Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

অসম্ভব, পর্তুগাল বিশ্বকাপ জিততে পারবে না !

আহসান হাবীব সুমন/ক্রীড়ালোকঃ

ফুটবলে কখনও বিশ্বকাপ জেতা হয় নি । কখনও খেলা হয় নি বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালেও । একবার মাত্র জেতা হয়েছে ইউরোপ মহাদেশের সেরার মুকুট । তবু বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তি পর্তুগাল । যারা সব সময় ভাল ফুটবল খেলতে অভ্যস্ত।  চায়, বিশ্বকাপ জয় করতে । কাতারে সেই স্বপ্ন পূরণেই যাচ্ছে পর্তুগীজ বাহিনী—অনেকেই বলছেন।

পর্তুগালের ফুটবলের শুরুর দিকঃ

১৯২১ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবলে অংশ নেয় পর্তুগাল । মাদ্রিদে স্বাগতিক স্পেনের বিপক্ষে পর্তুগাল অবশ্য হেরে যায় ১-৩ গোলে । সেই ম্যাচে পর্তুগীজদের হয়ে একমাত্র গোলটি করেন আলবার্তো আগুস্তো । তিনিই পর্তুগালের প্রথম আন্তর্জাতিক গোলদাতা হিসেবে ইতিহাসে জায়গা নিয়ে আছেন ।

১৯২৮ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে পর্তুগাল প্রথম প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে অংশ নেয় । হল্যান্ডের আর্মস্টারডামে পর্তুগাল টানা দুই ম্যাচে হারায় চিলি আর যুগোস্লাভিয়াকে । উঠে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে । যদিও কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগাল হেরে যায় মিশরের কাছে ।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে অর্জনঃ

পর্তুগালের ফুটবলের সবচেয়ে বড় অর্জন ২০১৬ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জয় । যা দেশটির প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা । তার আগে ২০০৪ সালে একই আসরে ফাইনালে খেলেছিল পর্তুগীজরা । কিন্তু নিজেদের মাটিতে অবিশ্বাস্যভাবে হেরে যায় গ্রীসের কাছে । যা এখনও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময় । এছাড়া তিনবার দলটি তৃতীয় হয়েছে ইউরোপের সেরা ফুটবল টুর্নামেন্টে ।

২০১৯ সালে পর্তুগাল জিতেছে উয়েফা নেশন্স লীগের অভিষেক শিরোপা । এছাড়া ২০১৭ সালে ফিফা কনফেডারেশন্স কাপে তৃতীয় হয় পর্তুগাল ।

কেঁড়ে নেয়া হয়েছে ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপঃ

পর্তুগাল ১৯৬৬ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফুটবলের মুলমঞ্চে খেলার সুযোগ পায় । বলা হয় , ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ ছিল একজন ইউসেবিওর । তাঁর কাছ থেকে যা কেঁড়ে নেয়া হয়েছে ।পুরো আসরে ‘কালো চিতা’ (ব্ল্যাক প্যান্থার) নামে পরিচিত ইউসেবিও ছিলেন দুর্দান্ত । গ্রুপ পর্বের টানা তিন ম্যাচে পর্তুগালের কাছে হার মানে হাঙ্গেরি , বুলগেরিয়া আর ব্রাজিল ।

নক আউট পর্বে পর্তুগালের প্রতিপক্ষ ছিল উত্তর কোরিয়া । অবিশ্বাস্যভাবে ম্যাচের ২৫ মিনিটের মধ্যে উত্তর কোরিয়া এগিয়ে যায় ০-৩ গোলে । সবাই যখন পর্তুগালের বড় পরাজয় দেখার জন্য তৈরি , সেই সময়েই ‘তেলেসমাতি’ শুরু ইউসেবিওর । ম্যাচে করেন এক এক করে চার গোল ! আর শেষ পর্যন্ত পর্তুগাল ৫-৩ গোলের জয়ে উঠে যায় সেমিতে ।

সেমি ফাইনালে পর্তুগালের প্রতিপক্ষ ছিল স্বাগতিক ইংল্যান্ড । কিন্তু টুর্নামেন্ট জুড়ে পর্তুগাল আর ইউসেবিওর অপ্রতিরোধ্য গতি ভয় পাইয়ে দেয় ইংরেজদের । ব্রিটিশরা নেমে পড়ে ষড়যন্ত্রে । ম্যাচটি হওয়ার কথা ছিল লিভারপুল শহরের গুডিসন স্টেডিয়ামে। ম্যাচের আগের দিন ভেন্যু বদলে ওয়েম্বলিতে নেয় ইংল্যান্ড। কিন্তু ইংলিশদের ছলচাতুরিতে ম্যাচের আগেরদিন লিভারপুল থেকে লন্ডনে আসতে হয় পর্তুগাল দলকে। ভ্রমণক্লান্তি ও নানাবিধ কারণে ওই ম্যাচে ঠিকঠাক খেলতেই পারলেন না ইউসেবিও। তবু পুরো আসরে গোল না খাওয়া ইংল্যান্ডের জালে বল ফেলেন তিনি । কিন্তু ববি চার্লটনের জোড়া গোলে ম্যাচ নিজেদের করে নেয় ইংল্যান্ড ।

১৯৬৬ সালের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ ছিল ইতিহাস । ম্যাচের দুই প্রতিপক্ষ সোভিয়েত ইউনিয়ন আর পর্তুগাল । প্রতিপক্ষ ইউসেবিও ব্ল্যাক প্যান্থার আর সর্বকালের সেরা কিপার লেভ ইয়াশিন মানে ‘ব্ল্যাক স্পাইডার’ । তাঁকেও গোল দিতে ভুল করেননি ইউসেবিও । গোলের পর ইয়াশিনকে স্যালুট জানান ‘কালো চিতা’। আজো ‘স্পোর্টসম্যানশিপ’-এর অন্যতম উদাহরণ হয়ে আছে এই ম্যাচটি।

ফুটবলবোদ্ধাদের বিশ্বাস , ইংল্যান্ড সেমিফাইনাল নিয়ে চাতুরী না করলে ১৯৬৬ সালেই বিশ্বকাপ উঠতো ইউসেবিওর হাতে । সেই আসরে নয়টি গোল করে ইউসেবিও ছিলেন সেরা গোলদাতা । ইংল্যান্ড শিরোপা জিতলেও ইতিহাসে ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ স্মরণীয় হয়ে আছে ইউসেবিও’র জন্য ।

বিশ্বকাপে সার্বিক ফলাফলঃ

সব মিলিয়ে ২০১৮ পর্যন্ত পর্তুগাল বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে সাতবার । তিনবার বাদ পড়েছে গ্রুপ পর্ব থেকে । ২০১০ আর ২০১৮ সালে খেলেছে নক আউট পর্ব । ২০০৬ সালে খেলেছে সেমি ফাইনাল । স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জার্মানির কাছে হেরে চতুর্থ হয় ইউরোপের সেলেসাওরা ।

বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সব মিলিয়ে ৩০ ম্যাচ খেলে পর্তুগালের জয়ের সংখ্যা ১৪টি । ড্র ছয়টি আর পরাজয় ১০টি । বিশ্বকাপে পর্তুগীজরা গোল করেছে ৪৯টি আর হজম করেছে ৩৫টি । ২০১০ সালের বিশ্বকাপে কেপ টাউনে উত্তর কোরিয়াকে ৭-০ গোলে হারিয়েছিল পর্তুগাল। এটাই এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে পর্তুগীজদের সবচেয়ে বড় জয় ।

পর্তুগালের হয়ে সবচেয়ে বেশী চারটি বিশ্বকাপ আর সর্বোচ্চ ১৭ ম্যাচ খেলেছেন  ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো । আর তিনটি খেলেছেন পেপে । সবচেয়ে বেশী ৯ গোল ইউসেবিওর । সাত করা রোনালদোর সামনে সেই রেকর্ড ভাঙার সুযোগ আছে ।

পর্তুগালের কিংবদন্তীঃ

পর্তুগালের প্রথম সুপারস্টার ইউসেবিও । যিনি ব্ল্যাক প্যান্থার নামে সবার কাছে পরিচিত । ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ তো তাঁর নামেই বিখ্যাত । ক্লাব ফুটবলে ১৯৬১-৭৪ কাটিয়েছেন বেনফিকায় । ক্লাব ক্যারিয়ারে করেছেন ৫৭৫ ম্যাচে ৫৮০ গোল ! দেশের জার্সিতে ৬৪ ম্যাচে তাঁর গোলের সংখ্যা ৪১ । বেনফিকার হয়ে প্রথম মৌসুমেই জিতে নেন ইউরোপিয়ান কাপ । ফাইনালে রিয়েল মাদ্রিদের বিরুদ্ধে করেন জোড়া গোল । অথচ সেই সময়ে রিয়েল খেলেন বিশ্ব ফুটবলের দুই দিকপাল আলফ্রেডো ডি স্টেফানো আর ফেরেংক পুশকাস । কিন্তু ইউসেবিওর কাছেই তারা হেরে যান ৫-৩ গোলে । আসরে ছয় গোল করা ইউসেবিও ছিলেন দ্বিতীয় সেরা গোলদাতা । আর পুশকাস সাত গোল করে শীর্ষে । কিন্তু ফাইনালের হাসি ইউসেবিওর ।

বেনফিকাতে ১১টি লীগসহ ইউসেবিও জিতেছেন ৩০টি ট্রফি ! জিতেছেন সাতটি পর্তুগীজ লীগ আর তিনটি ইউরোপিয়ান কাপের সেরা গোলদাতার সম্মান । ১৯৬৫ সালের ব্যালন ছিল তাঁর । দুইবার জিতেছেন ইউরোপিয়ান ‘গোল্ডেন-শ্যু’ । ফুটবল বিশ্লেষক, খেলোয়াড়, কোচ- সবার মতেই ইউসেবিও ছিলেন সময়ের চেয়েও অনেক এগিয়ে থাকা এক তারকা। একবিংশ শতাব্দীর আদর্শ স্ট্রাইকারের সব গুণাগুণ ছিল তাঁর মধ্যে।

পর্তুগালের ফুটবল নতুন জীবন ফিরে পায় লুইস ফিগোর সময়ে । উইঙ্গার হিসেবে মাতিয়েছেন পুরো বিশ্ব । লা লীগায় লিওনেল মেসির পরেই তাঁর এসিস্ট সংখ্যা ১০৬টি । খেলেছেন নিজ দেশের বেনফিকা , রিয়েল মাদ্রিদ আর বার্সেলোনায় । ক্লাব ক্যারিয়ারে ৭৯২ ম্যাচে তাঁর গোলের সংখ্যা ১৩৭টি । আর দেশের জার্সিতে ১২৭ ম্যাচে ৩২টি । ২০০১-০২ মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লীগসহ জিতেছেন ২২টি ট্রফি । পর্তুগালকে ২০০৪ সালে ইউরো ফাইনালে নিয়েও ট্রফি জেতাতে না পারা তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় কষ্টের ঘটনা ।লুইস ফিগোর দল ২০০৬ সালে বিশ্বকাপে চতুথ স্থান অর্জন করে । ছয়বার তিনি নির্বাচিত হয়েছেন পর্তুগালের বর্ষসেরা । একবার করে ফিফা আর ব্যালনের সেরা হয়েছেন । লা লীগার সেরা বিদেশী খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন তিনবার ।

পর্তুগালের অতীত সময়ের সেরা তারকাদের মধ্যে রুই কস্টা , ন্যানি , রিকার্ডো কারভালহোদের রাখতে হবে । আরও থাকবে রিকার্ড কুয়েরসেমা , নুনো গোমেজ, ফার্নান্দো পেরেতিও আর পাওলেতা কিংবা ভিক্টর বায়া ।

আধুনিক ফুটবলের রাজা রোনালদোঃ

পর্তুগাল কেন , ফুটবল বিশ্বের সর্বকালের সেরাদের একজন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। এমন মত জোর করে বলতে বাধ্য হয় সংবাদমাধ্যম। কিন্তু গোলের রেকর্ড ও তরুণ বয়সের খেলার ধরণ, তাঁকে সর্বকালের সেরা করে, তাঁর সাথে তুলনা হয় কিভাবে কারোর ?

দেশের হয়ে খেলেছেন সবচেয়ে বেশী ১৯১ ম্যাচ । করেছেন আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে বেশী ১১৭ গোল । আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে বেশী ১০টি হ্যাট্রিক রয়েছে রোনালদোর নামের পাশে ।

বর্তমানে বয়স ৩৭ হলেও রোনালদোর ফিটনেস যে কোন তরুণ ফুটবলারকে লজ্জায় ফেলে দেবার মত । যদিও বয়সের কারণে নিজের খেলার ধারা তিনি খানিকটা পরিবর্তন করেছেন । দলের প্রয়োজনে গোল করাতেই মনযোগী এখন তিনি । সর্বশেষ বিশ্বকাপ বাছাইয়েও তিনি দেশের জার্সিতে করেছেন ছয় গোল ।

ক্লাব ফুটবলেও রোনালদো নিজেকে সবার সেরা প্রমাণ করেছেন । উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগে সবচেয়ে বেশী ১৪০ গোলের সাথে সবচেয়ে বেশী ৪৪ এসিস্টের রেকর্ড রোনালদোর । ক্লাব ক্যারিয়ারে করেছেন সবচেয়ে বেশী ৭০১ গোল । ক্লাব ক্যারিয়ারে তার হ্যাট্রিকের সংখ্যা ৫০টি ।

রোনালদো বিশ্বের একমাত্র খেলোয়াড় , যার রয়েছে ইউরোপের সেরা তিন লীগে একশ গোলের রেকর্ড । আছে তিন সেরা লীগে বর্ষসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হবার কৃতিত্ব । পাঁচটি ব্যালন ডি অর’ , দুইটি ফিফা বর্ষসেরা আর চারটি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুটসহ ক্যারিয়ারে জিতেছেন সম্ভাব্য সব ব্যক্তিগত পুরস্কার । জিতেছেন ক্লাব আর দেশের হয়ে ৩২টি ট্রফি । যার মধ্যে দেশের হয়ে আছে একটি ইউরো আর একটি উয়েফা নেশন্স লীগের শিরোপা ।

সর্বশেষ ২০২১-২২ মৌসুমটি রোনালদোর আকাশ-ছোঁয়া সাফল্যের বিচারে খুব বেশী ভাল যায় নি । নিজের পুরনো ঠিকানা ম্যান ইউতে পান নি প্রত্যাশিত সাফল্য । দলকে রাখতে পারেন নি লীগ টেবিলের সেরা পাঁচে । কিন্তু তাতে সত্যিই রোনালদোর দায় ছিল কিনা সেটা অবশ্যই বিবেচনার দাবী রাখে । কারণ ম্যান ইউর ভীষণ বাজে একটি মৌসুমেও দলের হয়ে দুইটি হ্যাট্রিকসহ ৩৮ ম্যাচে করেছেন ২৪ গোল । যার মধ্যে চ্যাম্পিয়ন্স লীগে ছয়টি আর প্রিমিয়ার লীগে ছিল ১৮গোল । সবচেয়ে বড় কথা , রোনালদোর গোল ছাড়া কোন ম্যাচেই ম্যান ইউর জয় আসে নি । তিনি নির্বাচিত হয়েছেন ইপিএলের বর্ষসেরা একাদশে । যদিও চলতি মৌসুমে কোচ এরিক টেন হ্যাগের সাথে বনিবনা না হওয়ায় মাঠে নামতে পারছেন না নিয়মিত । গোলও পেয়েছেন ১৬ ম্যাচে মাত্র তিনটি । এই ১৬ ম্যাচের সব কয়টিতে প্রথম একাদশে ছিলেন না । সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের আগে রোনালদো তেঁতে আছেন । যা তিনি উশুল করার চেষ্টা করবেন কাতার বিশ্বকাপে ।

পর্তুগাল ছাড়া বিশ্বকাপ নয়ঃ

কাতার বিশ্বকাপের ইউরোপিয়ান বাছাই পর্বে একটা সময় দারুণ সংকটে পড়ে গিয়েছিল পর্তুগাল । রেফারির বিতর্কিত সিদ্ধান্তের শিকার হয়ে পর্তুগাল গ্রুপ পর্বে পায় দ্বিতীয় স্থান । আর সরাসরি গ্রুপ সেরা হয়ে সার্বিয়া পেয়ে যায় কাতারের ছাড়পত্র । যদিও সার্বিয়ার মাঠে ২০২১ সালের দুই দলের প্রথম দেখায় পর্তুগালের জয় পাওনা ছিল । কিন্তু ২-২ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচের শেষদিকে রোনালদোর নিশ্চিত গোল রেফারির ভুলে গণনায় আসে নি । লাইন পার হয়ে যাওয়া বলে গোল না দেয়ায় ম্যাচটি ২-২ গোলে শেষ হয় ।

আর শেষ ম্যাচে পর্তুগাল নিজেদের মাঠে হেরে যায় সার্বিয়ার কাছে । গ্রুপের আট ম্যাচ থেকে সার্বিয়ার পয়েন্ট দাঁড়ায় ২০ আর পর্তুগালের ১৭ । গ্রুপে দ্বিতীয় হওয়ায় পর্তুগালকে খেলতে হয় প্লে-অফে ।

এবারের বিশ্বকাপের প্লে-অফ ফরম্যাট ছিল অন্যরকম । সরাসরি দুই দলের নক আউট প্লে-অফ না হয়ে ছিল চার দলের লড়াই । যেখানে পর্তুগালকে লড়তে হয়েছিল তুরস্ক আর ইটালির মোকাবেলা ছিল উত্তর মেসিডোনিয়ার বিপক্ষে । প্রত্যাশিতভাবে তুরস্ককে হারায় পর্তুগাল । আর সবাইকে অবাক করে দিয়ে উত্তর মেসিডোনিয়ার কাছে ০-১ গোলে হেরে চারবারের বিশ্বসেরা ইটালি বিদায় নেয় টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপের আগেই । গ্রুপ ফাইনালে মেসিডোনিয়াকে হারিয়ে বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় পর্তুগাল ।

প্লে-অফ পর্বে পর্তুগালের চেয়ে বর্তমান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন ইটালিকেই বিশ্বকাপের টিকেট পাওয়ার লড়াইয়ে সবাই এগিয়ে রেখেছিল । কিন্তু প্লে অফ শুরুর আগেই পর্তুগীজ মহানায়ক রোনালদো জানিয়েছিলেন , পর্তুগাল ছাড়া বিশ্বকাপ নয় । তুরস্ক আর মেসিডোনিয়াকে হারিয়ে রোনালদোর সেই কথা সত্য প্রমাণ করে পর্তুগাল ।

বিশ্বকাপ বাছাইয়ে প্লে অফসহ নয় ম্যাচে পর্তুগালের হয়ে সর্বোচ্চ ছয় গোল করেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো । সেই সাথে দলকে বিশ্বকাপে নিতে রাখেন বরাবরের মত প্রধান ভূমিকা ।

পর্তুগালের বিশ্বকাপ স্কোয়াডঃ

কাতার বিশ্বকাপের জন্য পর্তুগাল ২৬ জনের স্কোয়াড ঘোষণা করেছে । যেখানে ইনজুরির কারণে জায়গা হয় নি দিয়াগো জোতার । এছাড়া নেই রিকার্ডো কুয়েরসেমা । অনেকেই মনে করেন , ৩৯ বছরের
উইঙ্গার কুয়েরসেমাকে দলে রাখা প্রয়োজন ছিল । পুরো ম্যাচ না হলেও দরকারের সময় মাঠে নামতে পারতেন ২০ মিনিটের জন্য হলেও । বক্সে তাঁর ক্রস আর দুরুহ কোন থেকে অবিশ্বাস্য শটে গোলের ক্ষমতা এখনও দলের জন্য উপকারী হতে পারতো । যদিও ৮০ ম্যাচে ১০ গোল করা কুয়েরসেমাকে রাখেন নি কোচ স্যান্টোস । তিনি যে ২৬ জন খেলোয়াড় নিয়ে বিশ্বকাপে যাচ্ছেন , তারা হচ্ছেন –

গোলরক্ষক- রুই প্যাট্রিসিও , দিয়াগো কস্টা , জোসে সা

রক্ষণভাগ – হোয়াও ক্যান্সেলো , দিয়াগো ডালোট , নুনো মেন্ডেস , রুবেন ডায়াস, এন্টোনিও সিলভা , পেপে

মধ্যমাঠ- হোয়াও পালিনহা , ম্যাথিউজ নুনেস , উইলিয়াম কারবালহো , রুবেন নেভেস , ব্রুনো ফার্নান্দেজ , জোয়াও মারিও , বার্নাড সিলভা , ভিতিনহা , ওটাভিও

আক্রমণভাগ – হোয়াও ফেলিক্স , ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো , গঞ্জালো রামোস , রাফায়েল লিও , রিকার্ড হর্তা , আন্দ্রে সিলভা।

পর্তুগাল স্কোয়াডে অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের মিশ্রণঃ

পর্তুগালের বিশ্বকাপ স্কোয়াড দারুণ ব্যালেন্সড সন্দেহ নেই । এখানে রোনালদো আর পেপের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড় আছেন । যারা বহু যুদ্ধের বিজয়ী সৈনিক । ২০১০ আর ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ দলে খেলেছেন পেপে । কিন্তু ইনজুরির কারণে খেলা হয় নি সর্বশেষ ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে । তবে চলতি বছর অনুষ্ঠিতব্য কাতার বিশ্বকাপে থাকছেন তিনি । যা নিশ্চিতভাবেই হতে চলেছে তার শেষ বিশ্বকাপ । ২০২০ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি খেলেছেন সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড় হিসেবে । দেশের হয়ে ২০০৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১২৮ আন্তর্জাতিক ম্যাচে করেছেন সাত গোল ।

৩৪ বছরের কিপার রুই প্যাট্রিসিও খেলেছেন ১০৪ ম্যাচ । ৫০টির বেশী ম্যাচ খেলেছেন আন্দ্রে সিলভা , হোয়াও মারিও , উইলিয়াম কারবালহো আর বার্নাড সিলভা । রাফায়েল গুরেইরো আর ড্যানিয়েল পেরেইরাও আছেন এই দলে ।

বার্নাডো সিলভা বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার । খেলতে পারেন উইঙ্গার পজিশনেও । ২০১৫ সাল থেকে আছেন জাতীয় দলের সাথে । খেলেছেন ৭২ ম্যাচ আর করেছেন আট গোল । নিজ দেশের বেনফিকা একাডেমী থেকে উঠে আসা এই তারকা ২০১৭ সাল থেকে আছেন ইংলিশ জায়ান্ট ম্যানচেস্টার সিটিতে । দলের কোচ পেপ গুয়ার্দিওলার অন্যতম আস্থাভাজন খেলোয়াড় সিলভা । ইতোমধ্যেই ম্যান সিটির হয়ে চারটি প্রিমিয়ার লীগ জিতেছেন । ছিলেন সর্বশেষ মৌসুমের সেরা একাদশে । ২০১৯ সালের উয়েফা নেশন্স লীগ ফাইনাল সেরা খেলোয়াড় হয়ে দেশকে জিতিয়েছেন শিরোপা । ২০২১-২২ মৌসুমে সিটিজেনদের হয়ে সব মিলিয়ে ৫০ ম্যাচ খেলা সিলভা করেছেন ১৩ গোল আর এসিস্ট ৭টি । বেনফিকার হয়ে ২০১৩-১৪ মৌসুমে ট্রেবল জয়ের রেকর্ড আছে তার । মোনাকোর হয়ে ফেঞ্চ লীগ ওয়ান জয়টাও তার ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য ।

ডিফেন্ডার হিসেবে ম্যান সিটির হোয়ান ক্যান্সেলো সেরাদের কাতারে পড়েন । ছিলেন সর্বশেষ প্রিমিয়ার লীগের বর্ষসেরা একাদশে । আর থাকবেন নাই না কেন ? ফুল ব্যাক হয়েও তার রয়েছে ড্রিবলিং করার দারুণ ক্ষ্মতা । আছে দুর্দান্ত ফুটবল স্কিলস আর সৃষ্টিশীলতা । দলের প্রয়োজনে আক্রমণে রাখেন বড় ভূমিকা , যা দেখে অনেক সময় তাকে ‘প্লে-মেকার’ হিসেবে ভাবা যায় অনায়াসে । যার প্রমাণ , ২০২১-২২ মৌসুমেই সব মিলিয়ে ৫২ ম্যাচে তার তিন গোল আর দশ এসিস্ট । দেশের জার্সিতে ৩৭ ম্যাচে সাত গোল আছে তাঁর ।

৩০ বছরের দানিলো পেরেরা খেলেন সেন্টার ব্যাক কিংবা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে । প্যারিস সেইন্ট জার্মেইর মত দলের নিয়মিত সদস্য । সর্বশেষ মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে খেলেছেন ৩৭ ম্যাচ আর করেছেন পাঁচ গোল । দেশের হয়ে খেলে ফেলেছেন ৫৩ ম্যাচ । তার আন্তর্জাতিক গোলের সংখ্যা দুইটি ।

২২ বছরের হোয়াও ফেলিক্সকে ধরা হয় পর্তুগালের ভবিষ্যৎ তারকা । ২০১৯ সাল থেকে খেলছেন এথেলতিকো মাদ্রিদের মত বড় দলে । সর্বশেষ মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে করেছেন ১০ গোল । পর্তুগালের হয়ে খেলেছেন ২3 ম্যাচ , যদিও গোল মাত্র তিনটি । তবে ২০১৯ সালের ‘গোল্ডেন-বয়’ খেতাব জয় করা ফেলিক্স প্রত্যাশা মেটাতে পারেন নি এখনও , এটা সত্যি । কিন্তু বিশ্বকাপ ফুটবলে সুযোগ পেলে তিনি নিজেকে প্রমাণের সবচেয়ে বড় সুযোগ পাবেন ।

এছাড়া এসি মিলানের উইঙ্গার রাফায়েল লিয়াও , পিএসজির মিডফিল্ডার ভিতিনহা কিংবা পোর্টোর ওতাভিও , ম্যান ইউর ব্রুনো ফার্নান্দেজ প্রত্যেকের বয়স ২৩-২৮ । যারা পর্তুগালের ভবিষ্যৎ । ইতোমধ্যে দলে নিজেদের প্রমাণও করেছেন । তাদের নিয়ে কাতার বিশ্বকাপের অন্যতম ব্যালেন্সড দল পর্তুগাল ।

পর্তুগালের কাতার মিশনঃ

কাতার বিশ্বকাপে পর্তুগাল খেলবে ‘এইচ’ গ্রুপে । গ্রুপে তাদের প্রতিপক্ষ উরুগুয়ে , ঘানা আর দক্ষিণ কোরিয়া । উরুগুয়ের কাছে হেরেই ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ নক আউট পর্ব থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল পর্তুগীজদের । লুইস সুয়ারেজ , এডিসন কাভানি , হোসে গেমিনেজ , দিয়াগো গোডিন , রোনাল্ড আরাউহো আর রদ্রিগো বেন্টাকুরদের নিয়ে উরুগুয়ে এবারেও শক্তিশালী দল । অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া সব সময়েই সমীহ জাগানিয়া লড়াকু দল । দলে আছেন সং হিউং মিনের মত দুর্দান্ত স্ট্রাইকার । যিনি সর্বশেষ ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে হয়েছেন সেরা গোলদাতা । এশিয়া তথা নিজেদের মাটিতে ২০০২ সালে তারা খেলেছে বিশ্বকাপ সেমি ফাইনালে । দলটির রয়েছে যে শক্তিশালী দলকে আটকে দেয়ার বিপুল ক্ষমতা । বিশ্বকাপের মত আসরে ইটালি , জার্মানি আর স্পেনের মত হেভিওয়েটদের হারাবার অভ্যাস আছে । এমনকি ২০০২ সালে বিশ্বকাপের একমাত্র দেখায় লুইস ফিগোদের পর্তুগালকে হারিয়ে দিয়েছিল কোরিয়ানরা । অন্যদিকে ঘানা আফ্রিকার প্রতিষ্ঠিত শক্তি । তারাও ছেড়ে কথা কইবে না কাউকে ।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে , পর্তুগালের জন্য গ্রুপ পর্বটি হতে চলেছে বেশ কঠিন । যদিও বিশ্বকাপ জয়ের মিশনে প্রতিটা ম্যাচই বড় ম্যাচ হিসেবে ধরে নিয়ে খেলতে হবে । আর গ্রুপের তিন দল লড়াকু হলেও তারা অবশ্যই শক্তির বিচারে পর্তুগীজদের সমকক্ষ নয় ।ফিফা র‍্যাংকিংয়ে পর্তুগাল যেখানে ৯ম অবস্থানে , সেখানে উরুগুয়ের অবস্থান সেখানে ১৪তম । আর দক্ষিণ কোরিয়া ২৮ এবং ঘানা ৬১তম । বিশ্বকাপে যদিও ফিফা র‍্যাংকিং কোন প্রভাব রাখে না , তবু এই গ্রুপ থেকে যে কোন বিবেচনাতেই পর্তুগীজদের অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখতে হবে ।

আগামী ২৪ নভেম্বর পর্তুগাল প্রথম মাঠে নামছে ঘানার বিপক্ষে । ২৮ নভেম্বরের দ্বিতীয় ম্যাচে প্রতিপক্ষ উরুগুয়ে । আর ২ ডিসেম্বর এশিয়ান পাওয়ার-হাউজ দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে খেলবে পর্তুগাল ।

অসম্ভব, পর্তুগাল বিশ্বকাপ জিততে পারবে না ! এমন স্লোগানে থাকুক ব্রাজিল, আর্জেন্টিনাসহ অন্যান্য দেশের ভক্তকুল। বাংলাদেশও বলুক, পর্তুগাল আবার কিসের বড় ফুটবল দেশ ? বাকীটা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও তাঁর দল জবাব দিক।

আহাস/ক্রী/৭১৭