Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

ক্রীড়া পাগল অনন্ত জলিলের ‘দিন- দ্যা ডে ‘ হিট

আহসান হাবীব সুমন/ক্রীড়ালোকঃ

অনন্ত জলিলকে চেনে না , বাংলাদেশে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুস্কর । যদিও মানুষটি মুলত দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী । কিন্তু সারাদেশের সাধারণে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন চলচ্চিত্র অভিনেতা হিসেবে । বর্তমানে অনন্ত জলিলের ‘দিন-দা ডে’ নামের চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে । যাকে বলা হচ্ছে , এ যাবতকালে বাংলাদেশে নির্মিত সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিনেমা ।

সর্বশেষ ঈদ-উল-আজহায় মুক্তি পাওয়া ‘দিন-দ্যা ডে’ নিয়ে এখন প্রায় প্রতিদিন সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছেন অনন্ত জলিল । তবে সেটা অবশ্যই বিনোদনের পাতায় । কিন্তু ‘ক্রীড়ালোক’ এর খেলাধুলা সংশ্লিষ্ট খবরের মাঝে অনন্ত জলিল আর ‘দিন-দ্যা ডে’ কেন ? আসলে ব্যবসায়ী কিংবা সিনেমার নায়কের পরিচয়ের বাইরেও অনন্ত জলিলের খেলাধুলার প্রতি রয়েছে আগ্রহ । বিশেষ করে ফুটবলের প্রতি অনন্ত জলিলের রয়েছে আলাদা অনুরাগ । পেশাগত কারণে সময় স্বল্পতার মধ্যেও বড় বড় টুর্নামেন্টের খেলা দেখতে চেষ্টা করেন । সমর্থন করেন আর্জেন্টিনার ফুটবল দলকে । ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নয়নে কাজ করার ইচ্ছে আছে তার । এখন যেমন অবদান রাখছেন সিনেমায় ।

আসা যাক অনন্ত জলিলের ‘দিন-দা ডে’ চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে , যা নিয়ে চলছে নানা বিতর্ক । প্রশ্ন তোলা হচ্ছে ছবির বাজেট নিয়ে । অনন্ত নিজেই জানিয়েছেন , ‘দিন-দ্যা ডে’ নির্মাণে খরচ হয়েছে ১০০ কোটি টাকা । অনন্ত নিজের অভিনিত চলচ্চিত্রের প্রযোজনা অর্থাৎ অর্থের লগ্নী নিজেই করে থাকেন । । অবশ্য ‘দিন-দ্যা ডে’ চলচ্চিত্রটি ইরানের সাথে যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত । ইরানের মর্তুজা অতাশ জমজম এই চলচ্চিত্রে অনন্তের সাথে যৌথ প্রযোজক । একাধারে ছবিটির পরিচালকও তিনি ।

‘দিন-দ্যা ডে’ নির্মাণ করা হয়েছে বিশাল ক্যানভাসে । ছবির কাহিনীও ছিল চিত্তাকর্ষক । এলিট ফোর্স সোয়াটের দুর্ধর্ষ এজেন্টের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অনন্ত জলিল নিজে । আর তার নায়িকা ছিলেন বাস্তব জীবনের অর্ধাঙ্গিনী বর্ষা । ছবিতে ইন্টারন্যাশনাল ড্রাগ মাফিয়া আর মানব পাচারকারী আবু খালিদকে পাকড়াও করার মিশন নিয়ে সুপার এজেন্ট ‘এজে’ (অনন্ত জলিল) ছুটে বেরিয়েছেন আফগানিস্তান , তুরস্ক আর ইরানে । একশান নির্ভর চলচ্চিত্রে ব্যবহার করা হয়েছে স্পেশাল ফোর্স, আর্মি, প্লেন । আর এসব কাজে ‘দিন-দা ডে’ কে সহায়তা করেছে ইরানের ফারাবি ফাউন্ডেশন , যা সেই দেশের সিনেমা নির্মাণের সরকারী প্রতিষ্ঠান । এই ফারাবি ফাউন্ডেশনের সাথে জড়িত সহযোগী প্রযোজক আর পরিচালক মর্তুজা অতাশ জমজম ।

চলচ্চিত্রের একশান দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে যে স্পেশাল এফেক্ট ব্যবহার করা হয়েছে , সেটাও চোখে পড়ার মত । চলচ্চিত্রটির ভিস্যুয়াল বিশ্বমানের ছিল , কোন সন্দেহ নেই । নিজের চলচ্চিত্রের খরচ নিয়ে অনন্ত জলিল বলেছেন , যৌথ প্রযোজনার চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ অংশের শ্যুটিং খরচ বহন করেছেন তিনি । আর বাইরের সব খরচ ইরানের । সেভাবেই নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্রটি । ইরান ও তুরস্কের যে হিউজ অ্যারেঞ্জমেন্ট, স্পেশাল ফোর্স, আর্মি, প্লেন – এসবই ফারাবি ফাউন্ডেশন করেছে ইরান সরকারের তরফ থেকে।

ব্যবসায়ী এবং মানুষ হিসেবে সকলের কাছে ‘সৎ’ অনন্ত জলিল নিজের চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্পর্কেও সব সময় সৎ থাকার চেষ্টা করেছেন । নইলে ছবিটি নির্মাণ খরচের ব্যাখ্যা এভাবে দিতেন না । এমনকি , নিজের আর নায়িকা বর্ষার পারিশ্রমিক নিয়েও কথা বলেছেন । ইরানের প্রযোজনা সংস্থায় তিনি নিজের পারিশ্রমিক বলেছিলেন ১ লাখ ডলার আর বর্ষার জন্য ত্রিশ হাজার ডলার । যদিও এই নিয়েও বাংলাদেশের অনেক মিডিয়ায় পরিবেশন করা হয়েছে বানোয়াট সংবাদ ।

যাই হোক , আমাদের আলোচনার বিষয় মুলত ‘দিন-দা ডে’র সাফল্য । সেটা চলচ্চিত্র হিসেবে কিংবা বানিজ্যিক সফলতার বিচারে । একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে ‘দিন-দা ডে’র লোকেশন সবার আগে মনোযোগ কাড়বে সবার । এতদিন যা ভারতের হিন্দি বা তামিল কিংবা হলিউডসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মুভিতে দেখা গেছে , তার রেশ কিছুটা হলেও পাওয়া গেছে অনন্ত জলিলের সর্বশেষ চলচ্চিত্রে । একশান দৃশ্যে অনন্ত জলিলের পরিশ্রম স্পষ্ট ছিল । তবে অভিনয়ে অনন্ত আর বর্ষা জুটি এখনও সেরার পর্যায়ে পৌঁছুতে পারেন নি । অভিনয়-শিল্পী হিসেবে নিজেদের আরও পরিপক্ক করে তোলার প্রয়োজন আছে দুজনেরই । বিশেষ করে নায়িকা বর্ষার জন্য কাজটা খুব জরুরী ।

‘দিন-দা ডে’ চলচ্চিত্রটি হিট না ফ্লপ , এই নিয়েও চলছে বিতর্ক । অনেকে সমালোচক ছবিটিকে ‘হিট’ বলতে নারাজ । কিন্তু বাস্তবতা তো ভিন্ন । প্রথম সপ্তাহে দেশের ১০৭টি সিনেমা হলে মুক্তি পায় অনন্ত জলিলের চলচ্চিত্র । শুরু থেকেই দর্শকদের ভিড় দেখা গেছে প্রেক্ষাগৃহগুলোতে । স্টার সিনেপ্লেক্সের মত অভিজাত প্রেক্ষাগৃহে টিকেটের জন্য হাহাকার করতে দেখা গেছে দর্শকদের । অনেকেই ফিরে গেছেন টিকেট না পাওয়ার আকুতি নিয়ে । আবার যারা দেখেছেন , তারা বেশীরভাগ উচ্ছসিত ছিলেন ছবিটি নিয়ে । যে কারণে দ্বিতীয় সপ্তাহেও ছবিটি সমান ১০৭টি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন করা হয়েছে । এবং দর্শক আনুকুল্য বজায় রেখে ছবিটি এখনও ব্যবসা করছে দাপটের সাথে ।

মুক্তির পর থেকে তিন সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পরেও যখন একটি চলচ্চিত্রের জন্য দর্শকদের আগ্রহ অটুট থাকে , সেটাকে ‘হিট’ না বলে উপায় নেই । যদিও ‘দিন-দা ডে’র চূড়ান্ত কালেকশান এখনও প্রকাশ করে নি প্রযোজনা সংস্থা , কিন্তু সব হিসেবেই এটি সফল চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত হতে বাধ্য ।

‘দিন-দা ডে’ ফোর কে রেজুলেশনে সিনেমাটি শুটিং করা বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র । এছাড়া বাংলাদেশে এই প্রথম ডলবি অ্যাটমস প্রযুক্তিতে মুক্তি পেয়েছে । যা দেখার সময় প্রেক্ষাগৃহের দর্শকের মধ্যে এনে দিয়েছে অন্যরকম উত্তেজনা আর অনুভূতি । প্রায় সাড়ে আট বছর পর চলচ্চিত্র পর্দায় হাজির হয়ে অনন্ত নাড়া দিয়েছেন দর্শকদের , সন্দেহ নেই ।

‘দিন-দা ডে’ মুক্তির আগেই ঝড় তুলেছিল  ইউ টিউবে প্রচারিত ট্রেইলার দিয়ে । ‘দিন-দা ডে’ র একাধিক ট্রেইলার পেয়েছে মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ । যা প্রমাণ করেছে , অনন্ত জলিলের সিনেমা নিয়ে মানুষের আগ্রহ আছে । এছাড়া চলতি বছরের  মে মাসে  বিখ্যাত কান চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিয়ে ছবিটি নিয়ে ব্যাপক সাড়া পেয়েছিলেন ।  ছবি মুক্তির আগে প্রচারণায়  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি অডিটরিয়ামে শিক্ষার্থীদের মাঝে উপস্থিত হয়ে প্রচার কার্যক্রম চালিয়েছেন, হেলিকপ্টারে করে বিভিন্ন স্থানে গেছেন ।  চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর ছুটে বেরিয়েছেন বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে ।  চেষ্টা করেছেন দর্শকদের মতামত সরাসরি জানতে । এছাড়া বিভিন্ন চ্যানেলে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে প্রচারণা তো আছেই ।  মোট কথা , নিজের চলচ্চিত্রকে দর্শকদের কাছে পৌঁছে দিতে সেরা চেষ্টাই করেছেন এবং করছেন অনন্ত জলিল । আর বলা যায় সফলও হয়েছেন । 

আসলে অনন্ত জলিল যখন যেখানে হাত দিয়েছেন , সফলতা যেন কুর্নিশ করেছে তাকে । গার্মেন্টস ব্যবসায়ী হিসেবে সফলতা আসার পর তিনি চলচ্চিত্র নির্মানের সিদ্ধান্ত নেন । একবার কোন কিছু করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে অনন্ত ঠেকিয়ে রাখার কোন উপায় নেই । চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও অনন্ত শুধু ভাবনাতে আটকে থাকেন নি । নির্মাণ করেন ‘খোঁজ-দ্যা সার্চ’ নামের চলচ্চিত্র । সুস্ময় সুমনের চিত্রনাট্য আর ইফতেখার চৌধুরীর পরিচালনায় ছবিটির প্রযোজক অনন্ত জলিল নিজে । এমনকি , ছায়াছবির নায়ক চরিত্রেও অভিনয়ের চ্যালেঞ্জ নিতে পিছপা হন নি তিনি । ২০১০ সালের এপ্রিলে মুক্তি পাওয়া ‘খোঁজ-দ্যা সার্চ’ বড় কোন হিট ছিল না । কিন্তু অনন্ত জলিলের আগমনী বার্তা ঠিকই প্রচারিত হয়েছিল এই ছবির মাধ্যমে ।

‘খোঁজ-দ্যা সার্চ’ এর পর অনন্ত জলিল কিন্তু থেমে যান নি । একে একে বানিয়েছেন হৃদয় ভাঙ্গা ঢেউ , দ্যা স্পিড , মোস্ট ওয়েলকাম , নিঃস্বার্থ ভালবাসা , মোস্ট ওয়েলকাম-২ এবং সর্বশেষ ‘দিন-দ্যা ডে’ । অনন্ত জলিলের প্রতিটা চলচ্চিত্রের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বাজেট , লোকেশন আর সিনেমেোটোগ্রাফি । এইসব ক্ষেত্রে অনন্ত কখনও আপোষ করেন নি । সেই সাথে অনন্তর প্রতিটা চলচ্চিত্রের গানের পেছনেও আলাদা শ্রম চোখে পড়ার মত ।

 

অনন্তর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘দা স্পিড’ এর শুটিং হয়েছে মালয়েশিয়ায় । বাংলাদেশের বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের পরিচালনায় চলচ্চিত্রটিতে বাংলাদেশ ছাড়াও মালিয়েশিয়া আর রাশিয়ার অভিনয়শিল্পীরা ছিলেন । তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘হৃদয় ভাঙা ঢেউ’ পরিচালনা করেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার । বলা যায় , বর্তমান সময়ে সক্রিয় থাকা বাংলাদেশের অনেক বড় নির্মাতার সাথেই কাজ করেছেন জলিল । ইতোমধ্যে অনন্ত জলিল পেয়েছেন বিনোদন সাংবাদিকদের সংগঠন সিজেএফবি আর বায়স্কোপ বর্ষসেরা অভিনেতার পুরস্কার । মনোনয়ন পেয়েছিলেন ‘মোস্ট ওয়েলকাম’আর ‘নিঃস্বার্থ ভালবাসা’ চলচ্চিত্রের জন্য ।

অনন্ত ‘দিন-দা ডে’ র পর নির্মাণ করতে চলেছেন ‘নেত্রী দ্য লিডার’ নামের ছায়াছবি । যেখানে প্রধানভূমিকায় থাকবেন বর্ষা । আর অনন্ত জলিল থাকবেন বর্ষার প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা বা বডিগার্ড হিসেবে । এই সিনেমাতে অভিনয়ের পাশাপাশি এর চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করছেন অনন্ত জলিল এবং উপেন্দ্র মাধব । পাশাপাশি অনন্ত জলিল ও তুরস্কের একজন পরিচালকও পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবেন। এ ছবিটি তুরস্কের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হচ্ছে। এই ছবির মহরৎ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ।

চলচ্চিত্রটি নির্মিত হবে বাংলাদেশ ও তুরস্কের যৌথ প্রযোজনায়। ছবিটির মহরতে অন্যদের সঙ্গে হাজির হয়েছিলেন ইরানের চার শিল্পী। অনন্তর মুক্তিপ্রতীক্ষিত ‘দিন-দ্য ডে’তে অভিনয় করেছেন ইরানি অভিনেতা আমির হোসেন। নেত্রী-দ্য লিডার ছবিতেও আছেন তিনি।

এছাড়া দেখা যাবে ইলিয়াস কাঞ্চন, কাজী হায়াতের পাশাপাশি তুরস্কের প্রথম সারির বেশ কয়েকজন শিল্পীকেও। ইলিয়াস কাঞ্চন এবং কাজী হায়াত গণমাধ্যমে সিনেমাটির সাথে যুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন।

সব মিলিয়ে অনন্তর পরবর্তী চলচ্চিত্র ‘ ‘নেত্রী- দ্য লিডার’ হতে চলেছে আরও একটি বিশাল ক্যানভাস আর বড় বাজেটের ছায়াছবি । অবশ্য অনন্তর জন্য এটা নতুন কিছু না । তিনি তো আর কখনও সাধারণ কিছুতে হাত দেন না । বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আপাত যা অসম্ভব , তেমন কাজেই হাত দেন অন্তন্ত জলিল । কারণ অসম্ভবকে সম্ভব করাই তো অনন্ত জলিলের কাজ ।

আহাস/ক্রী/পিপি