Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

ফেভারিটদের ‘হুমকি’ হয়ে আসছে দক্ষিণ কোরিয়া

আহসান হাবীব সুমন/ক্রীড়ালোকঃ

এশিয়ার ফুত্তবলের  পরাশক্তি দক্ষিণ কোরিয়া । যারা সমীহ আদায় করে নিয়েছে আন্তর্জাতিক ফুটবলেও । এখন আর নাকউঁচু ইউরোপিয়ান কিংবা শক্তিশালী ল্যাটিনের কোন দেশ এশিয়ান ফুটবলকে ‘হেলাফেলা’ করার সাহস পায় না । যার কৃতিত্ব দক্ষিণ কোরিয়ার ।

ফুটবলে দক্ষিণ কোরিয়ার সাফল্যঃ

১৯৪৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার অভিষেক ম্যাচ

১৯৪৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার অভিষেক ম্যাচ

১৯8৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়া প্রথম ফিফা স্বীকৃত ম্যাচে অংশ নেয় । প্রতিপক্ষ ছিল মেক্সিকো । আগস্টে সেই ম্যাচ ছিল লন্ডন অলিম্পিকের অংশ । দক্ষিণ কোরিয়া ম্যাচটি জিতে নেয় ৫-৩ গোলে ।  ১৩ মিনিটে দক্ষিণ কোরিয়ার হয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক গোলটি করেন চই সিওং-গন । সেই ম্যাচ জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা সুইডেনের কাছে  দক্ষিণ কোরিয়া ১২-০ গোলের লজ্জাজনক পরাজয়ে শেষ করে প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট ।

এশিয়ার পরাশক্তি হলেও দক্ষিণ কোরিয়া নিজ মহাদেশের শিরোপা জিতেছে মাত্র দুইবার । সেটাও ১৯৫৬ আর ১৯৬০’এর এএফসি এশিয়ান কাপে । পরবর্তীতে চারবার ফাইনালে উঠেও শিরোপা পাওয়া হয় নি তাদের । 

১৯৮৭ সালে আফ্রো-এশিয়ান কাপের চ্যাম্পিয়ন হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া । এশিয়ান গেমসের সোনা জিতেছে তিনবার । এছাড়া , কনকাকফ গোল্ড কাপে ২০০২ সালে খেলেছে সেমি ফাইনাল । দক্ষিণ কোরিয়া সবচেয়ে বেশী পাঁচবার শিরোপা জিতেছে ইস্ট-এশিয়ান ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে ।

বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়াঃ

১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপ স্কোয়াড

১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে প্রথম এশিয়ান স্বাধীন দেশ হিসেবে অংশ নেয়ার কৃতিত্ব দক্ষিণ কোরিয়ার । সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সেই আসরে দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা ভয়াবহ । দুই ম্যাচে একটি গোলও দিতে না পারা এশিয়ান জায়ান্টদের জালে বল গেছে ১৬বার । প্রথম ম্যাচেই পুশকাস আর ককসিচদের হাঙ্গেরি ৯ গোল দেয় কোরিয়াকে । দ্বিতীয় ম্যাচে তুর্কিরা করে ৭ গোলের উৎসব । দুইটি ম্যাচেই কোরিয়ার বিপক্ষে হয়েছে দুইটি হ্যাট্রিক ।

দক্ষিণ কোরিয়ার পরবর্তী বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ ১৯৮৬ সালে । সেই থেকে এখন পর্যন্ত কোন বিশ্বকাপের মুলপর্বে খেলা বাদ যায় নি তারা । ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়া ১-৩ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনার কাছে । ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার হয়ে বিশ্বকাপ অভিষেক গোলের দেখা পান পার্ক চ্যাং-সুন । আর সেই আসরেই দক্ষিণ কোরিয়া ১-১ গোলে ড্র করে বুলগেরিয়ার বিপক্ষে । যা বিশ্বকাপে তাদের প্রথম পয়েন্ট । শেষ ম্যাচে ইটালির সাথে দারুণ লড়াই করে ২-৩ গোলে হারে কোরিয়া । বিদায় নেয় বিশ্বকাপ থেকে । তবে এবারের বিদায় অভিষেকের মতো লজ্জার ছিল না ।

দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপ খেলেছে ১০বার । এশিয়ার যে কোন দেশের চেয়ে বেশী । সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়া ম্যাচ খেলেছে ৩৪টি । জয় ৬টি , ড্র ৯টি আর হার ১৯টি । তাদের পক্ষে গোল হয়েছে ৩৪টি আর বিপক্ষে ৭০টি ।

দক্ষিণ কোরিয়ার হয়ে ১৯৯০ থেকে টানা চারটি বিশ্বকাপ খেলেছেন হং-মিউং বো । ম্যাচও খেলেছেন সবচেয়ে বেশী ১৬টি । বিশ্বকাপে তিনটি করে গোল আছে সন হিউং-মিন , পার্ক জি সুং আর আন জুং-হুয়ানের ।

সেরা সাফল্যঃ

২০০২ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজন করে এশিয়া মহাদেশ । যৌথ আয়োজক জাপান-কোরিয়া । নিজেদের মাটিতে সেমি ফাইনালে উঠে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয় কোরিয়ানরা । গ্রুপ পর্বে দক্ষিণ কোরিয়া প্রথম ম্যাচেই ২-০ গোলে হারিয়ে দেয় পোল্যান্ডকে । এটি বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার  প্রথম জয় । যা আসে প্রথম বিশ্বকাপ অংশগ্রহণের ৪৮ বছর পর । দ্বিতীয় ম্যাচে মার্কিনিদের সাথে ১-১ গোলে ড্র করা কোরিয়া শেষ গ্রুপ ম্যাচে হারিয়ে দেয় পর্তুগালকে । উঠে যায় গ্রুপের  সেরা দল হিসেবে নক আউটে ।

নক আউট পর্বে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ১-২ গোলে পরাস্ত হয় ইটালি । কোয়ার্টার ফাইনালেও স্পেনকে টাইব্রেকারে হারিয়ে বিস্ময়ের পর বিস্ময় উপহার দেয় । এশিয়ার প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র দল হিসেবে সেমিতে নাম লিখিয়ে ইতিহাস গড়ে দক্ষিণ  কোরিয়া ।

সেমিতে অবশ্য জার্মানির বালাকের দুর্দান্ত এক গোলে হেরে যায় দক্ষিণ কোরিয়া । আর স্থান নির্ধারণী ম্যাচে তাদের হারায় তুরস্ক । চতুর্থ হয়ে বিশ্বকাপ শেষ করলেও দক্ষিণ কোরিয়া জানান দেয় এশিয়ার ফুটবল উঠে আসছে । 

২০১০ সালের বিশ্বকাপে নক আউট পর্বে উঠে যায় দক্ষিণ কোরিয়া । যদিও হারতে হয় উরুগুয়ের কাছে । সর্বশেষ ২০১৪ আর ২০১৮ সালে বিদায় ঘটেছে গ্রুপ পর্ব থেকে । কিন্তু রাশিয়ায় নিজেদের শেষ ম্যাচে জার্মানিকে ২-০ গোলে হারিয়ে দেয় । যে হারে ২০১৪ সালের চ্যাম্পিয়নদের বিদায় নিতে হয় গ্রুপ পর্ব থেকেই ।

রোড টু কাতারঃ

প্রথম পর্বের ‘এইচ’ গ্রুপে দক্ষিণ কোরিয়া ছিল শীর্ষদল । গ্রুপের অন্য চার দল ছিল লেবানন , তুর্কেমেনিস্তান , উত্তর কোরিয়া আর শ্রীলঙ্কা । করোনা ভাইরাসের কারণে বাছাই পর্ব থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয় উত্তর কোরিয়া । ফলে , গ্রুপ পরিনত হয় চারদলের । দক্ষিণ কোরিয়া ৬ ম্যাচের পাঁচটি জিতেছিল । ড্র ছিল একটি ম্যাচ , লেবাননের বিপক্ষে । সর্বোচ্চ ১৬ পয়েন্ট নিয়ে তারা পা রাখে পরবর্তী রাউন্ডে ।

১২ দলকে দুই গ্রুপে ভাগ করে অনুষ্ঠিত হয় বাছাইয়ের পরবর্তী ধাপ । ইরান আর দক্ষিণ কোরিয়া ‘এ’ গ্রুপ থেকে সরাসরি জায়গা করে নেয় কাতার বিশ্বকাপে । গ্রুপের দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা দক্ষিণ কোরিয়া ১০ ম্যাচে পেয়েছে ৭ জয় , ড্র ২ আর হার ১টি । বাছাই পর্বে সন হিউং-মিন দেশের হয়ে করেন সবচেয়ে বেশী ৭ গোল ।

দক্ষিণ কোরিয়ার বড় তারকা এবং ঝুঁকিঃ

দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় তারকা নিঃসন্দেহে সন হিউং-মিন । ৩০ বছর বয়সেই পরিনত হয়েছেন এশিয়ার সর্বকালের সেরা ফরোয়ার্ডে । এমনকি , বর্তমান সময়ের বিশ্বসেরাদের অন্যতম তিনি । শুধু ফরোয়ার্ড হিসেবে বক্সের মধ্যে নয় , সমান দক্ষ মধ্যমাঠের খেলোয়াড় হিসেবেও । তাঁর দূরপাল্লার গোলার মতো  শট চমকে দিতে সক্ষম বিপক্ষের যে কোন গোলরক্ষককে ।

২০০৮ সালে সনের ক্যারিয়ার শুরু হামবুর্গ জুনিয়র দলে । ২০১০ থেকে একই দলে সিনিয়র অভিষেক । খেলেছেন বুন্দেস লিগার আরেক বড় দল বেয়ার লেভারকুসেনে । ২০১৫ থেকে আছেন ইংলিশ জায়ান্ট টটেনহ্যামে ।

ক্লাব ক্যারিয়ারে ৫১৫ ম্যাচে করেছেন ১৮৬ গোল । সর্বশেষ মৌসুমে ২৩ গোল করে ইপিএলে মোহাম্মদ সালাহর সাথে ছিলেন যৌথ সেরা-গোলদাতা । চলতি মৌসুমে ১৯ ম্যাচে করেছেন পাঁচ গোল । দেশের হয়ে ১০৪ ম্যাচে তাঁর গোলের সংখ্যা ৩৫টি । ২০২২ সালে জাতীয় দলের জার্সিতে করেছেন আট ম্যাচে পাঁচ গোল ।

কাতার বিশ্বকাপে সন হিউং-মিনের উপর নির্ভর করছে দক্ষিণ কোরিয়ার সাফল্য । কিন্তু সম্প্রতি পড়েছেন বেশ বড় ইনজুরিতে । যদিও তাঁকে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত স্কোয়াডে রাখা হয়েছে , কিন্তু প্রথম ম্যাচ থেকেই খেলতে পারবেন কিনা সন্দেহ । আর পারলেও ইনজুরি থেকে ফিরে কতটা ছন্দে থাকবেন , সেটাও দেখার বিষয় ।

দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যান্য তারকাদের মধ্যে ন্যাপলিতে খেলা কিম-মিন জাই , মায়োর্কার তরুণ মিডফিল্ডার লি ক্যাং ইন আর অলিম্পিয়াকোসের ফরোয়ার্ড হুয়াইং উই-জো দলের ভরসা । এছাড়া গোলরক্ষক কিম সিউং-গিউ নির্ভরতার প্রতীক ।

কোচ এবং সাম্প্রতিক পারফর্মেন্সঃ

২০১৮ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার কোচ হিসেবে আছেন পাওলো বেন্টো । যিনি একজন পর্তুগীজ । পর্তুগাল জাতীয় দলের জন্যেও কাজ করেছেন ২০১০-১৪ পর্যন্ত । তাঁর অধীনে ৫৩ ম্যাচের ৩৪টি জিতেছে কোরিয়া । ড্র ১২ আর হার ৭টি । এশিয়ার রেড ডেভিলদের ২০২১ সালে জিতিয়েছেন ইস্ট-এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ।

২০২২ সালের শুরুতেই দক্ষিণ কোরিয়া প্রীতি ম্যাচে ৫-১ গোলে হারিয়ে দেয় আইসল্যান্ডকে । ৪-০ গোলে হারায় আরেক ইউরোপিয়ান সদস্য মালদোভাকে । চলতি বছর সব মিলিয়ে মোট ১৬টি ম্যাচ খেলেছে দক্ষিণ কোরিয়া । জয় ১১টি । দক্ষিণ কোরিয়ার শিকার হয়েছে আইসল্যান্ড(দুবার) , চিলি , মিশর , ইরান আর ক্যামেরুনের মতো বড় দল । তবে হেরেছে তারা জাপান , আরব আমিরাত , ব্রাজিলের কাছে । যার মধ্যে জাপানের কাছে ০-৩ আর ব্রাজিলের কাছে ১-৫ গোলের হার মেনে নেয়ার মতো ছিল না । এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া ড্র করেছে প্যারাগুয়ে আর কোস্টারিকার বিপক্ষে ।

বিশ্বকাপ স্কোয়াডঃ

গোলরক্ষক- কিম সিউং-গিউ , জো হিউন-উ , বুম-কিউন

রক্ষণভাগ- চো ইউ-মিন , হং চাল , কিম জিন-সু , কিম মিন-জাই , কিম মুন-হুয়ান, কিম তায়ে-হুয়ান, কিম ইয়াং-গোন , কৌন কিউং-ওন , ইউন জং-গিউ

মধ্যমাঠ- হুয়াং ইন-বিয়ম, জুং উ-ইয়াং, কৌন চ্যাং-হুন, লি জায়ে-সুং, লি ক্যাং-ইন , পাইক সিউং-হো , সন জুন-হো

আক্রমণভাগ- চো গুয়ে-সাং , হুয়াং হি-চ্যান, হুয়াং উই-জো , জিওং উ-ইয়েং , না সং-হো, সন হিউং-মিন, সং মিন-কিউ

বিশ্বকাপে লক্ষ্যঃ

দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে  পর্তুগাল , উরুগুয়ে আর ঘানাকে নিয়ে ‘এইচ’ গ্রুপ মরণ-ফাঁদ । দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম ম্যাচ ২৪ নভেম্বর উরুগুয়ের বিপক্ষে । দুইবারের  বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের বিপক্ষে আট দেখায় ছয়টি হার আছে দক্ষিণ কোরিয়ার । জয় মাত্র একটি । সেটা ২০১৮ সালে প্রীতি ম্যাচে । এছাড়া , বিশ্বকাপে দুইবারের দেখায়  হেরেছে দক্ষিণ কোরিয়া । 

দ্বিতীয় ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়া ২৮ নভেম্বর লড়বে ঘানার বিপক্ষে । দুই দলের পরিসংখ্যান সমানে সমান । নয় দেখায় জয় চারটি করে । ড্র একটি । বিশ্বকাপ মঞ্চে কখনোই দুই দলের দেখা হয় নি ।

২ ডিসেম্বর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিপক্ষ পর্তুগাল । দুই দলের অতীতে দেখা হয়েছে মাত্র একবার । ২০০২ সালের বিশ্বকাপে । নিজেদের মাটিতে শক্তিশালী পর্তুগালকে ১-০ গোলে হারিয়ে দিয়েছিল কোরিয়া ।

গ্রুপে কোরিয়ার চেয়ে পর্তুগাল আর উরুগুয়ে শক্তিশালী । কিন্তু স্পেন , ইটালি , জার্মানি এমনকি পর্তুগালকে নিজেদের দিনে হারিয়ে দেয়ার রেকর্ড আছে এশিয়ার রেড ডেভিলদের । তাই , ‘এইচ’ গ্রুপ থেকে দক্ষিণ কোরিয়া নক আউট পর্বে উঠে গেলে অঘটন হবে না মোটেই ।

শেষকথাঃ

২০০২ সাল থেকেই দক্ষিণ কোরিয়া ফুটবলের উত্থান । যারা এখন নিয়মিত হারাতে পারে যে কোন বড় দলকে । ইতোপূর্বে এশিয়ার মাটিতে রয়েছে তাদের ঐতিহাসিক সাফল্য । কাতারেও সেই সাফল্যের কাছাকাছি যাওয়া তাদের জন্য বিচিত্র কিছু না ।

আহসান/বিশ্বকাপ-৩০