Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

হারিয়ে গেছে ‘জোগো বোনিতো’

ক্রীড়ালোক প্রতিবেদকঃ 

বিশ্বকাপ ফুটবলে সর্বাধিক পাঁচবার শিরোপা জিতেছে ব্রাজিল । বিশ্বকাপজয়ী প্রতিটা দলই ব্রাজিলের মানুষের ভালবাসায় সিক্ত । কিন্তু সেই তুলনায় ১৯৯৪ আর ২০০২ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলকে ব্রাজিলিয়ানরা একটু কম ভালবাসে । যেমন ভালবাসা পেয়েছে ১৯৫৮,১৯৬২ আর ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপজয়ী দল । এমনকি বিশ্বকাপ জিততে না পারা ১৯৮২ সালের স্কোয়াডের প্রতি সাধারণ ব্রাজিলিয়ানদের রয়েছে অসীম মমতা । কারণ সেই সময় ব্রাজিল খেলতো সত্যিকারের ছন্দময় ফুটবল ।

, ‘ জোগো বোনিতো ‘ বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ছন্দময় ফুটবলের অনুপম প্রদর্শনী। ছোট ছোট পাস আর ব্যক্তিগত স্কিলসে প্রতিপক্ষের রক্ষণে হামলে পড়ে গোল আদায় করে নেয়া , ব্রাজিলের ফুটবলের মুল সৌন্দর্য । এক সময় যার পরিবর্তিত রুপ দেখা যায় ‘টিকিটাকা’ ফুটবলে । যদিও টিকিটাকার সাথে জোগো বোনিতোর পার্থক্য হচ্ছে মানসিকতায় । টিকিটাকা ব্যক্তিগত স্কিলসের উপরে কম নির্ভর করে । টিকিটাকা ফুটবলের মুলমন্ত্র যতবেশী সম্ভব বল নিজেদের মধ্যে আদান-প্রদান করা । তাতে গোল কম এলেও কিছু যায় আসে না । ম্যাচ জিতলেই হল । অন্যদিকে জোগো বোনিতোর মুল কথাই গোল । প্রতিপক্ষ একটা দিলে আমরা দেব চারটা , এটাই জোগো বনিতো । সাথে থাকবে ফুটবলের ঐশ্বরিক সৌন্দর্য ।

জোগো বোনিতো পর্তুগীজ শব্দ । যার ইংরেজি অর্থ beautiful game । ব্রাজিলে জোগো বোনিতো ফুটবলের সুচনা কিন্তু করেছিলেন এক স্কটিশ , চার্লস মিলার । যদিও ১৯৫৮ সালে ব্রাজিলের জোগো বোনিতো সারা বিশ্বে আলাদাভাবে পরিচিতি পায় । সেই সময় গারিঞ্চা , পেলে , টোস্টাওদের হাত ধরে ব্রাজিল জিতে নেয় প্রথম বিশ্বকাপ । তবে সেই জোগো বোনিতো চরম উৎকর্ষতা পায় ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে । সেই দলে ছিলেন পেলে, জেয়ারজিনহো,টোস্টাও, কার্লোস আলবার্তোদের মত তারকা মহাতারকা । সেই ব্রাজিল  চার ডিফেন্ডার নিয়ে খেললেও কার্লোস আলবার্তো ও এমারেলদো কিন্তু মোটামুটি উইংব্যাকই ছিলেন। রক্ষণটা তাই কমবেশি অরক্ষিতই থাকত। এক গোল খেলে দুই গোল দেব-মোটামুটি এই মন্ত্র জপেই মাঠে নামত ব্রাজিল। সেজন্যই ছয় ম্যাচে সাত গোল খেয়েও ব্রাজিল ১৯ গোল দিতে পেরেছিল।

আসলে গোলের খেলা ফুটবলে জোগো বোনিতো ছিল শান্তির এক পরশ । পেলে আর গারিঞ্চারা ফুটবল মাঠে নিপুন শিল্পির মত সবুজ ক্যানভাসে এঁকেছেন ফুটবলের অনুপম চিত্র । ১৯৫৮ , ১৯৬২ আর ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ জয়ের কারণেই শুধু নয় , সুন্দর ফুটবল দিয়েই ব্রাজিল হয়ে উঠেছিল সবার প্রিয় দল । সেই সময় জার্মানি কিংবা ইটালি ধারাবাহিক  ভাল ফুটবল খেলেছেন । হাঙ্গেরি আর হল্যান্ড এনেছে ফুটবলের নতুন ধারা । কিন্তু কোন দলই ব্রাজিলের জোগো বোনিতোকে ছাড়িয়ে যেতে পারে নি ।

ব্রাজিলের ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ স্কোয়াডের কথাই ধরা যাক । জিকো , সক্রেটিসদের সেই দল বিশ্বকাপ জিততে পারে নি । বিদায় নেয় দ্বিতীয় গ্রুপ পর্বে ইটালির কাছে ২-৩ গোলে হেরে । যে ম্যাচটিকে এখনও শতাব্দীর সেরা ম্যাচ বিবেচনা করা হয় । সেবার স্পেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ফরম্যাট ছিল একটু অন্যরকম । ২৪ দেশকে প্রথমে ছয়টি গ্রুপে ভাগ করা হয় । যেখান  থেকে সেরা ১২ দেশকে আবার চারটি গ্রুপে ভাগ করা হয় দ্বিতীয় পর্বে । সেই চার গ্রুপের সেরা দল খেলে সেমি ফাইনালে । দ্বিতীয় পর্বের প্রথম ম্যাচেই আগেরবারের চ্যাম্পিয়ন  আর্জেন্টিনাকে  ৩-১ গোলে হারায় ব্রাজিল । পরের ম্যাচে ইটালির সাথে ড্র করলেও গোল ব্যবধানে সেমিতে সুযোগ পায় সেলেকাওরা । কিন্তু ইটালির কাছে হেরে বিদায় নিতে হয় জিকোদের । 

১৯৮২ সালে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয় না করতে পারা এখনও ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময় । পুরো আসরে ব্রাজিলের ছন্দময় খেলায় মুগ্ধ ছিল পৃথিবী । এখনও যদি কাউকে প্রশ্ন করা হয় ,  বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর খেলা উপহার দেওয়া দল কোনটি? প্রায় সকল বোদ্ধার মতেই তা হলো ব্রাজিলের ১৯৮২ সালের দলটি। 

ব্রাজিলের ছন্দময় আক্রমণাত্মক খেলা নিয়ে জার্মানির কিংবদন্তী ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার বলেছিলেন , ‘ ব্রাজিল মানে আমার কাছে আক্রমণের পর আক্রমণ, আর গোল। ‘ 

১৯৮২ সালে ব্রাজিলের বিদায়ের পর অনেকেই বলেছিলেন , ছন্দময় ফুটবলের  মৃত্যু হল । এখন আর কেউ ভাল ফুটবল খেলে জিততে পারবে না । খেলতে হবে গাণিতিক আর শরীরনির্ভর ফুটবল । আসলেই হয়েছেও তাই । ব্রাজিল নিজেরাও সরে এসেছে জোগো বোনিতো থেকে । কিন্তু ব্রাজিলের মানুষ সেটা মানতে নারাজ । তাইতো ১৯৯৪ সালে রোমারিওরা বিশ্বকাপ জিতলেও জিকোদের সমান জনপ্রিয়তা পায় নি । বরং হয়েছে সমালোচনা । আবার ২০০২ সালে রোনাল্ডো নাজারিওদের দলটি কিছুটা হলেও সমর্থন আর ভালবাসা পেয়েছে সাধারণ মানুষদের । কারণ সেই দলে ব্যক্তিগত স্কিলসে খেলোয়াড় ছিলেন অনেক । রোনাল্ডো , রোনালদিনিও , রিভালদো , রবার্টো কার্লোস , কাফু আর ডেনিলসনদের  খেলায় কিছুটা হলেও ছন্দ পেয়েছে ব্রাজিলিয়ানরা । 

তবে এখনকার নেইমারদের ব্রাজিল জোগো বোনিতোর ধারেকাছেও নেই । কোচ তিতে সুন্দর ফুটবলের পূজারী নন । তিনি যে কোনভবাবে ফল বের করায়  বিশ্বাসী । আবার ব্রাজিলের বর্তমান দলেও নেইমার আর ভিনিসিয়াস ছাড়া ব্যক্তিগত স্কিলসের  খেলোয়াড় কম । তাই  এই ব্রাজিল মন ভরাতে পারছে না   দর্শকদের । 

 

আহাস/ক্রী/০০৩