও গ্রুপে দ্বিতীয় হওয়ায় ব্রাজিলের খেলা হয়নি সেমিতে । 

১৯৫০ মারাকানা ট্র্যাজেডি

১৯৫০ মারাকানা ট্র্যাজেডি

১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের শিরোপা না পাওয়া ছিল চরম কস্টের । এই বিশ্বকাপে কোন ফাইনাল ছিল না ।১৩ দল নিয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ড থেকে চার গ্রুপের সেরা দল সুযোগ পায় পরবর্তী ধাপে । ব্রাজিল, স্পেন, সুইডেন ও উরুগুয়ে – চার  গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠে । যেখানে ব্রাজিল প্রথম ম্যাচেই ৭-১ গোলে উড়িয়ে দেয় সুইডেনকে । ম্যাচে একাই চার গোল করেন এডেমির মেঞ্জেস । পরের ম্যাচেও স্পেনকে ১-৬ গোলে হারায় ব্রাজিল । অন্যদিকে , উরুগুয়ে দুই ম্যাচে একটি জয় আর একটি ড্র নিয়ে মুখোমুখি হয় ব্রাজিলের । শেষ ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় মারাকানা স্টেডিয়ামে । খেলায় ড্র করতে পারলেই ব্রাজিল জিতবে প্রথম বিশ্বকাপ । এমন পরিস্থিতিতে এগিয়ে গিয়েও ব্রাজিল ম্যাচ হারে ১-২ গোলে । উরুগুয়ে জয় করে নেয় নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ । এই শোক ব্রাজিলের কাটাতে লেগেছে অনেক বছর । এখনও ব্রাজিলের মানুষের মনে ‘মারাকানা ট্র্যাজেডি’ গাঁথা হয়ে আছে স্থায়ীভাবে ।

ব্রাজিলের ‘জুলে রিমে’ বিশ্বকাপ সাফল্যঃ

১৯৫৮ বিশ্বকাপ সাফল্য

১৯৫৮ সালে ব্রাজিল সুযোগ পায় ‘মারাকানা ট্র্যাজেডি’ ভোলার । সুইডেনে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপেই প্রথম  খেলা  ‘পেলে’ আসরের সেরা উদীয়মান তারকার পুরস্কার পেয়েছিলেন । করেছেন সবচেয়ে কম বয়সে বিশ্বকাপে একাধিক গোলের রেকর্ড । ফাইনালেও সবচেয়ে কম বয়সে জোড়া গোল করেন কালো-মানিক  । স্বাগতিক  সুইডেনের বিপক্ষে ফাইনালে  ৫-২ গোলে জিতে ব্রাজিল পায় প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ । 

পরবর্তী ১৯৬২ বিশ্বকাপেও শিরোপা জিতেছিল ব্রাজিল । এবার অবশ্য পেলে গ্রুপের দ্বিতীয় ম্যাচেই ছিটকে গিয়েছিলেন ইনজুরিতে । কিন্তু নায়ক হয়ে দেখা দেন গারিঞ্চা । ফাইনালে ব্রাজিল ৩-১ গোলে হারায় চেকোস্লোভাকিয়াকে ।

১৯৭০ সালে আসে ব্রাজিলের তৃতীয় বিশ্বকাপ । এবারের নায়ক ছিলেন জোয়ার্জিনহো । তিনি আসরে সাত গোল করেন । আর পেলে ফাইনালে একটিসহ করেন চার গোল । ইটালিকে হারিয়ে ব্রাজিল জিতে নেয় তৃতীয় বিশ্বকাপ । আর সেই সাথে ব্রাজিলের কাছে চিরতরে দিয়ে দেয়া হয় তৎকালীন ‘জুলে রিমে’ ট্রফি ।

সর্বকালের সেরা দলের ব্যর্থতাঃ

১৯৮২ সালে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ না পাওয়া এখনও বিস্ময়

ব্রাজিলের ১৯৮২ সালের দলটিকে বলা হয় বিশ্বকাপ জিততে না পারা সর্বকালের সেরা স্কোয়াড । ২৬ দলের আসরের প্রথম দুইটি পর্বই ছিল গ্রুপভিত্তিক । প্রথম পর্বে ব্রাজিল তিনটি ম্যাচ জিতেই পা রাখে দ্বিতীয় রাউন্ডে । সেখানে এক গ্রুপ ব্রাজিলের সঙ্গী ছিল ইটালি আর আর্জেন্টিনা । আগেরবারের  চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ৩-১ গোলে হারিয়ে সেমির পথে এগিয়ে ছিল ব্রাজিল । কিন্তু ইটালির বিপক্ষে পরের ম্যাচে হেরে বিদায় ঘটে তাদের । এই ম্যাচটি এখনও বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় ম্যাচ হিসেবে পরিচিত । ব্রাজিল দলে সেই সময় সক্রেটিস , জিকো , ফ্যালকাও , জুনিয়র, জুনিনহোরা বিশ্বসেরা  তারকা । কিন্তু তাদের নিয়ে বিশ্বকাপ জিততে না পারা এখনও বিস্ময় । প্রায় একই দল নিয়ে ১৯৮৬ সালেও ব্যর্থ ছিল ব্রাজিল । এছাড়া ,  ১৯৯০ সালে  নক আউট পর্বে আর্জেন্টিনার কাছে ব্রাজিলের হার ছিল অবিশ্বাস্য । পুরো ম্যাচ একচেটিয়া খেলা ব্রাজিল ‘হালি’ গোলে জিতলেও কেউ অবাক হত না । কিন্তু শেষ পর্যন্ত খেলার ধারার বিপরীতে ক্লদিও ক্যানিজিয়ার গোলে জিতে যায় আর্জেন্টিনা ।  

পরবর্তীতে ব্রাজিল ১৯৯৪ থেকে ২০০২ পর্যন্ত টানা তিনটি ফাইনাল খেলেছে । যার দুইটি জিতেছে । ১৯৯৮ সালের ফাইনালে হেরেছে ফ্রান্সের কাছে । 

বিশ্বকাপের সার্বিক রেকর্ডঃ

সব বিশ্বকাপ খেলা ব্রাজিল ছয়বার ফাইনালে উঠেছে । শিরোপা পাঁচটি । ১৯৫০ সালে দ্বিতীয় হলেও সেবারে কোন ফাইনাল ছিল না । আর সেমি ফাইনাল খেলেছে চারবার (ফাইনালের হিসাব ধরা হয় নি) । কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছে ছয়বার ।

ব্রাজিলের হয়ে  সবচেয়ে বেশী ২০ ম্যাচ কাফুর । তিনি ২০০২ সালে ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক । রোনাল্ডোর বিশ্বকাপ ম্যাচের সংখ্যা ১৯টি । আর গোল ব্রাজিলের হয়ে সর্বোচ্চ  ১৫টি । ১৩ গোল আছে পেলের ।

বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশী ১০৯ ম্যাচ খেলেছে ব্রাজিল আর জার্মানি । কিন্তু জয়ে এগিয়ে ব্রাজিল । ব্রাজিলের জয় ৭৩টি আর দ্বিতীয় স্থানে থাকা জার্মানির জয় ৬৭টি । গোলের সংখ্যাও ব্রাজিলের সবচেয়ে বেশী , ২২৯টি ।

ব্রাজিলের আন্তর্জাতিক সাফল্যঃ 

ব্রাজিল  পাঁচটি বিশ্বকাপ ছাড়াও জিতেছে ৯টি কোপা আমেরিকা , সর্বোচ্চ চারটি ফিফা কনফেডারেশন্স কাপ আর দুইটি প্যান আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপ । অলিম্পিক গোল্ড আছে দুইটি । এছাড়া কোপা ডি ফ্রান্সের মতো আমন্ত্রণমুলক  ট্রফি জিতেছে ১৭টি । 

ব্রাজিল ফিফা’র বিবেচনায় বর্ষসেরা দলের সম্মান পেয়েছে সর্বোচ্চ ১২বার । যার মধ্যে ১৯৯৪-২০০০ পর্যন্ত রেকর্ড টানা সাত বছর এই সম্মান শুধু ব্রাজিল পেয়েছে । তবে ২০০৬ সালের পর আর ব্রাজিলের ভাগ্যে জোটেনি এই খেতাব । তাই বর্তমানে ফিফা’র এক নাম্বার র‍্যাংকিং দল হলেও তাদের বিশ্বসেরা বলা যাচ্ছে না ! 

রোড টু কাতারঃ

ল্যাটিন আমেরিকার বাছাই পর্বে দারুণ সময় কাটিয়েছে ব্রাজিল । টিটের অধীনে ব্রাজিল বিশ্বকাপ বাছাইয়ে কোন ম্যাচ হারে নি । এখন পর্যন্ত খেলা ১৭টি ম্যাচের মধ্যে ব্রাজিল জিতেছে ১৪টি , ড্র ৩টি । সর্বাধিক ৪৫ পয়েন্ট নিয়ে ল্যাটিন অঞ্চলের শীর্ষে থেকেই বিশ্বকাপে যাচ্ছে ব্রাজিল । আর্জেন্টিনার সাথে একটি ম্যাচ বাতিল হয়েছে । সেই ম্যাচের ফলাফল না ধরেই শীর্ষস্থান নিশ্চিত হয়েছে সেলেসাওদের ।

বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ১৭ ম্যাচে সর্বোচ্চ ৪০টি গোল করেছে ব্রাজিল । যেখানে দ্বিতীয় স্থানে থাকা আর্জেন্টিনা আর চতুর্থ স্থানে ইকুয়েডর করেছে সমান ২৭ গোল । গোল হজমের ক্ষেত্রেও ব্রাজিল সবচেয়ে কম ৫টি খেয়েছে বাছাই পর্বে ।

বাছাই পর্বে নেইমার ব্রাজিলের হয়ে ৮ গোল করেন । আর রিচার্লিশনের ছিল ৬ গোল । 

ব্রাজিলের শক্তি আর দুর্বলতাঃ

কাতার বিশ্বকাপে ক্যারিয়ার শেষ হচ্ছে ড্যানি আলাভেজ , থিয়াগো সিলভা , ক্যাসিমিরোদের । এমনকি নেইমারের জন্যেও এটাই হতে পারে শেষ বিশ্বকাপ । যদিও তার বয়স মাত্র ৩০ বছর , সেই হিসেবে তার অন্তত আরও একটি বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা আছে যথেষ্ট । কিন্তু ইনজুরি-প্রবণ নেইমারকে নিয়ে আগাম ভবিষ্যৎবাণী একটু ঝুঁকিই হয়ে যায় ।

২০২১ সালে নিজেদের মাঠে কোপা আমেরিকার ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে হারার পর থেকেই অপরাজিত আছে ব্রাজিল । দলটিতে রয়েছে অভিজ্ঞ আর তারুণ্যের সমাবেশ । এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম সেরা দুই গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকার আর এডারসন থাকছেন ব্রাজিল স্কোয়াডে । রক্ষণেও ব্রাজিল থিয়াগো সিলভা , দানিলো ,  ড্যানি  আলাভেজ , আলেক্সান্দ্রো , এলেক্স টেলেস , এডার মিলিতাও আর মার্কুইনহোসদের নিয়ে সমীহ আদায় করে যাচ্ছে । মধ্যমাঠে ক্যাসিমিরো এখনও দলের মুল ভরসা । এছাড়া লুকাস পাকুয়েতা , ফ্রেড , ফ্যাবিনিও আছেন ।

আক্রমণভাগে নেইমার , ভিনিসিয়াস জুনিয়র , রাফিনহা , রিচার্লিশনরা দারুণ ফর্মে আছেন । এছাড়া গ্যাব্রিয়েল হেসুস আর রদ্রিগোরাও পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম ।

তবে শংকার বিষয় হচ্ছে , ফিফা র‍্যাংকিং কিংবা ল্যাটিন অঞ্চলের বাছাইয়ে এক নাম্বারে থাকলেও ব্রাজিলের বিশ্বকাপ সফলতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে । বিশেষ করে ইউরোপের শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে নক আউট পর্যায়ে ব্রাজিলের মুখ থুবড়ে পড়ার একটা সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে । ঠিক যেমনটা গত দুই আসরে হয়েছিল বেলজিয়াম আর জার্মানির বিপক্ষে । তার আগের দুই আসরেও ব্রাজিলকে বিদায় নিতে হয়েছিল ফ্রান্স আর হল্যান্ডের সাথে হেরে । এবারেও তেমন ভয় থেকেই যাচ্ছে । এছাড়া , ব্রাজিলের রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের বয়স আর মধ্যমাঠে ক্যাসিমিরোর সেরা ফর্মে না থাকা ভোগাতে পারে ব্রাজিলকে । 

ব্রাজিল দলের উঠতি তারকারাঃ

ব্রাজিলের উঠতি তারকাদের মধ্যে ভিনিসিয়াস  জুনিয়র সবচেয়ে প্রতিভাবান । তিনি রিয়েল মাদ্রিদের সর্বশেষ চ্যাম্পিয়ন্স লীগ এবং লা লিগা  জয়ে রেখেছেন বড় ভুমিকা । ২২ বছর বয়সী উইঙ্গার গেলো মৌসুমে ৫২ ম্যাচে করেছিলেন ২২ গোল । চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনালেও তাঁর একমাত্র গোলে শিরোপা  জিতে নেয় রিয়েল মাদ্রিদ । চলতি মৌসুমে করেছেন ২১ ম্যাচে ১০ গোল । ব্রাজিলের হয়ে ১৬ ম্যাচে গোলের সংখ্যা ১টি । 

গত চার মৌসুম ধরে ইংলিশ ক্লাব এভারটনের হয়ে ধারাবাহিক পারফর্মেন্স  করা  রিচার্লিশন এখন টটেনহ্যামে  ।চলতি মৌসুমে করেছেন ১৪ ম্যাচে ২ গোল । ক্লাব ক্যারিয়ারে গোলের সংখ্যা ৮৮টি ।  ইতোমধ্যে ব্রাজিলের হয়ে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক আর ২০১৯ সালের কোপা আমেরিকা জিতেছেন । অলিম্পিকে পাঁচ গোল করে হয়েছিলেন সেরা গোলদাতা । ২৫ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড ব্রাজিলের জার্সিতে ৩৮ ম্যাচে করেছেন ১৭  গোল ।

ব্রাজিলের আরেক উইঙ্গার রাফিনহা খেলছেন বার্সায় ।ব্রাজিলের হয়ে করেছেন ১১ ম্যাচে পাঁচ গোল । 

গ্যাব্রিয়েল হেসুস দারুণ সম্ভাবনা নিয়ে শুরু করলেও নিজেকে প্রমাণ করতে পারেন নি এখনও ।তবে চলতি  মৌসুমে আর্সেনালে তিনি যেন ফিরে পেয়েছেন নিজেকে । এখন পর্যন্ত গানারদের হয়ে সব মিলিয়ে ১৯ ম্যাচে ৫ গোল করেছেন ।  নিয়মিত এসিস্ট করছেন । ইংলিশ ক্লাবটি এখন পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে ।  যার বড় অবদান হেসুসের । সেলেসাওদের হয়ে ৫৬ ম্যাচে ১৯ গোল করা হেসুস জিতেছেন ২০১৯ সালের কোপা আমেরিকা । 

অভিজ্ঞতার দাপটঃ

ব্রাজিল দলে কাতার বিশ্বকাপে অন্যতম অভিজ্ঞ খেলোয়াড় হিসেবে দেখা যাবে থিয়াগো সিলভাকে ।  ইতোমধ্যে দেশের হয়ে তিনটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছেন তিনি । ৩৭ বছরের এই অভিজ্ঞ খেলোয়াড় ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে নিজ দেশের মাটিতে ব্রাজিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন । কাতারের আসর নিশ্চিতভাবেই হতে চলেছে তার শেষ বিশ্বকাপ । ব্রাজিলের হয়ে কোপা আমেরিকা আর কনফেডারেশন্স কাপ জিতেছেন । ব্রাজিলের হয়ে ইতোমধ্যে ১০৯  ম্যাচে মাঠে নামা হয়ে গেছে তার । ক্লাব ফুটবলে সব মিলিয়ে ২৯টি শিরোপা জেতা থিয়াগো বর্তমানে খেলছেন ইংলিশ ক্লাব চেলসিতে । জীবনের শেষ বিশ্বকাপে তিনি মাঠে নামবেন ব্রাজিলকে ষষ্ঠ শিরোপা এনে দেয়ার লক্ষ্যে ।

২৮ বছরের মার্কুইনহোস ব্রাজিল রক্ষণের অন্যতম সৈনিক । দেশের হয়ে খেলেছেন  ৭১  ম্যাচ আর করেছেন ৫  গোল । ২০১৬ সালে ব্রাজিলের অলিম্পিক সোনার পদকজয়ী দলের সদস্য ছিলেন । জিতেছেন ২০১৯ সালের কোপা আমেরিকা । ২০১৩ সাল থেকে ফ্রান্সের প্যারিস সেইন্ট জার্মেই দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ তিনি । মার্কুইনহোসের সবচেয়ে বড় গুণ দলের প্রয়োজনে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার , রাইট ব্যাক এমনকি ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার পজিশনে খেলতে পারেন । তাই টিটের যে কোন কৌশলে তিনি নিজেকে মানিয়ে নিতে সক্ষম ।

ড্যানি আলাভেজকে  নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই ।  অভিজ্ঞতার আলোকে ব্রাজিলের কোচ তাকে  কাতার নিয়ে  । 

ভরসা সেই নেইমারেইঃ

যাকে এক সময় মেসি আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মুল প্রতিদ্বন্দ্বী ধরা হত , সেই নেইমারকে নিয়েই ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ের মিশনে পরিকল্পনা সাজাবেন টিটে – এটা পরিস্কার । যদিও ইনজুরির কারণে ক্যারিয়ারের লম্বা সময় তাকে থাকতে হয়েছে মাঠের বাইরে । ফুটবল ইতিহাসে নেইমারের চেয়ে বেশী ইনজুরিতে পড়ার রেকর্ড আর কারো আছে কিনা সন্দেহ । সেই সাথে আছে তার উদ্দাম আর খেয়ালী জীবন-যাপন । ফুটবল ম্যাচের আগের রাতে পার্টি আর মদ্যপান নিয়ে অনেকবার নেতিবাচক শিরোনাম হয়েছেন নেইমি । কিন্তু এতসব কিছুর পরেও ব্রাজিল তো বটেই , বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নেইমারকে হিসেবে রাখতেই হবে ।

সর্বশেষ বিশ্বকাপ বাছাইয়ের দিকে তাকালেই বোঝা যায় নেইমার ব্রাজিলের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ । ইনজুরির কারণে বাছাইয়ে তিনি খেলেছেন মাত্র ১০টি ম্যাচ । সেখানে গোল করেছেন আসরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আটটি । যেখানে বলিভিয়ার মার্সেলো মারিনো ১৬ ম্যাচ খেলে ১০ গোল নিয়ে আছেন শীর্ষে । আর উরুগুয়ের লুইস সুয়ারেজ আট গোল করতে খেলেছেন ১৪ ম্যাচ । এখন পর্যন্ত ব্রাজিলের হয়ে ১২১  ম্যাচে তার গোলের সংখ্যা ৭৫টি ।

২০২২-২৩ মৌসুমের শুরু  থেকেই পিএসজির হয়ে মাঠ মাতাচ্ছেন । করেছেন ১৯ ম্যাচে ১৫ গোল আর ১২ এসিস্ট ।  ক্যারিয়ারের শুরুর  দিকে তরুণ নেইমারকে যেন পাওয়া যাচ্ছে  ২০২২ সালে এসে । কাতার বিশ্বকাপে এই নেইমারকেই দেখতে চাইবে সবাই । 

বিশ্বকাপে ব্রাজিলের মোকাবেলাঃ

বিশ্বকাপে ব্রাজিল খেলবে ‘জি’ গ্রুপে । এই গ্রুপের অন্য তিন দল হচ্ছে সার্বিয়া , সুইজারল্যান্ড আর ক্যামেরুন । গ্রুপটি একেবারেই সহজ না । সার্বিয়া ইউরোপিয়ান অঞ্চলের বাছাই পর্ব ডিঙ্গিয়েছে সরাসরি । তাও পর্তুগালের মত দলকে গ্রুপের দ্বিতীয় স্থানে ঠেলে দিয়ে । দলের কোচ হিসেবে আছেন ড্রাগন স্টয়কোভিচ  । যিনি ছিলেন সময়ের অন্যতম সেরা তারকা । ২০২০ সালের ইউরোতে জায়গা পেতে ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে দলের দায়িত্ব নিয়েছেন  স্টয়কোভিচ  । সেই থেকে সার্বিয়াকে পরিনত করেছেন দুর্দান্ত এক দলে । ২০১৮ সালের বিশ্বকাপেও সার্বিয়া ব্রাজিলের সাথে একই গ্রুপে ছিল । ব্রাজিল সেই ম্যাচ জিতেছিল ২-০ গোলে ।

গ্রুপের আরেকদল সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে সর্বশেষ বিশ্বকাপে ১-১ গোলে ড্র  করেছিল ব্রাজিল ।  কাতার বিশ্বকাপেও শাকিরিদের সুইজারল্যান্ড কঠিন পরীক্ষা নেবে ব্রাজিলের । অন্যদিকে,  ক্যামেরুন আফ্রিকার প্রতিষ্ঠিত শক্তি আর বিশ্বকাপের পরিচিত মুখ । এই নিয়ে অষ্টমবারের মত বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাচ্ছে দেশটি । ব্রাজিলের সাথে এখন পর্যন্ত পাঁচবারের মোকাবেলার ইতিহাসে ক্যামেরুনের একটি জয় আছে ২০০৩ সালের কনফেডারেশন্স কাপে । বাকী চারবারই ক্যামেরুনের বিপক্ষে জিতেছে ব্রাজিল । ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে দুই দলের একমাত্র দেখায় ব্রাজিল ৩-০ গোলে হারিয়েছিল ক্যামেরুনকে ।

গ্রুপে সার্বিয়া আর সুইজারল্যান্ড ব্রাজিলের জন্য হবে শক্ত প্রতিপক্ষ । ফিফা র‍্যাংকিংয়ের ১৪ নাম্বারে থাকা সুইসরা এই গ্রুপ থেকে ব্রাজিলের সাথে পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার ক্ষেত্রে ফেভারিট । তবে র‍্যাংকিংয়ের ২৫তম অবস্থানে থাকা সার্বিয়া কোন অঘটন ঘটিয়ে ফেললে বদলে যেতে পারে গ্রুপের চালচিত্র ।

সমস্যা হচ্ছে , ‘জি’ গ্রুপ থেকে উঠে আসা দল পরবর্তী নক আউট পর্বে খেলবে ‘এইচ’ গ্রুপের দলের সাথে । সেটা হতে পারে পর্তুগাল কিংবা উরুগুয়ে । কিংবা ঘানা আর দক্ষিণ কোরিয়া । ধরা যাক , নিজেদের গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হল ব্রাজিল আর পর্তুগাল নিজেদের গ্রুপে রানার আপ । সেই ক্ষেত্রে সেরা ষোলয় মোকাবেলা হবে দুই দলের । আবার উল্টোটা হলেও দেখা হয়ে যাবে দুই ফেভারিটের । এতে ফুটবল দর্শকরা দারুণ একটি ম্যাচ উপভোগের সুযোগ পেলেও  বিদায় নিতে হবে কোন একটি দলকে । এতে বিশ্বকাপের রঙ মলিন হবে কিছুটা হলেও ।

ব্রাজিলের স্কোয়াডঃ 

গোলরক্ষক- অ্যালিসন বেকার , এডারসন  , ওয়েভারটন 

রক্ষণভাগ- মার্কুইনহোস , এডার মিলিতাও , থিয়াগো সিলভা , আলেক্সান্দ্রো , ব্রেমার , ড্যানি আলাভেজ , এলেক্স টেলেস , ড্যানিলো 

মধ্যমাঠ- ফ্যাবিনিও , ক্যাসিমিরো , ব্রুনো গুইমারেস , ফ্রেড , লুকাস পাকুইতা , এভারটন রিভেইরো 

আক্রমণভাগ – নেইমার জুনিয়র , ভিনিসিয়াস জুনিয়র , রদ্রিগো , গ্যাব্রিয়েল হেসুস , রিচার্লিশন , এন্টোনি , রাফিনহা , পেদ্রো , গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি 

শেষ কথাঃ

বিশ্বফুটবলের অন্যতম সফল দল ব্রাজিল সন্দেহ নেই ।  কিন্তু বিশ্বকাপ ফুটবল ট্রফি জয়ে চাই ভাগ্যেরও পরশ । একাধিকবার সেরা স্কোয়াড নিয়ে ব্রাজিল বিশ্বকাপ পায়নি । যদিও এবারের দলটি দারুণ ব্যালেন্সড , কিন্তু সেরা কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহ থাকছেই । 

আহসান/বিশ্বকাপ-২৮