Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

টেনিসকেই সমৃদ্ধ করেছেন ‘কিংবদন্তী’ ফেদেরার

আহসান হাবীব সুমন/ক্রীড়ালোকঃ

বলা হয় , বয়স শুধু একটা সংখ্যা মাত্র । কথাটা হয়ত কিছুটা সত্যি । জীবন-যাপনে শৃঙ্খলা আর নিয়মানুবর্তিতায় বয়সের আঁচড় কিছুটা ঠেকিয়ে রাখা যায় । কিন্তু তাই বলে বয়সকে পরাজিত করার কোন সুত্র এখনও আবিস্কার করতে পারেনি কেউ । একটা সময় বয়সের কাছে হার মানতে হবে সবাইকে । যেমন হার মানলেন বহুদিন বয়সকে তুড়ি মেরে এগিয়ে চলা রজার ফেদেরার । ৪১ বছর বয়সে এসে তিনি প্রতিযোগিতামূলক টেনিস থেকে বিদায়ের ঘোষণা দিলেন ।

আগামী সপ্তাহে ইংল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠিতব্য লেভার কাপে খেলবেন রজার ফেদেরার । তবে লন্ডনের এই আসরই হবে তার ক্যারিয়ারের শেষ প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্ট । তারপর চিরতরে তুলে রাখবেন র‍্যাকেট । কিন্তু বিদায় নিলেও রজার ফেদেরার রয়ে যাবেন ইতিহাসের পাতায় , মানুষের মনে । কারণ ফেদেরার ছিলেন এমন একজন খেলোয়াড় , যিনি শুধু রেকর্ডের পাতাই সমৃদ্ধ করেন নি । সম্মানিত করেছেন টেনিস নামের খেলাটিকেও ।

টেনিসের ‘ওপেন’ যুগে রড লেভার , বরিস বেকার , জন ম্যাকেনরো , ইভাক লেন্ডল , পিট সাম্পাস , আন্দ্রে আগাসি , জিমি কর্নর্সের মতো বহু কিংবদন্তী এসেছেন । যারা পুরুষ টেনিসের অবিস্মরণীয় নাম । কিন্তু গত প্রায় দুই যুগে তিনজন টেনিস খেলোয়াড় ছাড়িয়ে গেছেন পূর্বসুরীদের । যাদের একজন রজার ফেদেরার । অন্য দুইজন রাফায়েল নাদাল আর নোভাক জোকোভিক । পুরুষ টেনিসের সাম্রাজ্য নিয়ে এমন জমজমাট ‘ত্রিমুখী’ লড়াই ইতিহাসে আর কখনও দেখা যায় নি । এরা তিনজনই টেনিস ইতিহাসের প্রথম তিনটি স্থান দখল করে নিয়েছেন । পেছনে পড়েছেন বাকীরা । তবে দুঃখের বিষয় , টেনিসে এই ত্রিমুখী লড়াই আর দেখা যাবে না । কারণ বয়সের কাছে হার মেনে টেনিসকে বিদায় জানাচ্ছেন গ্রেট ফেদেরার ।

সুইজারল্যান্ডের ফেদারারের জন্ম ১৯৮১ সালের ৮ আগস্ট ।। খেলেছেন বিভন্ন জুনিয়র গ্র্যান্ড স্ল্যাম টুর্নামেন্ট । ১৯৯৮ সালে জিতেছেন জুনিয়র উইম্বলডনের একক আর ডাবলসের শিরোপা । পেশাদার টেনিসে পা রাখেন ১৯৯৮ সালে নিজ দেশের ‘সুইস ওপেন’ দিয়ে । যদিও নিজের পেশাদার টেনিস ক্যারিয়ারের প্রথম ম্যাচেই ফেদেরার হেরে যান আর্জেন্টিনার লুকাস আর্ণল্ড কারের কাছে ।

ফেদেরার ক্যারিয়ারে গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতেছেন ২০টি । যা নাদালের ২২ গ্র্যান্ড স্লামের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ । তবে ‘ক্লে কোর্ট’ প্রতিযোগিতায় ফেদেরার ততটা সফল ছিলেন না । শুধু ক্লে-কোর্ট টেনিসে একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে গ্র্যান্ড-স্ল্যাম শিরোপা সংখ্যায় স্প্যানিয়ার্ড নাদাল তাকে পেছনে ফেলতে পেরেছেন । নাদালের ১৪টি শিরোপা এসেছে ক্লে-কোর্ট আসর ফ্রেঞ্চ ওপেনে । যেখানে ২০০৯ সালে একবার মাত্র ট্রফি জিতেছেন ফেদেরার । এছাড়া আটটি উইম্বলডন , ছয়টি অস্ট্রেলিয়ান ওপেন আর পাঁচটি ইউএস ওপেন জিতেছেন তিনি । ওপেন যুগে তারচেয়ে বেশী উইম্বলডন আর ইউএস ওপেন জিততে পারেনি কেউ ।

ফেদারার টেনিসের সর্বকালের সেরা ‘ক্ল্যাসিক’ খেলোয়াড় । তিনি নাদাল কিংবা জোকোর মতো পাওয়ার-টেনিস খেলেন নি । বরং তার খেলার পরদে পরদে ছিল শৈল্পিক ছন্দ । যা দিয়ে শাসন করেছেন টেনিস বিশ্ব । তার প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম আসে ২০০৩ সালের ৬ জুলাই । অস্ট্রেলিয়ার মার্ক ফিলিপ্পোসিসকে হারিয়ে উইম্বলডন জিতেছিলেন তিনি । উইম্বলডনে টানা পাঁচটি সিঙ্গেলস শিরোপা জয়ের রেকর্ড তার ।

২০০৮ সালে জিতেছেন অলিম্পিকের সোনা । ক্যারিয়ারে জিতেছেন ১০৩টি এটিপি একক শিরোপা , যা ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ । এছাড়া এটিপি পুরুষ র‍্যাংকিংয়ে রেকর্ড টানা ২৩৭ সপ্তাহ শীর্ষে ছিলেন ফেদেরার । পাঁচবার শীর্ষে থেকে শেষ করেছেন বছর । সব মিলিয়ে ক্যারিয়ারে ৩১০ সপ্তাহ এক নাম্বার টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে দখলে রেখেছিলেন সিংহাসন । সবচেয়ে বেশি বয়সে (৩৬ বছর) র‍্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বরে ওঠার রেকর্ড ফেদেরারের।

২০১৮ সালে সর্বশেষ গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতেছিলেন ফেদেরার । সেটা অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে । ২০২১ সালের উইম্বলডনের কোয়ার্টার ফাইনালে পোল্যান্ডের হুবার্ত হুরকাজের কাছে হারের পর থেকে কোনো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলেননি তিনি। বিগত দুই বছর ইনজুরির সাথে লড়াই করতে হয়েছে তাকে । এই সময়ের মধ্যে তার হাঁটুতে তিনটি অস্ত্রোপচার করানো হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইনজুরির কারণেই টেনিসকে বিদায় জানাতে হচ্ছে ।

ফেদেরার নিজের বিদায় নিয়ে টুইটারে জানিয়েছেন , ‘আমার টেনিস পরিবার এবং এর বাইরে যারা আছেন। বছরের পর বছর ধরে টেনিস আমাকে যে সব উপহার দিয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় নিঃসন্দেহে, সেসব মানুষ যাদের সঙ্গে আমি দেখা করেছি: আমার বন্ধুরা, আমার প্রতিযোগীরা এবং বেশিরভাগ ভক্ত যারা খেলাটিকে প্রাণ দিয়েছেন, আজ আমি আপনাদের সবার সাথে কিছু বিষয় শেয়ার করতে চাই।’

তিনি বলেছেন, ‘আপনারা অনেকেই জানেন, গত তিন বছর আমাকে আঘাত ও অস্ত্রোপচারের মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমি সম্পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক ফর্মে ফিরে আসার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছি। কিন্তু আমি আমার শরীরের ক্ষমতা ও সীমা জানি এবং ইদানীং আমার কাছে এর বার্তা স্পষ্ট হয়েছে। আমার বয়স ৪১ বছর। আমি ২৪ বছরে দেড় হাজারেরও বেশি ম্যাচ খেলেছি। টেনিস আমাকে আমার কল্পনার চেয়েও বেশি কিছু দিয়েছে। এখন আমার ক্যারিয়ারের ইতি টানার সময় হয়ে এসেছে। আগামী সপ্তাহে লন্ডনের ল্যাভার কাপ হবে আমার শেষ এটিপি টুর্নামেন্ট। ভবিষ্যতে আমি অবশ্যই আরও টেনিস খেলব, কিন্তু কোনো গ্রান্ড স্ল্যাম কিংবা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট নয়।’

ফেদেরার কোন গ্র্যান্ড স্ল্যাম আসর থেকে বিদায় নিচ্ছেন না । তিনি খেলবেন লেভার কাপ , যার মাহাত্ম আলাদা । কারণ এটি ইউরোপের খেলোয়াড়দের সাথে আমেরিকান খেলোয়াড়দের দলগত লড়াই । যেখানে ফেদেরারের দলে খেলবেন তার ক্যারিয়ারের দুই প্রবল প্রতিপক্ষ নাদাল আর জোকো ।

ইতিহাসের অন্যতম দুই সেরা খেলোয়াড়ের কাঁধে চড়ে বিদায় নিচ্ছেন আরেক রাজা ফেদারার , এই দৃশ্য হয়ত টেনিসের ইতিহাসে সেরা হয়ে থাকবে ।

আহাস/ক্রী/০০৩