Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

এশিয়া কাপে কে কি পেলো ?

আহসান হাবীব সুমন/ক্রীড়ালোকঃ

শেষ হয়েছে এশিয়া কাপ ক্রিকেটের ১৫তম আসর । টি-টুয়েন্টি ফরম্যাটের এই আসরে শেষ পর্যন্ত বাজিমাৎ করেছে শ্রীলঙ্কা । ফাইনালে পাকিস্তানকে ২৩ রানে হারিয়ে শ্রীলঙ্কা জিতে নিয়েছে নিজেদের ইতিহাসের ষষ্ঠ এশিয়া কাপ । আসরের সর্বোচ্চ সাতটি শিরোপার মালিক ভারত ।

২০১৪ সালের এশিয়া কাপে ফাইনাল খেলেছিল শ্রীলঙ্কা আর পাকিস্তান । ঢাকার মিরপুর স্টেডিয়ামে সেই ফাইনালেও শ্রীলঙ্কা ৫ উইকেটে হারিয়েছিল পাকিস্তানকে । যদিও সেবার আঞ্জেলো ম্যাথিউজের নেতৃত্বে কুমার সাঙ্গাকারা , মাহেলা জয়াবর্ধনে , লাসিথ মালিঙ্গা আর অজন্তা মেন্ডিসদের নিয়ে শ্রীলঙ্কা ছিল সত্যিকার অর্থেই ফেভারিট । মালিঙ্গা সেই আসরে ১১ উইকেট নিয়ে ছিলেন টুর্নামেন্ট সেরা । ওয়ানডে ফরম্যাটের আসরের ফাইনালে লাহিরু থিরামান্নে সেঞ্চুরিসহ করেছিলেন সবচেয়ে বেশী রান । এছাড়া সাঙ্গাকারা (৫ ম্যাচে ২৪৮ রান) আর অজন্তারা ছিলেন (৩ ম্যাচে ৯ উইকেট) ‘খুনে’ মেজাজে । পাঁচ দলের আসরে কোন ম্যাচ না হেরে শ্রীলঙ্কা জয় করে নিয়েছিল ট্রফি ।

কিন্তু ২০২২ সালের পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন । ইনজুরির কারণে প্রধান পেসার দুশমান্থ চামিরা , বিনুরা ফার্নান্দো ও কাসুন রাজিথার মতো নিয়মিত একাদশের ক্রিকেটারদের রেখেই এশিয়া কাপ খেলতে নামে লংকানরা । এছাড়া এশিয়া কাপে মাঠে নামার আগে ২০২২ সালে ১১ টি-টুয়েন্টি ম্যাচের মধ্যে মাত্র ২টি জয় ছিল লংকানদের । । তবে দুইটি ভিন্ন সিরিজে । অর্থাৎ এই বছর কোন টি-টুয়েন্টি সিরিজে জয়ের মুখ দেখেনি লংকানরা । ভারতের কাছে তো তিন ম্যাচের সিরিজে হোয়াইট ওয়াশও হতে হয়েছে তাদের ।

সব মিলিয়ে আসর শুরুর আগে শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে আশাবাদী ছিল না কেউ । টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে আফগানিস্তানের কাছে পাত্তাই পায় নি । টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে আগে ব্যাটিং করে গুটিয়ে গেল ১০৫ রানে, প্রতিপক্ষ যেটি পেরিয়ে গেল ১০.১ ওভারের মধ্যে।

কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচ থেকেই শ্রীলঙ্কার অন্যরুপ । বাংলাদেশকে হারিয়ে সুপার-ফোরে নাম লেখাবার পরেই আত্মবিশ্বাস যেন তুঙ্গে উঠে যায় দলটির । টানা হারায় আফগানিস্তান , ভারত আর পাকিস্তানকে । ফাইনালে আবারও সেই পাকিস্তানকে হারিয়ে শিরোপা জয় ।

দাশুন শানাকার নেতৃত্ব শ্রীলঙ্কার সম্পদ । ২০১৯ সালে দায়িত্ব পাওয়ার পর অন্যান্য ফরম্যাটে শ্রীলঙ্কা সিরিজ জিতএছে অস্ট্রেলিয়া আর ভারতের বিপক্ষে । এবার জিতলেন টি-টুয়েন্টি ট্রফি । টুর্নামেন্টে নিজে ১১১ রান আর দুই উইকেট নিয়ে রেখেছেন শিরোপা জয়ে অবদান । ফাইনালে তার বুদ্ধিদীপ্ত বোলিং পরিবর্তনের সুফল দেখেছে সবাই ।

সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র অর্থনৈতিক সমস্যায় নিজেদের ‘দেউলিয়া’ ঘোষণা করেছে শ্রীলঙ্কা । দ্রব্যমুল্যের আকাশ-ছোঁয়া মুল্য , গ্যাস-পানিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সংকটে দেশের মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে । যা অস্থির করে তুলেছে রাজনৈতিক পরিস্থিতি । যে কারণে স্বাগতিক হয়েও ২০২২ সালের এশিয়া কাপ নিজ দেশের মাটিতে খেলতে পারে নি শ্রীলঙ্কা । কিন্তু সেই ভেঙে পড়ার পরিবর্তে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটাররা ছিলেন উজ্জীবিত ।শোককে শক্তি বানিয়ে তারা লড়েছে দেশের মানুষের মুখে খানিকটা হাসি ফোটাবার জন্য । প্রতিটা খেলোয়াড়ের এই মানসিকতা শেষ পর্যন্ত ট্রফি জিতিয়েছে শ্রীলঙ্কাকে ।

টুর্নামেন্টের ফাইনালে অপরাজিত ৭১সহ ভানুকা রাজাপাক্সে করেছেন ৬ ম্যাচে ১৯১ রান । তিনি পেয়েছেন ফাইনাল সেরার পুরস্কার । ফাইনালে তিনটিসহ টুর্নামেন্টে ৯ উইকেট নিয়েছেন ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা । ব্যাট হাতেও করেছেন ৬৬ রান । তাই টুর্নামেন্টের সেরা তিনি ।

এছাড়া শ্রীলঙ্কার হয়ে পাথুম নিশাংকা ১৭১ , কুশল মেন্ডিস ১৫৫ রান করেছেন । করুনারত্নে আর দানুস্কা গুনাথিলাকারা প্রয়োজনের সময় ব্যাট হাতেও সহযোগিতা করেছেন দলকে । বল হাতে হাসারাঙ্গার পর সবচেয়ে বেশী সাত উইকেট নিয়েছে চামিরা করুনারত্নে । এছাড়া দিলশান মাদুশাংকা ফাইনালসহ শেষ দুই ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে পেয়েছেন ছয়টি উইকেট । মাহিশ থিক্সানার উইকেট সংখ্যাও ছয়টি । আর অধিনায়ক শানাকার অল রাউন্ড নৈপুণ্যের সাথে যোগ্য নেতৃত্ব তো আছেই । সব মিলিয়ে হিসেবের বাইরে থেকেও শ্রীলঙ্কার এশিয়া কাপ জয় তাই অবাক হবার মতো বিষয় না ।

আসরে শিরোপা জিতে শ্রীলঙ্কা ট্রফির সাথে পাচ্ছে দুই লাখ মার্কিন ডলার । যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা । আর ফাইনালে হেরে পাকিস্তান পাচ্ছে অর্ধেক , অর্থাৎ এক লাখ মার্কিন ডলার । বিশ্বকাপের সঙ্গে মেলাতে গেলে এশিয়া কাপের প্রাইজমানি কয়েক গুণ কম। ২০২১ সালের টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতে চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া পেয়েছিল ১৬ লাখ মার্কিন ডলার। রানার্সআপ নিউজিল্যান্ড পেয়েছিল ৮ লাখ মার্কিন ডলার। অবশ্য এশিয়া ছাড়া অন্য কোথাও মহাদেশীয় সেরার টুর্নামেন্ট হয় না ।

টুর্নামেন্টের রানার্স-আপ পাকিস্তানকে নিয়ে কিছু না বললেই নয় । পাকিস্তান যে ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ দল সেটা প্রমাণ হয়েছে আবারও । ভারতের কাছে ‘এ’ গ্রুপের প্রথম ম্যাচ হেরে টুর্নামেন্ট শুরু । তারপর হংকংকে উড়িয়ে সুপার-ফোরে পা । ভারতকে হারিয়ে গ্রুপ পর্বের প্রতিশোধ । পরের ম্যাচে আফগানিস্তানের বিপক্ষে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে এক উইকেটে অবিশ্বাস্য জয় আর ফাইনালে পা । কিন্তু পরের দুই ম্যাচে ফাইনালসহ শ্রীলঙ্কার কাছে দুইবার হার । তাতে ২০১৪ সালের পর আবারও ফাইনালে উঠে ট্রফিবঞ্চিত পাকিস্তান । ২০১২ সালে শেষ এশিয়া কাপ জিতেছিল পাক-বাহিনী ।

অথচ আসরের অন্যতম ফেভারিট হিসেবে পাকিস্তানের হাতে শিরোপা দেখেছিল অনেকেই । যদিও টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই শাহিন শাহ আফ্রিদিকে ইনজুরির কারণে হারায় পাকিস্তান । এছাড়া সুপার ফোরের আগে ছিটকে যান শাহ নেওয়াজ ধানি । কিন্তু পাকিস্তানের বোলিং লাইন আপ শক্তি হারায় নি । আমিরাতের মাটিতে ব্যাপক গতি , সুইং আর বাউন্স পেয়েছেন পেসাররা । শাদাব খানরা স্পিনে নাকাল করেছেন প্রতপক্ষের ব্যাটারদের । হ্যারিস রউফ , মোহাম্মদ নেওয়াজ আর শদাব খানরা নিয়েছেন আটটি করে উইকেট । নাসিম শাহ পেয়েছেন সাত উইকেট । মোহাম্মদ হাসনাইন চার ম্যাচে তুলে নিয়েছেন চার উইকেট ।

অন্যদিকে মোহাম্মদ রিজওয়ান প্রমাণ করেছেন টি-টুয়েন্টি ফরম্যাটে কেন তিনি সেরা । ৬ ম্যাচে আসরের সর্বোচ্চ ২৮১ রান এসেছে তার ব্যাট থেকে । হাফসেঞ্চুরি তিনটি । পুরো আসরে মেরেছেন ২১ চার আর ৬ ছক্কা । ফাইনালেও সর্বোচ্চ ৫৫ রান করে তিনিই যা লড়েছেন । পাকিস্তান ট্রফি পেলে ‘ম্যান অফ দা সিরিজ’ তিনি হতেন নিঃসন্দেহে ।

তুলনায় পাকিস্তানের অন্য ব্যাটাররা রিজওয়ানের আশেপাশেও ছিলেন না । দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইফতিখার আহমেদ ৬ ম্যাচে ১০৫ রান । ফখর জামান ৬ ম্যাচের ৬ ইনিংসে ৯৬ রান । আর হতাশ করেছেন অধিনায়ক বাবর আজম । ৬ ম্যাচের ৬ ইনিংসে তিনি করেছেন ৬৮ রান । যার মধ্যে ৩০ রান এসেছে সুপার ফোরের শেষ ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ।

হংকংসহ টানা তিন ম্যাচ জিতে পাকিস্তান যে আশার বেলুন ফুলিয়েছিল , সেটা চুপসে গেছে শেষ দুই ম্যাচে । বিশেষ করে ফাইনালে শাদাব খানসহ অন্যদের ক্যাচ ছাড়া আর মিস ফিল্ডিং , পাকিস্তানকে পেতে দেয় নি এশিয়া কাপ জয়ের স্বাদ ।

এবার আসা যাক ভারতের কথায় । ভারতীয় দলেও ছিলেন না জাশপ্রিত বুমরাহর মতো প্রধান বোলার । মাঝপথে ছিটকে যান সেরা অল অলরাউন্ডার রবীন্দ্র জাদেজা । যা ভুগিয়েছে ভারতকে । কিন্তু তারপরেও ভারতীয় দল ছিল শিরোপার দাবীদার । গ্রুপ পর্বে পাকিস্তান আর হংকংকে উড়িয়ে অষ্টম শিরোপার দিকে ছুটছিল তারা । কিন্তু সুপার ফোরে এসে খেই হারায় রোহিত শর্মার দল । টানা দুই ম্যাচে পাকিস্তান আর শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে ফাইনালের আগেই বিদায় টিম ইন্ডিয়ার । শেষ ম্যাচে আফগানিস্তানকে হারিয়ে শুধু পেয়েছে সান্ত্বনার জয় ।

তবে আসরে ভারতের ব্যক্তিগত অর্জন কম না । বিশেষ করে অনেকদিন ফর্মে না থাকা বিরাট কোহলি রান পেয়েছেন । তিনি করেছেন আসরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৭৬ রান , পাঁচ ম্যাচে । ফাইনালের আগ পর্যন্ত রিজওয়ানের চেয়ে রান সংগ্রহে এগিয়ে ছিলেন তিনি । টুর্নামেন্টে বিরাট কোহলির হাফ সেঞ্চুরি দুইটি । শেষ ম্যাচে আফগানিস্তানের বিপক্ষে করেছেন ১২২ রান । যা ভারতের পক্ষে টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটে সর্বোচ্চ । এছাড়া আসরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১টি ছক্কা মেরেছেন বিরাট । মেরেছেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০টি চার ।

এছাড়া পাঁচ ম্যাচের পাঁচ ইনিংসে ১৩৯ রান করেছেন সূর্যকুমার যাদব । রোহিত শর্মাও চার ইনিংসে করেছেন ১৩৩ আর লোকেশ রাহুল ১৩২ । বোলারদের মধ্যে ভুবনেশ্বর কুমার সর্বোচ্চ ১১ উইকেট নিয়েছেন । এছাড়া আর্শদ্বীপ সিং পাঁচটি আর হার্দিক পান্ডেয়া নিয়েছেন চার উইকেট । স্লগ ওভারে ভারত মিস করেছে বুমরাহকে । আর্শদ্বীপ সিংরা অভিজ্ঞতার কারণে মার খেয়েছেন , যার মাশুল দিতে হয়েছে ভারতকে ।

এই আসরে শুরুতে সবাইকে চমকে দিয়েছিল আফগানিস্তান । টানা দুই ম্যাচে বাংলাদেশ আর শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে সবার আগে সুপার-ফোরে নাম লেখায় । পাকিস্তানকে হারাতে হারাতেও ভাগ্যের ফেরে হেরেছে ১ উইকেটে । নাসিম শাহ আকস্মিকভাবে টানা দুই ছক্কা হাঁকিয়ে পাকিস্তানকে এনে দেয় অবিশ্বাস্য জয় । পরের ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে লড়াই করে হারে । যদিও ভারতের সাথে ম্যাচটি ছিল একপেশে ।

আফগানদের মুজিবুর রহমান নিয়েছেন সাত উইকেট । ফজল আর রশিদ খান পেয়েছেন ৬টি করে উইকেট । পাঁচ উইকেট নিয়েছেন ফরিদ আহমেদ । মোহাম্মদ নবী আর নভিন উল পেয়েছেন তিনটি করে উইকেট ।

অন্যদিকে পাঁচ ইনিংসে ইব্রাহিম জার্দান করেছেন আসরের তৃতীয় সর্বোচ্চ ১৯৬ রান । টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বেশী ১২ ছক্কা মেরেছেন রহমতুল্লাহ গুরবাজ । তার পাঁচ ইনিংসে রান এসেছে ১৫২ । হজরুল্লাহ জাজাই পাঁচ ইনিংসে করেছেন ৯৩ রান ।

সুপার-ফোরের চার দলের বাইরে হংকংয়ের গ্রুপ পর্বে উঠে আসাই ছিল চরম সফলতা । অন্যদিকে ‘বি’ গ্রুপ থেকে বিদায় নেয়া বাংলাদেশের কথা যত কম বলা যায় তত ভাল !

আহাস/ক্রী/০০২