Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

নতুন চ্যাম্পিয়নের অপেক্ষায় সাফ ফুটবল

আহসান হাবীব সুমন/ক্রীড়ালোকঃ

সাফ নারী ফুটবলে ফাইনালে ভারত নেই , এটাই এক বড় বিস্ময় । কারণ পূর্ববর্তী পাঁচটি আসরের শিরোপা ভারত ছাড়া অন্য কেউ ছুঁয়েও দেখতে পারেনি । কিন্তু ২০২২ সালের সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের আগেই ছিটকে গেছে ভারত । তাই নিশ্চিতভাবেই প্রথমবারের মতো সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ পাচ্ছে নতুন চ্যাম্পিয়ন ।

কিন্তু কে হবে সেই নতুন চ্যাম্পিয়ন ? বাংলাদেশ নাকি নেপাল ? সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে সোমবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দশরথের রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় বিকেল সোয়া পাঁচটায় শুরু হওয়া ম্যাচে ।

বাংলাদশের বিপক্ষে ফাইনালে স্বাগতিক হিসেবে এগিয়ে থাকবে নেপালের মেয়েরা । তাছাড়া টুর্নামেন্টের ইতিহাসে ভারতের পর সফলতম দল তারাই । শিরোপা না জিতলেও পাঁচ আসরের চারটি ফাইনাল খেলেছে নেপালের মেয়েরা । অন্যদিকে, ২০১৬ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে বাংলাদেশ ।

টুর্নামেন্টে এখনও অপরাজিত দল বাংলাদেশ আর নেপাল । ‘এ’ গ্রুপে বাংলাদেশ হারিয়েছে মালদ্বীপ , পাকিস্তান আর ভারতকে । গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচে বাংলাদেশ ১২ গোলের বিপরীতে কোন গোল হজম করেনি ।

বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচে মালদ্বীপকে হারায় ৩-০ গোলে । পরের ম্যাচে ৬-০ গোলে পাকিস্তানকে । আর শেষ গ্রুপ ম্যাচে শক্তিশালী ভারতের মেয়েদের উড়িয়ে দিয়েছে ৩-০ গোলে ।

সেমি ফাইনালে ভূটান দাঁড়াতেই পারে নি বাংলাদেশের সামনে । উড়ে গেছে ৮-০ গোলে ।

চলমান আসরে আট গোল নিয়ে শীর্ষ গোলদাতা বাংলাদশের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন । পাকিস্তান আর ভুটানের বিপক্ষে করেছেন দুইটি হ্যাট্রিক । চার গোল করেছেন আরেক ফরোয়ার্ড সিরাত জাহান স্বপ্না । দুইটি করে গোল আছে কৃষ্ণা রাণী সরকার , ঋতু চাকমা আর মাসুরা পারভিন। একটি করে গোল দিয়েছেন মনিকা চাকমা আর তহুরা খাতুন ।

পাঁচ ম্যাচে সাতজন খেলোয়াড় গোল পেয়েছেন । যা বাংলাদেশের জন্য আত্মবিশ্বাসের বাড়তি জ্বালানি । কারণ প্রয়োজনের সময় সবাই গোল করতে পারছেন । দেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ আর মুল ভরসা সাবিনা ভারতের বিপক্ষে গোল পাননি । কিন্তু স্বপ্নার জোড়া গোল কৃষ্ণা সরকার বাংলাদেশকে ঠিকই জয় এনে দিয়েছেন । যা প্রমাণ করে , মেয়েদের এই দলটি একক কোন খেলোয়াড়ের উপর নির্ভরশীল না । বরং দলগত খেলায় ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে ।

অন্যদিকে , নেপাল ‘বি’ গ্রুপে জিতেছে শ্রীলঙ্কা আর ভুটানের বিপক্ষে । নেপালও দুই ম্যাচে ১০ গোল দিয়েছে । কিন্তু তাদের জালে কেউ বল ফেলতে পারেনি । প্রথম ম্যাচে ভুটানকে ৪ গোল আর দ্বিতীয় ম্যাচে মালদ্বীপকে পাঁচ গোল দিয়েছে হিমালয়ের কন্যারা । আর সেমিতে ভারতকে হারিয়েছে ১-০ গোলে ।

অর্থাৎ ফাইনালের আগে বাংলাদেশ আর নেপাল অপরাজিত তো বটেই , একটি গোল হজম না করেই খেলতে নামছে । তাই বাংলাদেশ ও নেপালের যে দলই চ্যাম্পিয়ন হোক তাদের ভাঙতে হবে প্রতিপক্ষের শক্ত রক্ষণ দেওয়াল।

নেপাল দলে সাবিনা বা স্বপ্নার মতো কুশলী ফরোয়ার্ড নেই । বরং তাদের দলের সবাই আক্রমণাত্মক ফুটবলে গোল করতে পারদর্শী । দলের আনিতা , সাবিত্রা , আমিশা আর রেশমি করেছেন দুইটি করে গোল । একটি করে গোলের দেখা পেয়েছেন আরও তিনজন ।

সর্বশেষ নারী ফুটবলে বসুন্ধরা কিংসের হয়ে ২৮ গোল করে সেরা গোলদাতা ছিলেন কৃষ্ণা । ২৭ গোল করেছিলেন সাবিনা । একই দলের স্বপ্নার আছে ১১ গোল । সব মিলিয়ে বাংলাদেশের তিন ফরোয়ার্ড সাফল্যের মধ্যেই আছে । যার প্রমাণ মিলছে চলতি সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে ।

ফাইনালের আগে বাংলাদেশের জন্য একটি দুঃসংবাদ আছে । ইনজুরির কারণে শিরোপা নির্ধারণী ফাইনাল খেলা নিশ্চিত না সিরাত জাহান স্বপ্নার । তিনি ভুটানের বিপক্ষে সেমিফাইনালের ১২ মিনিটের সময় ডান পায়ের মাংসপেশিতে টান পেয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন । স্বপ্না ফাইনাল খেলতে না পারলে বাংলাদেশের জন্য হবে বড় একটি ধাক্কা ।

তবে নেপালের  জন্য আছে সুখবর ।স্ট্রাইকার সাবিত্রা ভান্ডারি ডেঙ্গুর কারণে শেষ দুই ম্যাচ খেলেননি। মাঞ্জালি কুমারি ইয়ঞ্জানও একই কারণে ছিলেন না। তারা সুস্থই বলা চলে। বিশেষ করে সাবিত্রাকে প্রথম একাদশে দেখা যেতে পারে।

নেপালের বিপক্ষে সাফ ফুটবলে কোন জয় নেই বাংলাদেশের মেয়েদের । তিনবারের দেখায় হেরেছে প্রতিটা ম্যাচে । সর্বশেষ ২০১৯ সালে গ্রুপ পর্বে নেপালের কাছে ০-৩ গোলে হেরেছিল বাঘিনীরা । সব মিলিয়ে তিন ম্যাচে নেপালের কাছে ৭ গোল হজমের রেকর্ড আছে মেয়েদের জাতীয় দলের । কিন্তু এখনও নেপালের জালে বল ফেলতে পারেনি মেয়েরা । অবশ্য ভারতের বিপক্ষেও আগে জয় ছিল না । কিন্তু দাপটের সাথে সাফের একচ্ছত্র ‘রাণী’দের হারিয়েছে বাংলাদেশ । তাই নেপালকে কেন নয় ?

নেপালের কোচ কুমার থাপা অবশ্য পূর্ব-পরিসংখ্যান নিয়ে মাথা ঘামাতে নারাজ । তার কাছে বাংলাদেশের বর্তমান স্কোয়াড আগের যে কোন সময়ের তুলনায় শক্তিশালী । তিনি জানান , ‘ বাংলাদেশের দলটির শক্তি ও স্পিরিট খুব ভালো এবং আমরা তাদের সমীহ করছি। বাংলাদেশ একটি তরুণ দল, আগের চেয়েও শক্তিশালী। ‘

তবে নিজ দেশের শিরোপা জয়ে কোন ছাড় দিচ্ছেন না কুমার থাপা । জানিয়েছেন , ‘ আমরা সাফের ট্রফি বাইরে যেতে দেব না । এটা এখন নেপালে আছে , নেপালেই থাকবে । পুরো আসর ভাল খেলেছি । ফাইনালে হেরে আমাদের দেশের মানুষকে কষ্ট দিতে চাই না! ‘

নেপালের নারী জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে এটি কুমারের দ্বিতীয় মেয়াদ। তার অধীনে ২০১৬ সালের সেমিফাইনালে তারা বিদায় নিয়েছিল। ওটাই ছিল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে ফল। তাছাড়া প্রত্যেকটি ফাইনালেই তারা হেরেছে এবং এবার সেরা রেকর্ড করতে মুখিয়ে কোচ।

নেপালের কোচের বার্তা পরিস্কার । কিন্তু কি ভাবছেন বাংলাদেশের কোচ গোলাম রাব্বানি ছোটন ?

২০১০ সাল থেকে মেয়েদের ফুটবলে কোচের দায়িত্ব পালন করছেন ছোটন। বয়সভিত্তিক দলের সঙ্গে পাঁচটি ট্রফি জেতা এই কোচ কখনও সিনিয়র দলের হয়ে চ্যাম্পিয়ন হতে পারেননি। এবার সেই আক্ষেপ ঘুচানোর দ্বারপ্রান্তে তিনি। ফাইনাল খেলার জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুত বললেন ছোটন, ‘আমাদের খেলোয়াড়রা ফাইনাল খেলতে প্রস্তুত। আমরা মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত। ফাইনালের জন্য আমাদের পরিকল্পনা আছে এবং সেই অনুযায়ী খেলবো।’

টুর্নামেন্ট জুড়ে দাপট দেখালেও ফাইনাল কঠিন হতে যাচ্ছে মনে করেন বাংলাদেশ কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন, ‘স্বাগতিক দলের বিপক্ষে খেলা সবসময় কঠিন। কিন্তু আমরা ফাইনালের জন্য আত্মবিশ্বাসী।’

বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে বেশী ৩১ গোলের মালিক সাবিনা । শুধু মেয়েদের ফুটবলে না , ফুটবলের যে কোন পর্যায়ে সাবিনার চেয়ে আন্তর্জাতিক গোল কারো বেশী নেই । সাফের প্রতিটা আসরে খেলা সাবিনার গোলের সংখ্যা ২০টি । কিন্তু কখনও সাফে সেরা গোলদাতা কিংবা শিরোপা জয়ের স্বাদ পান নি । ২০১৪ সালের আসরে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছিলেন ।

২০২২ সালে প্রথমবারের মতো সাফ শিরোপা ছুঁয়ে দেখতে চান দেশের হয়ে সবচেয়ে বেশী ৪৫ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা সাবিনা । ২৮ বছরের অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড অবশ্য ফাইনালকে সাধারণ ম্যাচ হিসেবে দেখতে চান, কারণ কোনও চাপ নিতে চান না। নিজেদের মতো করে খেলে ট্রফিটা ছুঁয়ে দেখতে চান।

সাবিনা জানান , ‘ দলকে একটা কথাই বলেছি, যেহেতু ফাইনাল, সেহেতু যেকোনো কিছুই হতে পারে। আমার বিশ্বাস মেয়েরা গেম থেকে হারাবে না। তারা এখন পরিণত। মারিয়া-মনিকাদের বয়স এখন আর ১৪-১৫ বছর নেই। তারা এখন বড় হয়েছে এবং বুঝতে পারে, গেম ধরতে পারে। আমার মনে হয় কোনো চাপ মেয়েদের ভেতরে থাকবে না, তারা স্বাভাবিক খেলাটাই খেলবে।’

যে কোন খেলায় চাপে ভেঙে পড়ার একটা প্রবণতা আছে বাংলাদেশের । নেপালের বিপক্ষে স্বাগতিক দর্শকদের উল্লাসের মধ্যে বাংলাদেশের মেয়েরা সেরাটা দিতে পারবে কিনা সেটা সময়েই বোঝা যাবে । তবে বর্তমান দলের যা ‘টিম-স্পিরিট’ তাতে শিরোপা প্রত্যাশা করাই যায় । শুধু তীরে এসে তরী না ডুবলেই হল ।

বাংলাদেশের সম্ভাব্য একাদশ: রুপনা চাকমা (গোলকিপার), শিউলি আজিম, শামসুন্নাহার, এম আখি খাতুন, মাসুরা পারভিন, মনিকা চাকমা, মারিয়া মান্ডা, সাবিনা খাতুন (অধিনায়ক), শ্রীমতি কৃষ্ণারানি সরকার, জাহান স্বপ্ন/রিতু চাকমা, সানজিদা আখতার।

নেপালের সম্ভাব্য একাদশ: আঞ্জিলা টুম্বাপো সুব্বা (অধিনায়ক ও গোলকিপার), পুনম জারঘা মাগার, গীতা রানা, হিরা কুমারি ভুজেল, অমৃতা জায়শি, দিপা শাহী, আমিষা কার্কি/আনিতা কেসি, আনিতা বাসনেত, সারু লিম্বু, প্রীতি রাই, সাবিত্রা ভান্ডারি/রাশমি কুমারি ঘিসিং।

আহাস/ক্রী/০০১