Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

বাংলাদেশের আছে একজন ‘দুর্ভাগা’ তাইজুল !

ক্রীড়ালোক প্রতিবেদকঃ

বাংলাদেশের ক্রিকেটে বরাবরই ‘পার্শ্বচরিত্র’ তাইজুল ইসলাম । যার ক্রিকেট সামর্থ্য নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই । তবু বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলে তিনি বিবেচিত শুধুমাত্র ‘টেস্ট ক্রিকেটার’ হিসেবে । সেটাও আবার নিয়মিত না । অথচ রঙিন পোশাকের ক্রিকেটেও যখন সুযোগ পেয়েছেন , নিজেকে প্রমাণ করেছেন । যদিও তাতে ভাগ্য বদলায় নি তাইজুলের ।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাইজুলের অভিষেক হয়েছিল সাদা পোশাকে , ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে । সেইন্ট ভিনসেন্টে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচের প্রথম ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেন তাইজুল । সেই থেকে দীর্ঘ আট বছরে খেলেছেন ৩৮ ম্যাচ । বল করার সুযোগ পেয়েছেন প্রতিপক্ষের ৬৫ ইনিংসে । উইকেট পেয়েছেন ১৫৮টি । সাকিব আল হাসানের ২২৪ উইকেটের পর যা বাংলাদেশের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ । সাকিব ম্যাচ খেলেছেন ৬১টি । আবার নিজের ১৫০ উইকেটের মাইলফলক ছুঁতে তাইজুল খেলেছিলেন ৩৬টি টেস্ট , অন্যদিকে সাকিবকে খেলতে হয়েছে ৪৩ টেস্ট ।

টেস্ট ক্রিকেটে তাইজুল দশবার পেয়েছেন পাঁচ বা তারচেয়ে বেশী উইকেটের দেখা । এছাড়া দুই ইনিংসে একবার পেয়েছেন দশটি উইকেট । বাংলাদেশের হয়ে টেস্টের এক ইনিংসে সেরা বোলিং রেকর্ড তাইজুলের । ২০১৪ সালের অক্টোবরে মিরপুর শের-এ-বাংলা স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৩৯ রানে আট উইকেট শিকার করেছিলেন তিনি । যে রেকর্ড এখনও অক্ষত ।

অস্ট্রেলিয়া , ইংল্যান্ড কিংবা ভারতের মত দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এমনিতেই টেস্ট ম্যাচ খেলার সুযোগ পায় কম । সেখানে তাইজুল আবার নিয়মিত নন । এই বাম-হাতি স্পিনারকে প্রায়শই জায়গা ছেড়ে দিতে হয় , কারণ দলে সাকিব আল হাসানের মত বিশ্বসেরা স্পিন অল রাউন্ডার আছে । আসলে তাইজুল হয়ত বাংলাদেশে জন্মেছেন একটু ভুল সময়ে । ঠিক যেমন শেন ওয়ার্নের সময় ছিলেন স্টুয়ার্ট ম্যাকগিল । কিংবা ওয়াসিম আকরাম আর ওয়াকার ইউনুসের সময়ের আকিব জাভেদ ।

নিজের ভাগ্য মেনে নিয়ে চলা তাইজুল বলেছেন , ‘ একাদশে আমার সুযোগ পাওয়া না পাওয়া নিয়ে খুব বেশী চিন্তা কখনই করি না । আমি বাস্তবতা বুঝি । আমি জানি , সাকিব ভাই খেললে আমার সুযোগ কমে আসে । এছাড়া পেস বোলিং কন্ডিশনে কেউ বাড়তি স্পিনার খেলাবে না । ক্রিকেটে সবকিছু পরিকল্পনামাফিক চলে । ‘

ওয়ানডে ক্রিকেটেও তাইজুলের অভিষেক হয়েছিল স্বপ্নের মত । ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে মিরপুরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে নিজের খেলা প্রথম আন্তর্জাতিক একদিনের ম্যাচেই হ্যাট্রিক করার অনন্য রেকর্ড গড়েন তিনি ।ওয়ানডে ইতিহাসের প্রথম বোলার হিসেবে অভিষেক ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন বাংলাদেশের বাঁহাতি এই স্পিনার। তাইজুলের পর দক্ষিণ আফ্রিকার কাগিসো রাবাদা এবং শ্রীলঙ্কার দুই বোলার ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা ও শেহান মাধুশঙ্কা অভিষেক ওয়ানডে ম্যাচে হ্যাট্রিকের কৃতিত্ব দেখান ।

নিজের অভিষেক ম্যাচে তাইজুল উইকেট নিয়েছিলেন চারটি । কিন্তু পরবর্তী আট বছরে তার ওয়ানডে সংখ্যা মাত্র ১০টি । এই ১০ ম্যাচে উইকেট পেয়েছেন ১৭টি ।

তাইজুল সর্বশেষ একদিনের ম্যাচ খেলছেন শনিবার (১৬ জুলাই) ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে । গায়ানায় তিন ম্যাচ সিরিজের শেষটিতে সুযোগ পেয়েই তিনি করেছেন ক্যারিয়ার সেরা বোলিং । নিয়েছেন ২৮ রানে পাঁচ উইকেট । অথচ নবম আর দশম ওয়ানডে ম্যাচের মাঝে তাইজুলের সময় লেগেছে ২৮ মাস ১০ দিন ।

গায়ানার স্পিন সহায়ক উইকেটে তাইজুল ম্যাচ সেরা হওয়ার পর বলেছেন , ‘৫ উইকেট পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার। আমি সুযোগের জন্য বসে ছিলাম। সুযোগ পেলে কাজে লাগাব এমনটাই ভাবছিলাম। আমি শুধু উইকেটের চরিত্র বুঝে বল করার চেষ্টা করেছি।’

দীর্ঘদিন পর ওয়ানডে খেলার সুযোগ পেয়েই নতুন রেকর্ড গড়েছেন তাইজুল । করেছেন বিদেশের মাটিতে স্পিনার হিসেবে সেরা বোলিং । ১০ ওভারে মাত্র ২৮ রান খরচায় ৫ উইকেট নিয়ে গড়েছেন এই রেকর্ড । এতদিন দেশের বাইরে বাংলাদেশের স্পিনারদের সেরা বোলিং ছিল সাকিবের। ২০১৯ বিশ্বকাপে সাউথ‍্যাম্পটনে বাঁহাতি এই অলরাউন্ডার ৫ উইকেট নিয়েছিলেন ২৯ রানে।

দেশের হয়ে খুব বেশী খেলার সুযোগ না পেলেও তাইজুলের তেমন আফসোস নেই । তিনি যখন সুযোগ পান , তখন নিজের সেরাটা দিতেই চেষ্টা করেন । এই নিয়ে তাইজুলের বক্তব্য , ‘ যখন আমি ভালো খেলি এবং দেশের জন্য পারফর্ম করি, আমার ভালো লাগে। এর বাইরে আর কিছু মনে হয় না।‘

নাটোরের ক্রিকেটার তাইজুলের বর্তমান বয়স ৩০ বছর । ২০১০-১১ মৌসুমে রাজশাহী বিভাগের হয়ে জাতীয় ক্রিকেটে খেলা শুরু করেন । পরবর্তীতে খেলেছেন উত্তরাঞ্চলের হয়ে । লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে তার উইকেটের সংখ্যা ১৪৮টি । এছাড়া প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে নিয়েছেন ৩৭৩ উইকেট । প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে এক ম্যাচের দুই ইনিংসে ১২ উইকেট নেয়ার রেকর্ড আছে তার ।

বিভিন্ন ধরণের ঘরোয়া টি-টুয়েন্টি আসরের ৯০ ম্যাচে ৭৫ উইকেট আছে তাইজুলের । যদিও দেশের হয়ে খেলতে পেরেছেন মাত্র দুইটি আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টি ম্যাচ ।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে  গায়ানায় যে ম্যাচে রেকর্ড গড়লেন তাইজুল , সেটিও হয়ত তার খেলা হত না । প্রথমত সাকিব সিরিজে না থাকায় তাকে  স্কোয়াডে রাখা হয়েছে । আবার প্রথম দুই ম্যাচে অভিষিক্ত নাসুম আহমেদ আর মেহেদি হাসান মিরাজ দুর্দান্ত করায় তাদের একাদশ থেকে বাদ দেয়া কঠিন ছিল । শেষ ম্যাচেও তারা খেলেছেন । কিন্তু সাথে সুযোগ পেয়েছেন তাইজুল , শুধুমাত্র টিম ম্যানেজমেন্ট গায়ানার কন্ডিশনের কথা ভেবে পাঁচ স্পিনার খেলানোর মত ‘অভিনব’ চিন্তা করায় । কারণ এই ম্যাচে আরও ছিলেন মোসাদ্দেক হোসেন আর আফিফ হোসেন ধ্রুব । বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটে পাঁচ জন স্পিনার নিয়ে খেলা এই প্রথম । যা আগামীতেও আর দেখা যাবে কিনা সন্দেহ । আর এটা আরও সম্ভব হয়েছে ক্যারিবিয়ানদের সাথে প্রথম দুই ম্যাচ জিতে সিরিজ নিশ্চিত হওয়ায় । তাই গায়ানায় শেষ ওয়ানডে ম্যাচ ‘দুর্ভাগা ‘ তাইজুলের সুযোগ পাওয়াটা ছিল সৌভাগ্যের । যে সুযোগ তিনি কাজে লাগিয়েছেন দুর্দান্তভাবে । ভবিষ্যতে আরও আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে তাইজুলকে হয়ত এভাবেই তাকিয়ে থাকতে হবে  সুযোগের অপেক্ষায় । 

আহাস/ক্রী/০০৩