Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

সাবিনা পারবেন বাংলাদেশের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো হতে ?

আহসান হাবীব সুমন/ক্রীড়ালোকঃ

সাবিনা খাতুন । বাংলাদেশের নারী জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক । যাকে বলা হয় গোল-ম্যাশিন । অনেকেই তাকে ভালবেসে ডাকে বাংলাদেশের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো যা লিওনেল মেসি । রোনালদো আর মেসির মতই একের পর এক রেকর্ড গড়ে সাবিনা সমৃদ্ধ করে চলেছেন বাংলাদেশের ফুটবলকে । যদিও গোল করার নেশা আর হারতে না চাওয়ার ‘অদম্য’ নেশাকে তুলনা করা যায় রোনালদোর সাথে ।

সাবিনা খাতুনের মাঠে নামা মানেই রেকর্ড । দেশের হয়ে ৪৫ আন্তর্জাতিক ম্যাচে তার গোলের সংখ্যা ৩১টি । যা পুরুষ কিংবা নারী – সব বিভাগ মিলিয়ে সর্বকালের সেরা । এখন পর্যন্ত সাফের ছয়টি আসরেই খেলেছেন ২৮ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড । করেছেন সর্বোচ্চ ২০ গোল । সাফের চলতি আসরেও তার গোলের সংখ্যা আটটি । হ্যাট্রিক দুইটি । কখনও সাফের সেরা গোলদাতার পুরস্কার জেতা হয় নি । জেতেন নি সাফের শিরোপাও । ২০২২ সালে সেই দুইটি অর্জনও হয়ত লেখা হয়ে যাবে সাবিনার নামের পাশে ।

সাতক্ষীরার মেয়ে সাবিনা খাতুনের জন্ম ১৯৯৩ সালের ২৫ অক্টোবর । বাবা সৈয়দ গাজী আর মা মরিয়ম বেগমের চতুর্থ সন্তান তিনি । ক্লাশ এইটে থাকাকালীন ফুটবলে হাতেখড়ি । কোচ আকবর আলীর পরিচর্যায় সাবিনার বেড়ে ওঠা । সাতক্ষীরার আকবর আলী বাংলাদেশের ফুটবলে তৃণমূল পর্যায়ে খেলোয়াড় তৈরির কারিগর ছিলেন । সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের নিজের আগ্রহে ফুটবল মাঠে নিয়ে যেতেন। নিজের বাড়িতে রেখে নিয়মিত অনুশীলন করাতেন। শুধু খেলা নয়, পড়াশোনার খরচও মেটাতেন খেলোয়াড়দের। ফুটবলার সাবিনাই নয়, দেশের ফুটবলের প্রথম পেশাদার নারী কোচ ও সাবেক ফুটবলার মিরোনা খাতুন, জাতীয় দলের ফুটবলার সুরাইয়া খাতুন, মাসুরা পারভীনদেরও কোচ ছিলেন আকবর আলী। জাতীয় কাবাডি দলে খেলা একাধিক নারী খেলোয়াড় আকবর আলীর হাতে তৈরি। দেশের সাবেক দ্রুততম মানবী শিরিন এবং নিজের যমজ মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস ও ফাতেমা তুজ জোহরাও ছিলেন আকবর আলীর হাতে গড়া।

সেই আকবর আলী পৃথিবীর মায়া ছেড়েছেন চলতি বছরের আগস্টের ২ জুন । কিন্তু তার হাতে গড়া সাবিনা ‘গুরু’র শেখানো মন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে দেশের ফুটবলকে এগিয়ে নিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সামনে থেকে । ২০০৯-১২ পর্যন্ত নিজ জেলা সাতক্ষীরার হয়ে ২১ ম্যাচে ৭০ গোল করেছেন । বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ দলে তার গোলের সংখ্যা ৫ ম্যাচে ১টি ।

২০১০ সাল থেকে সাবিনা খেলছেন মুল জাতীয় দলে । ২০২২ সালে করেছেন আন্তর্জাতিক ফুটবলে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বেশী ৯ গোল । এখনও বছর শেষ হয় নি । এই সংখ্যা আরও বাড়বে , অনেকটা নিশ্চিত ।

ঘরোয়া ফুটবলে সাবিনা খেলছেন শুরু থেকেই । ২০১১ সালে প্রথমবারের মতো আয়োজিত নারী ফুটবল লীগে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের হয়ে খেলে ২৫ গোল করেছিলেন। দুই বছর পর ২০১৩ সালে দ্বিতীয়বার আয়োজিত লিগে ২৮ গোল করে ধারাবাহিকতা অব্যহত রেখেছিলেন। ২০২২-২১ মৌসুমে বসুন্ধরার হয়ে করেছেন ২৭ গোল । জাতীয় দলের তার সতীর্থ কৃষ্ণা রাণী সরকার ২৮ গোল করে ছিলেন সেরা গোলদাতা ।

নারীদের ফুটবল লীগে এখন পর্যন্ত ৩৫ ম্যাচ খেলা সাবিনার গোলের সংখ্যা ১১৫টি ! এর মধ্যে ২০১৯-২০ মৌসুমে বসুন্ধরা কিংসে নাম লিখিয়ে করেছেন ৩৫ গোল । যা বাংলাদেশের ফুটবলে এক লীগ মৌসুমে যে কোন পর্যায়ে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড । ছেলেদের ফুটবলে ১৯৮২ সালে ঢাকা লীগে সালাম মুর্শেদি ২৭ গোল করেছিলেন । এছাড়া ২০১৩ সালে জাতীয় মহিলা ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপেও সর্বোচ্চ গোলদাতার খেতাব জিতেছিলেন।

বাংলাদেশে মাত্র চারটি ঘরোয়া মৌসুমে গোলের সেঞ্চুরি সাবিনা ছাড়া আর কারো নেই । এছাড়া ১৯২০ সালের লীগে আটটি হ্যাট্রিক করেছিলেন সাবিনা । যা হয়ত আগে কল্পনাও করে নি কেউ ।

সাবিনা বাংলাদেশের প্রথম নারী ফুটবলার হিসেবে খেলেছেন বিদেশের ক্লাবে । ২০১৪ সালে পাকিস্তানে মহিলা সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে মালদ্বীপের বিপক্ষে জয়ে গুরুত্বপূর্ণ দু’গোল করেন সাবিনা। এর মাধ্যমেই মালদ্বীপ ফুটবল কর্তাদের নজরে আসেন তিনি। এরপর দেশের প্রথম প্রমীলা ফুটবলার হিসেবে দেশের বাইরের লিগে খেলার সুযোগ পান সাবিনা। এর আগে কাজী সালাউদ্দিন, কায়সার হামিদ, প্রয়াত মোনেম মুন্না এবং মামুনুল হক দেশের বাইরে খেলার ডাক পেলেও নারী হিসেবে সাবিনাই প্রথম।

তবে প্রথমবারেই বিদেশি লিগে খেলতে গিয়ে সাবিনা যে কৃতিত্ব করেছেন তা বোধহয় রূপকথাকেও হার মানায়। মালদ্বীপে পুলিশ ক্লাবের পক্ষে অভিষেকেই করেছেন চার গোল, পরের ম্যাচে একাই করেছেন ১৬ গোল (৫টি হ্যাটট্রিক!)। এর আগে ঢাকার মাঠে একবার এক ম্যাচে ১৪ গোলের রেকর্ড ছিল এই স্ট্রাইকারের। মালদ্বীপে মোট ছয় ম্যাচে সাবিনা গোল করেছিলেন ৩৭ টি এবং এর পাঁচটিতেই ছিলেন ম্যাচসেরা।

মালদ্বীপ ছাড়াও ভারতে তামিলনাড়ুর সেথু এফসির হয়ে খেলেছেন । সেখানে ৭ ম্যাচে ৬ গোল করে এসেছেন । বাংলাদশে বাংলাদেশ ভিডিপি , শেখ জামাল , মোহামেডান , বিজেএমসি হয়ে এখন খেলছেন বসুন্ধরা কিংসে ।

ব্রাজিলের তারকা মার্তাকে আদর্শ মানেন সাবিনা। ‘স্কার্ট পরা পেলে’ হিসেবে পরিচিত মার্তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে একটি দেশের নারী ফুটবলের সমার্থক হয়ে গেছেন সাবিনা। মার্তাকে ছাড়িয়ে তিনি এখন বাংলাদেশের মানুষের কাছে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো পর্যায়ে । যে রোনালদোর কাঁধে চড়ে একদিন পর্তুগাল জিতেছিল প্রথম আন্তর্জাতিক ট্রফি , তেমনি সাবিনার অধিনায়কত্বে বাংলাদেশ জিতবে সাফ নারী ফুটবলের প্রথম শিরোপা । দেশের নারী ফুটবলে আসবে প্রথম আন্তর্জাতিক ট্রফি – এমন স্বপ্নে বিভোর এখন বাংলাদেশের মানুষ ।

সাবিনা কি পারবেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো হয়ে বাংলাদেশের নারী ফুটবলের প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা এনে দিতে ?

আহাস/ক্রী/০০৩