Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

নেশন্স লীগের সেমি ফাইনাল খেলছে কারা ?

আহসান হাবীব সুমন/ক্রীড়ালোকঃ

দিনে দিনে বিশ্ব ফুটবলে বেড়ে চলেছে ইউরোপিয়ান ফুটবলের আধিপত্য ।ফুটবলে ক্রমে শক্তিশালী হচ্ছে ইউরোপের পিছিয়ে পড়া দেশগুলো । যে কারণে ফুটবলে বাড়ছে অন্যান্য দেশের সাথে ইউরোপের পার্থক্য । বিশ্বকাপ ফুটবলের দিকে তাকালেই যে পার্থক্য পরিস্কার ধরা পড়ে । যেখানে ল্যাটিনের তিন দেশ ব্রাজিল , আর্জেন্টিনা আর উরুগুয়ে মিলে বিশ্বকাপ ট্রফি জিতেছে ৯বার , সেখানে ইউরোপে বিশ্বকাপ গেছে ১২বার । ২০০২ সালের পর ল্যাটিনের কোন দেশ বিশ্বকাপ জয় করতে পারে নি । এই সময়ে কেবল আর্জেন্টিনা ২০১৪ সালের ফাইনালে খেলেছে । নইলে বিশ্বকাপে এখন চলছে ইউরোপিয়ানদের একচেটিয়া আধিপত্য ।

শুধু বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের হিসেব বাদ দিলেও , অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বিবেচনাতেও ইউরোপ সবচেয়ে এগিয়ে । কাতার বিশ্বকাপের ৩২টি দেশের মধ্যে ১৩টি ইউরোপের । পাঁচটি দেশ যাচ্ছে আফ্রিকা থেকে । স্বাগতিক কাতার থাকায় ছয়টি দেশ পেয়েছে এশিয়া থেকে ২০২২ সালের বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ । কনকাকফ আর ল্যাটিন থেকে চারটি দেশ পেয়েছে কাতার বিশ্বকাপে খেলার ছাড়পত্র ।

ইউরোপের বিশ্বকাপ বাছাই প্রতিযোগিতা এত বেশী কঠিন যে টানা দ্বিতীয়বার বাদ পড়েছে চারবারের চ্যাম্পিয়ন ইটালি । অথচ ২০২১ সালে ইটালি জিতেছে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ । এছাড়া সুইডেন , তুরস্কের মতো শক্তিশালী দলও পায় নি বিশ্বকাপের টিকেট । পর্তুগালকে খেলতে হয়েছে প্লে-অফ ।

ইউরোপের ফুটবল এখন এতটা শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে গেছে যে , মহাদেশটি থেকে কমপক্ষে ২০টি দলের যোগ্যতা আছে বিশ্বকাপ খেলার । ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের জমজমাট লড়াই যার প্রমাণ । বিশ্বকাপের পর সবচেয়ে বড় ট্রফি হিসেবে সমাদৃত উয়েফা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ । তবে সম্প্রতি ইউরোপের ফুটবলের সাশক সংস্থা উয়েফা চালু করে আরও একটি টুর্নামেন্ট , যার নাম উয়েফা নেশন্স লীগ । উয়েফার অধীনে থাকা জাতীয় দলগুলোকে আরও শক্তিশালী করা ও তাদের মধ্যে আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে এই টুর্নামেন্ট শুরু । এটি বিশ্বকাপ বা অন্য টুর্নামেন্টের মতো কোন নির্দিষ্ট সময়ের আসর নয় । বরং পুরো একটি মৌসুম জুড়ে নিজেদের ধারাবাহিকতার প্রমাণ দিয়ে লড়তে হয় এই আসরে ।

উয়েফার সদস্য ৫৫ দেশকে ভাগ করা হয়েছে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে । র‍্যাংকিং ভিত্তিতে ১৬টি করে দল খেলছে দুইটি ভিন্ন টায়ারে । তবে এই র‍্যাংকিং ফিফার নিজস্ব র‍্যাংকিং নয়। প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্টগুলোতে দলগুলোর হার/জিতের উপর ভিত্তি করে করা উয়েফার কো-এফিশিয়েন্ট পয়েন্টের ভিত্তিতে এই র‍্যাংকিং করা হয়েছে। লীগ ‘সি’তেও আছে ১৬টি দল । আর সবচেয়ে নিচের স্তর ‘ডি’ টায়ারে খেলছে সাতটি দেশ ।

২০১৮-১৯ থেকে শুরু হওয়া নেশন্স লীগের তৃতীয় আসর চলছে । মাঝে করোনা মহামারীতে একটি আসর চলে গেছে মহাকালের গর্ভে । প্রথম আসরের শীর্ষ লীগে শিরোপা জিতেছিল পর্তুগাল । আর গতবার ফ্রান্স ।

উয়েফা নেশন লীগের সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার হচ্ছে , প্রতি গ্রুপে প্রায় কাছাকাছি শক্তির দলের উপস্থিতি । মাত্র একটি করে দল সুযোগ পায় সেমি ফাইনালে । তাই প্রতিটা গ্রুপ বলতে গেলে ‘মরণ-ফাঁদ’ । চলতি আসরেও হোম এন্ড এওয়ে ভিত্তিক টুর্নামেন্টে কোন চার দল সেমিতে খেবে নিশ্চয়তা নেই । অথচ সবার ৬টি করে ম্যাচ খেলা হয়ে গেছে । বাকী আছে মাত্র ২টি !

আবার প্রতি গ্রুপের সবার নীচে অবস্থান করা দল রেলিগেটেড হবে পরের টায়ারে , কি এক যন্ত্রণা !

‘লীগ-এ’ তে গ্রুপ-১ এর কথাই ধরা যাক । এই গ্রুপে ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ আর ২০২১-২২ মৌসুমে নেশন্স লীগজয়ী ফ্রান্সের সাথে আছে ক্রোয়েশিয়া , অস্ট্রিয়া আর ডেনমার্ক । টুর্নামেন্ট শুরুর আগে তারা গ্রুপের ফেভারিট হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল । অথচ চার ম্যাচে ২ পয়েন্ট পাওয়া ফ্রান্স আছে অবনমনের শংকায় ।

এই মুহূর্তে গ্রুপ-১ থেকে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে ডেনমার্ক । তারা পেয়েছে চার ম্যাচে ৯ পয়েন্ট । আর ক্রোয়েশিয়া ৭ পয়েন্ট নিয়ে রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে । ফ্রান্সের শেষ দুই ম্যাচ অস্ট্রিয়া আর ডেনমার্কের বিপক্ষে । এই দুই ম্যাচে ফ্রান্স জিতলে তাদের অবনমন রক্ষা পাবে । কিন্তু কপাল পুড়বে ডেনিশদের ।

ক্রোয়েশিয়ার ম্যাচ আছে দুইটি । অস্ট্রিয়া আর ডেনমার্কের বিপক্ষে । ফ্রান্সের সাথে ডেনমার্ক হেরে গেলে আর অস্ট্রিয়ার সাথে ক্রোয়েশিয়া জিতলে ঘুরে যাবে পরিস্থিতি । তখন দুই দলের পয়েন্ট দাঁড়াবে ক্রোয়েশিয়া ১০ আর ডেনমার্ক ৯ । তখন ডেনমার্ক আর ক্রোয়েশিয়ার লড়াইয়ে নিশ্চিত হবে কে খেলছে সেমিতে ।

আবার চার ম্যাচে চার পয়েন্ট পাওয়া অস্ট্রিয়ার সামনেও কাগজে-কলমে সেমি ফাইনাল খেলার সুযোগ আছে । শেষ ম্যাচে ক্রোয়েশিয়া আর ডেনমার্ক হারলে এবং অস্ট্রিয়া জিতলে ১০ পয়েন্ট নিয়ে তারাই খেলবে সেমিতে । যদিও কাজটা অনেকটাই অসম্ভব ।

‘লীগ-২’ পরিস্থিতিও জটিল । ৮ পয়েন্ট নিয়ে স্পেন শীর্ষে আর পর্তুগাল ৭ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় । পর্তুগীজদের পরবর্তী ম্যাচ চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে । যারা পেয়েছে চার ম্যাচে চার পয়েন্ট । তাই কাগজে কলমেও তাদেরও আছে সেরা চারে খেলার সুযোগ । অন্যদিকে , পরের ম্যাচে স্পেনের মোকাবেলা সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে । সুইসরা পেয়েছে চার ম্যাচে ৩ পয়েন্ট ।

চেকদের বিপক্ষে প্রতিপক্ষের মাঠে পর্তুর খেলা । অন্যদিকে সুইসদের সাথে নিজ মাটিতে খেলবে স্পেন । তাই সপ্তম রাউন্ডে অনেক কিছু ঘটে যাবার সম্ভাবনা আছে । তা নয়ে পর্তুগাল আর স্পেন নিজ নিজ ম্যাচ জিতে গেলে সেমির ফয়সালা হবে দুই পরাশক্তির লড়াইয়ে । সেটা আবার পর্তুগালের মাঠে হওয়ায় খানিকটা চাপে থাকবে লা রোযারা । তাই চেকদের মাঠে জিতে নিজ মাটিতে স্প্যানিশ বধের পরিকল্পনা করবে রোনালদো এন্ড কোং সন্দেহ নেই ।

‘লীগ-৩’ জার্মানি আর ইটালিকে পেছনে ফেলে শীর্ষে বসে আছে হাঙ্গেরি । যারা পেয়েছে চার ৭ পয়েন্ট । জার্মানি ৬ আর ইটালি ৫ । শেষ দুই ম্যাচে তিন দলের সামনেই সেমি ফাইনালে খেলার সুযোগ থাকছে । অথচ এই গ্রুপে ইংল্যান্ড ২ পয়েন্ট নিয়ে অবনমন অঞ্চলে !

শেষ দুই রাউন্ডে হাঙ্গেরি আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলবে জার্মানি । ইটালি খেলবে ইংল্যান্ড আর হাঙ্গেরির বিপক্ষে । এই তিন ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণ করবে গ্রুপ থেকে কোন দল যাবে সেমিতে ।

‘গ্রুপ-৪’ বরং সুবিধাজনক অবস্থানে আছে হল্যান্ড । চার ম্যাচে তাদের পয়েন্ট ১০ । শেষ দুই ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম আর পোল্যান্ড । যেখানে একটি জয় পেলেই ডাচরা উঠে যাবে সেমিতে । যদিও ৭ পয়েন্ট পাওয়া বেলজিয়াম ছাড় দেবে না । তাদের খেলা বাকী ওয়েলসের সাথে । শেষ ম্যাচের প্রতিপক্ষ হল্যান্ড । পোল্যান্ড ৪ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় । আর ১ পয়েন্ট নিয়ে সবার নীচে ওয়েলস । ওয়েলসের লড়াই এখন অবনমন থেকে বাঁচার ।

আগামী ২২ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে নেশন্স লীগের শেষ দুই রাউন্ডের ম্যাচ ল। যেখানে সেমিতে ওঠার হিসেব-নিকেশ তো আছেই । সাথে দর্শকদেড় জন্য বাড়তি পাওনা স্পেন-পর্তুগাল , স্পেন-ইংল্যান্ড , ইটালি-স্পেন , হল্যান্ড-বেলজিয়ামের ম্যাচ দেখার সুযোগ । যা সেমি ফাইনাল বা ফাইনালের চেয়ে কোন অংশে কম না ।

এখন পর্যন্ত ‘লীগ-এ’ তে শেষ হয়েছে ৩২ ম্যাচ । যেখানে গোল হয়েছে ৮৭টি । সবচেয়ে বেশী তিনটি গোল হল্যান্ডের মেমফিস ডিপের । দুইটি করে গোল আছে রোনালদো , হোয়াও ক্যান্সেলোসহ অনেকের । আবার একটি করে গোলের দেখা পেয়েছেন রবার্ট লেভেন্ডস্কি , করিম বেঞ্জেমা , কিলিয়ান এমবাপ্পে, থমাস মুলার , কেভিন ডি ব্রুইন আর লুকা মদ্রিচরা ।

শেষ দুই রাউন্ডে সেমির সম্ভাবনা বাঁচিয়ে রাখতে সেরা তারকাদের নিয়েই লড়াইয়ে নামছে ইউরোপের জায়ান্টরা । তাছাড়া বিশ্বকাপের আগে শেষ প্রতিযোগিতামূলক খেলা বলে নেশন্স লীগের শেষ রাউন্ডের গুরুত্ব বেড়ে গেছে অনেক । সব দলের কোচ বিশ্বকাপের আগে এই দুই ম্যাচেই নিজেদের সেরা কম্বিনেশন বের করতে চাইবেন । যা হবে বাড়তি আকর্ষণ ।

২০২৩ সালের জুনে অনুষ্ঠিত হবে উয়েফা নেশন্স লীগের দুই সেমি-ফাইনাল । তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ । ১৮ জুন ফাইনালের মধ্য দিয়ে শেষ হবে আসর ।

আহাস/ক্রী/০০৫