Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

এশিয়ান লেভেলে খেলার যোগ্যতা আছে বাংলাদেশের

আদম তমিজী হকঃ 

সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ । মেয়েরা প্রথমবারের মতো জিতে নিয়েছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা । নেপালের কাঠমুণ্ডুতে ফুটবলের এই জয়ের  আনন্দে উত্তাল সারাদেশের মানুষ । দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের শুভেচ্ছাবার্তায় সিক্ত হচ্ছে পুরো দল । সাফজয়ী ফুটবলারদের ছাদ খোলা বাসে সংবর্ধনা নিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে বিমানবন্দর থেকে । নারী ফুটবলারদের বহন করে নিয়ে আসা বাসের সামনে-পেছনে হাজার হাজার মানুষের ভিড় । রাস্তার দুপাশে অগনিত উৎসুক জনতা একনজর দেখতে হাজির ফুটবলের বীর-কন্যাদের ।

এমন দৃশ্য দেখে আনন্দের অশ্রু সংবরণ করা কঠিন । আমিও পারি নি । টিভিতে সরাসরি খোলা ছাদের বাসে নারী ফুটবলারদের উচ্ছাস আর গর্বিত চেহারা আমাকে আপ্লুত করেছে । মনে হয়েছে , এটা শুধু নারী ফুটবলারদের সাফল্য নয় । এটা তো আমারও সাফল্য । দেশের ১৭ কোটি  মানুষের  সাফল্য ।

একটা সময় আমাদের দেশে ফুটবলই তো ছিল প্রাণের খেলা । দেশের ঘরোয়া ফুটবলে আবাহনী-মোহামেডানের লড়াই নিয়ে সারাদেশের দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়া কিংবা সালাউদ্দিন , সালাম , সাব্বির , আসলাম , বাদল, চুন্নুদের দেবতাজ্ঞানে ভক্তির যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল – সেটা এখনও স্মৃতির মণিকোঠায় ভেসে ওঠে । স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে উন্মাদনায় মেতেছি আমিও । নিয়মিত খবর রেখেছি , কে জিতল । আবাহনী নাকি মোহামেডান ? কে গোল করলো । আসলাম , লিটন নাকি নকিব ? মাঠে না হলে সময় পেলেই টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখেছি প্রিয় দলের খেলা দেখার জন্য ।

বাংলাদেশের মানুষ একসময় ফুটবল ছাড়া কিছু বোঝেনি । ২০০৩ সালে একমাত্র সাফ ফুটবলের শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশের ফুটবল দল । তারপর থেকে পেছাতে পেছাতে ছেলেদের ফুটবল এখন ফিফা র‍্যাংকিংয়ের তলানিতে । তাই মানুষ দেশের ফুটবল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে । তারা এখন টিভিতে রাত জেগে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো আর লিওনেল মেসিদের খেলা দেখে । নেইমার আর এমবাপ্পেদের পায়ের কারুকাজে আজকের তরুণ-যুবারা বিস্মিত উল্লাস করে । আমি নিজেও পর্তুগালের মহানায়ক রোনালদোর ভক্ত । কিন্তু তবু দেশের ফুটবলের এমন দৈন্যদশা আমাকে ব্যথিত করে ।

দেশের ফুটবলে যখন ঘোর অমানিশার অন্ধকার , ঠিক তখন মেয়েরা দেখিয়েছে আলোর দিশা । যেন ফুটবল নিয়ে হতাশার মরুভুমিতে এসেছে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে । সাফ ফুটবলে মেয়েরা যা করে দেখিয়েছে , সেটা আসলে অভাবনীয় ।  নিজেদের থেকে ফিফা র‍্যাংকিংয়ে অনেক এগিয়ে থাকা ভারতকে গ্রুপ পর্বে হারানো চাট্টিখানি কথা ছিল না । কারণ বাংলাদেশ যেখানে র‍্যাংকিংয়ের ১৪৭তম অবস্থানে , সেখানে ভারত ৫৮তম । যাদের সাথে জাতীয় পর্যায়ে কখনও বাংলাদেশ জিততে পারেনি । যে ভারত টানা পাঁচটি আসরের সব কয়টি সাফ ট্রফি জিতে প্রতিষ্ঠা করেছিল একক আধিপত্য । কিন্তু বাংলাদেশ গ্রুপের শেষ ম্যাচে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ভারতের সব আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয় । যা থেকে ভারতের মেয়েরা বেরুতে পারে নি । সেমিতে তারা  হেরেছে নেপালের কাছেও । আর  পাকিস্তান , মালদ্বীপ , ভারত , ভুটানের সাথে জয়ে আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশের সামনে দাঁড়াতে পারে নি নেপালও । কাঠমুণ্ডুর   দশরথ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে নেপালকে উড়িয়ে দিয়েই বাংলাদেশ জিতেছে সাফের শিরোপা ।

সন্দেহ নেই ,  বাংলাদেশের সাফল্য দলীয় প্রচেষ্টার ফসল । কিন্তু তবু আমার মন কেড়েছে সাবিনা খাতুন নামের মেয়েটি । বাংলাদেশের অধিনায়ক সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন বাংলাদেশের শিরোপা জয়ে । করলেই দুই হ্যাট্রিকসহ আট গোল । হলেন সেরা গোলদাতা । সাবিনাকে আমার সত্যি রোনালদোর মতো অদ্ম্য মনে হয় । গোল করার কি নেশা ! জেনেছি , মালদ্বীপের ক্লাব ফুটবলে এক ম্যাচে ১৬ গোল করার রেকর্ড আছে তার ! এটা কি সম্ভব ! দেশের ফুটবলে সবচেয়ে বেশী আন্তর্জাতিক গোল সাবিনার । গোল করাকে যেন মুড়িমুড়কি বানিয়ে ফেলেছে মেয়েটা । রোনালদো যেমন দেশকে প্রথম ফুটবল ট্রফি এনে দিয়েছিলেন , সাবিনাও  মেয়েদের ফুটবলে এনে দিয়েছেন সেই অনাস্বাদিত তৃপ্তি । 

এছাড়া সিরাত জাহান , কৃষ্ণা , মারিয়া মান্ডারা দেখিয়েছেন কাউকে ভয় পাওয়ার পাত্রী তারা নন । মাঠে তারা নেমেছে জয়ের নেশা নিয়েই । কিন্তু তাই বলে অতিআত্মবিশ্বাসী ছিল না কখনই । টেলিভিশনে ফাইনাল ম্যাচ দেখার সময় মনে হয়েছে , মাঠ ভেজা না থাকলে আর স্বাভাবিক খেলা খেলতে পারলে নেপালকে আরও কয়েকটি বেশী গোল দিতে পারতো বাঘিনীরা ।

হ্যাঁ , বাঘিনীই । যাদের গর্জনে কেঁপে উঠেছে দক্ষিণ এশিয়া নারী ফুটবল ।বাংলাদেশের নারীরা সাফ ফুটবলের শিরোপা জেতায় প্রাণঢালা অভিনন্দন । সোনার-কন্যাদের এখন কুর্নিশ করতে তৈরি সারাদেশ । কিন্তু এক সময় এই উচ্ছাস থিতিয়ে যাবে । তখন কি হবে ? ছেলেদের ফুটবলের মতো মেয়েরাও কি হারিয়ে যাবে ? না , সেটা হতে দেয়া যাবে না । অন্তত অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে মেয়েদের ফুটবলকে এশিয়ান লেভেলে নিয়ে যাওয়ার একটা ‘রোডম্যাপ’ এখনই তৈরি করতে হবে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কর্তাব্যক্তিদের ।

সাফ ফুটবল জয়ের পর বাংলাদেশের র‍্যাংকিং এগিয়ে যাবে সন্দেহ নেই । কিন্তু আসলে র‍্যাংকিং কোন বিষয় না । মাঠে আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশগ্রহণ থাকলে এমনিতে তরতর করে র‍্যাংকিংয়ে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব । সাম্প্রতিক সময়ে র‍্যাংকিয়ে এগিয়ে থাকা ভারত , নেপালদের হারিয়েছে বাংলাদেশ । হারিয়েছে মালয়শিয়াকে । সাফল্য প্রত্যাশা বাড়ায় । তাই বাংলাদেশের মেয়েরা এখন সাফের গণ্ডি পেরিয়ে এশিয়ান লেভেল নিজেদের প্রমাণ করবে – এমন আশা করা বাড়াবাড়ি কিছু না ।

এশিয়ান ফুটবলে চীন , জাপান , কোরিয়া , অস্ট্রেলিয়া অনেক বেশী শক্তিধর । আছে থাইল্যান্ড , চাইনিজ তাইপে , মিয়ানমার , ভিয়েতনাম , ইরানের মতো দেশ । সর্বশেষ ভারতের মাটিতে ২০২২ সালের নারী এশিয়া কাপের ১২টি দেশের মধ্যে লড়াইয়ে যাদের প্রায় সবাই ছিল । আসরে নবমবারের মতো শিরোপা জিতেছে চীন । যাদের ১৯৯৯ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে খেলার রেকর্ড আছে ।

বাংলাদেশের নারী ফুটবলে এখন প্রতিভার অভাব নেই । গোলরক্ষক পজিশন থেকে রক্ষণ , মধ্যমাঠ কিংবা ফরোয়ার্ড লাইনে আছে নির্ভর করার মতো ফুটবলার ।মেয়েদের ফুটবলে সবচেয়ে বড় সুবিধা , বয়সভিত্তিক দল থেকে তারা একসাথে খেলছেন । এই দলটার অনেকেই আবার বয়সে তরুণ । যেমন – মারিয়া মান্ডা ১৯ , কৃষ্ণা রাণী ২১ , সপ্না ২১ । তাদের সামনে এখনও বেশ কয়েকবছর খেলা পড়ে আছে । এই দলটাকে পরিচর্যার মাধ্যে আরও শানিত করার অনেক সুযোগ আছে । তাই কোচ গোলাম রাব্বানি ছোটন আর পল স্মলিদের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা দলটির আগামী টার্গেট হতে হবে এশিয়ান লেভেল ।

এখনই বাংলাদেশ এশিয়া কাপ খেলবে , এমন স্বপ্ন দেখার কারণ নেই । কিন্তু এই পরিকল্পনায় বাংলাদেশ এগিয়ে গেলে নিকট ভবিষ্যতে সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়াও বিচিত্র না । কারণে বাংলাদেশের এই মেয়ে ফুটবলারদের প্রতিভা আছে । আছে জয়ের ক্ষুধা । সংগ্রামের মানসিকতা আর শিক্ষা পেয়েছে নিজেদের জীবন থেকে । তাই এখনই সময় , মেয়েদের ফুটবলে সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে তাদের নিয়মিত মাঠে রাখার ব্যবস্থা করা । নিয়মিত আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পেলে এই মেয়েরা করে দেখাতে পারবে অনেক কিছু , সেটা প্রমাণ হয়েছে সাফ আসরেই ।

লেখকঃ রাজনীতিক ও সমাজকর্মী।