Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

সালাহ , ব্যর্থ এক মিশরীয় ফুটবলারের নাম !

আহসান হাবীব সুমন/ক্রীড়ালোকঃ

বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড মোহাম্মদ সালাহর জন্য বিশ্বকাপ ফুটবল যেন একটা দুঃস্বপ্ন । ২০১৮ সালে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে লড়তে হয়েছে ইনজুরির সাথে । আর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে তো সুযোগই পায় নি মিশর । এমনকি নিজের দেশকেও সালাহ জেতাতে পারেন নি কোন আন্তর্জাতিক শিরোপা । অথচ ক্লাবের হয়ে ইতোমধ্যে সম্ভাব্য সব শিরোপা জেতা হয়ে গেছে তাঁর ।

ক্লাবের হয়ে তুমুল সফল সালাহ । বিশেষ করে ইংলিশ ক্লাব লিভারপুলে তাঁর দলীয় আর ব্যক্তিগত সাফল্য ঈর্ষা করার মত । বিপরীতে দেশের হয়ে প্রাপ্তির ভান্ডার অনেকটাই শুন্য । যে কারণে মিশর জাতীয় দলের সাবেক কোচ হাসান শেহাতা তীব্র অনুযোগের সুরে বলেছেন , ‘ সালাহ বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হতে পারেন । কিন্তু তিনি আসলে দেশের জন্য কিছুই করেন নি ! ‘

আসলেই কি দেশের জন্য কিছুই করেন নি সালাহ ?

ব্যাপারটা হয়ত তেমন না । কারণ ১৯৯০ সালের পর সালাহর হাত ধরেই মিশর আবার বিশ্বকাপের মুল মঞ্চে পা রাখে ২০১৮ সালে । যেখানে বাছাই পর্বে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ গোল করেছিলেন তিনি । কিন্তু বিশ্বকাপের ঠিক আগে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনালে ইনজুরিতে পড়েন তিনি । রিয়েলের সার্জিও র‍্যামোসের হিংসাত্মক ফাউলে কাঁধের হাড় ভাঙ্গেন । যে কারণে বিশ্বকাপ খেলাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে সালাহর । তবে শেষ মুহূর্তে অদম্য ইচ্ছাশক্তির কারণে সেরে ওঠা সালাহ রাশিয়ায় খেলেন গ্রুপ পর্বে শেষ দুই ম্যাচ । রাশিয়া আর সৌদি আরবের বিপক্ষে দুইটি গোলও করেন । কিন্তু টানা তিন ম্যাচ হারায় গ্রুপ পর্ব থেকে খালি হাতেই বিদায় নিতে হয় ফারাওদের ।

তবে ২০২২ সালের বিশ্বকাপে নেই মিশর । বাছাই পর্বের প্লে-অফে সেনেগালের কাছে হেরে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হয়েছে তাদের । এছাড়াও ২০২১ সালে আফ্রিকা কাপ অফ নেশন্সের ফাইনালেও মিশর হেরেছে সেনেগালের কাছে । আর দুইটি ম্যাচেই মিশরকে হারতে হয়েছে টাইব্রেকারে । এই দুই ম্যাচ জয়ের মধ্য দিয়ে নিজ দেশের মানুষের কাছে ‘হিরো’ হয়ে গেছেন লিভারপুলের সালারই সতীর্থ সাদিও মানে । আর বিশ্বকাপ বাছাই প্লে-অফে টাইব্রেকার শট মিস করে সালাহ হয়ে রইলেন ‘ট্রাজেডি হিরো’ !

২০১৭ সালের আফ্রিকান নেশন্স কাপের ফাইনালেও মিশর হেরেছিল ক্যামেরুনের কাছে । সেই টুর্নামেন্টে সালাহ করেছিলেন দুই গোল । যা ছিল আসরের যৌথ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ । তিন গোল করে নেশন্স কাপের সেরা গোলদাতা ছিলেন কঙ্গোর জুনিয়র কাবানাঙ্গা ।

দেশের হয়ে সালাহ ৮৫ ম্যাচে ৪৭ গোল করেছেন । যা ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ । মিশরের সর্বকালের সেরা গোলদাতা হোশাম হোসেন করেছেন ১৭৮ ম্যাচে ৬৮ গোল । অন্যদিকে সালাহ খেলেছেন ৮৫ ম্যাচ । ৩০ বছর বয়সী সালাহ আরও কয়েক বছর খেলতে পারলে তাঁর সামনে রয়েছে দেশের হয়ে সবচেয়ে বেশী গোলের রেকর্ড গড়ার হাতছানি ।

তবে এত কিছুর পরেও শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক শিরোপা না থাকায় সালাহকে ব্যর্থ বলছেন মিশরের সবচেয়ে সফল কোচ শেহাতা । যিনি ২০০৪ থেকে ২০১১ পর্যন্ত মিশরের জাতীয় দলের কোচ ছিলেন । মিশরকে জিতিয়েছেন টানা তিনটি আফ্রিকান কাপ অফ নেশন্স । যে রেকর্ড অন্য কোন দেশের কোচের নেই । তবে তিনবার এই শিরোপা জয়ের রেকর্ড আছে ঘানার চার্লস কুমি জিয়াম্ফির ।

বর্তমানে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনার ক্লাব এফসি মায়ার্কের টেকনিক্যাল এডভাইসর হিসেবে কর্মরত শেহাতা জানান , ‘ সালাহ যে মাপের খেলোয়াড় , সেই অনুযায়ী দেশকে তেমন কিছু দিতে পারেন নি । মিশরের জার্সিতে সালাহর আরও বেশী কিছু দেবার সামর্থ্য ছিল । কিন্তু কেন এমন হচ্ছে , এটা তাকেই উপলব্ধি করতে হবে । ‘

জাতীয় দলের হয়ে ৫৩ ম্যাচে ১৬ আন্তর্জাতিক গোল করা শেহাতা বলেন , ‘ জাতীয় দলে সতীর্থদের নিয়ে কোন সমস্যা থাকলে সালাহ সেটা জানাতে পারেন । যদিও কারা জাতীয় দলে খেলবে , এটা ঠিক করার দায়িত্ব সালার না । তবে কোচদেরও বুঝতে হবে , সালাহর সাথে জাতীয় দলে কোন খেলোয়াড় মানিয়ে নিতে পারবে ! ইংল্যান্ডের (লিভারপুল) মত সুবিধা হয়ত সে মিশর জাতীয় দলে পাবে না । কিন্তু তাকে তাঁর মত করে খেলতে দেয়ার সুযোগ করে দেয়া উচিত । ‘

সালাহ ২০১১ সালে প্রথম জাতীয় দলে ডাক পান । আর শেহাতা জাতীয় দলের দায়িত্ব ছাড়েন সেই সময়েই । অর্থাৎ সালাহকে জাতীয় দলে কোচিং করাবার সুযোগ হয় নি শেহাতার ।

মোহাম্মদ সালাহ নিজ দেশের আল আরব ক্লাবের হয়ে সিনিয়র ক্যারিয়ার শুরু করেন । পরবর্তীতে খেলেছেন সুইস ক্লাব বাসেল , ইংল্যান্ডের চেলসি আর ইতালির ফিওরেন্তিনা এবং এফসি রোমাতে । ২০১৭ সাল থেকে টানা খেলছেন লিভারপুলের হয়ে । ইতোমধ্যে অল রেডদের হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২৫৪ ম্যাচে ১৫৬ গোল করেছেন সালাহ । আর ক্লাব ক্যারিয়ারে তাঁর গোলের সংখ্যা ৫০৫ ম্যাচে ২৩৩টি । বাসেলের হয়ে সুইস লীগ জিতেছেন দুইবার । এছাড়া লিভারপুলের হয়ে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ আর ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগসহ তাঁর শিরোপার সংখ্যা পাঁচটি । আরও দুইবার ফাইনালে উঠেও লিভারপুলকে জেতাতে পারেন নি তিনি । দুই’বারই তাকে হারতে হয়েছে রিয়েল মাদ্রিদের কাছে !

২০১২ সালেই সালাহ আফ্রিকার বর্ষসেরা উদীয়মান ফুটবলার হয়ে সবাইকে নিজের আগমনী বার্তা দেন । একই বছর যেতেন উয়েফা’র গোল্ডেন-বয় এ্যাওয়ার্ড । সুইস ফুটবলার অফ দা ইয়ার হয়েছেন একবার । দুইবার নির্বাচিত হয়েছেন বিবিসি’র পাঠকদের ভোটে আফ্রিকার সেরা খেলোয়াড় । তিনবার জিতেছেন ইপিএলের গোল্ডেন-বুট (দুইবার যৌথভাবে) । ২০২১-২২ মৌসুমেও টটেনহ্যামের হিউং মিন সনের সাথে ২৩ গোল নিয়ে ভাগাভাগি করেছেন সেরা গোলদাতার এ্যাওয়ার্ড । এই মৌসুমেই ইপিএলের সেরা প্লে-মেকার নির্বাচিত হয়েছেন এই মিশরীয় । এছাড়া দুইবার জিতেছেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের বর্ষসেরা ফুটবলারের খেতাব । ২০১৯ সালে ফিফা ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপের ‘গোল্ডেন বল’ জিতেছেন ।

ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের ইতিহাসে এক মৌসুমে সবচেয়ে বেশী গোলের রেকর্ড সালাহর । ২০১৭-১৮ মৌসুমে তিনি করেন ৩৮ ম্যাচে ৩২ গোল ।

সব মিলিয়ে সালাহ লিভারপুলের হয়ে যা করেছেন , সেটা অবিশ্বাস্য । পক্ষান্তরে দেশের হয়ে নেই কোন ট্রফি । এই কারণেই হয়ত সালাহকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে এখনও সেরাদের কাতারে রাখা হচ্ছে না । কিন্তু সালাহর সামনে ক্যারিয়ার আরও পড়ে আছে । ২০২৬ বিশ্বকাপে তাঁর বয়স হবে ৩৪ বছর । তাঁর চেয়ে বেশী বয়সে বিশ্বকাপ খেলতে চলেছেন লিওনেল মেসি আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোরা । তাই পরবর্তী বিশ্বকাপ আসরে সালাহ মিশরকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবেন – এমন আশা করাই যায় । আবার তার আগেই তিনি জিততে পারেন দেশের হয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা । ঠিক যেমনটা ক্যারিয়ারের শেষবেলায় জিতেছে মেসি । তাহলে হয়ত মেসির মত সালাহকে নিয়েও সমালোচনা কমবে ।

আহাস/ক্রী/০০১