Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

ম্যারাডোনাই ফাঁস করেছিলেন সেই ষড়যন্ত্র !

আহসান হাবীব সুমন/ক্রীড়ালোকঃ

বিশ্বকাপ ফুটবল , যাকে বলা হয় ‘গ্রেটেস্ট শো অন দা আর্থ’ । প্রতি চার বছরে একবার অনুষ্ঠিত বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নিয়ে যে উত্তেজনা সাধারণ থেকে অসাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজ করে , সেটা অন্য কোন খেলায় দেখা যায় না । যিনি সারা বছর অন্যান্য সময় ফুটবল নিয়ে তেমন কোন খোঁজ রাখেন , সেই তিনিও বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় বনে যান কোন না কোন দেশের সমর্থক । আসলে ফুটবলের বিশ্বজনীন আবেদন উপেক্ষা করার মত মানুষ খুব কমই আছে এই গ্রহে ।

সারা পৃথিবীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর যুদ্ধংদেহী মনোভাবও লক্ষণীয় । বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া প্রতিটা দেশের লক্ষ্য থাকে শিরোপা জয় । সেই ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রেই নীতির সীমা লঙ্ঘনের মত ঘটনা ঘটতেও দেখা গেছে বিশ্বকাপে । যা জন্ম দিয়েছে বড় বড় সব কেলেঙ্কারির । ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের কিংবা ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপে স্বাগতিক আর্জেন্টিনার শিরোপা জয় নিয়ে কম জল ঘোলা হয় নি । আবার ১৯৮৬ সালে দিয়াগো ম্যারাডোনা কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হাত দিয়ে গোল করলেও রেফারি সেটা খেয়াল করেন নি , যা ফুটবল ইতিহাসে ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোল নামেই পরিচিত । অবশ্য সেই ম্যাচেই ম্যারাডোনা বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে সেরা গোলটি করেন । কিন্তু হ্যান্ড অফ গড’এর কারণেই ইংল্যান্ডকে ছিটকে যেতে হয় বিশ্বকাপ থেকে । যা এখনও ইংলিশরা ভুলতে পারে নি ।

ম্যারাডোনা ১৯৯৪ সালে নিষিদ্ধ ওষুধ সেবন করে ধরা পড়ায় বিশ্বকাপ থেকে বিতাড়িত হন । এটাও বিশ্বকাপের অন্যতম কলংকজনক ঘটনা । আবার এই আর্জেন্টিনাই ১৯৯০ সালে আরও বিতর্কের জন্ম দেয় । যা ইতিহাসে ‘হলি ওয়াটার স্ক্যান্ডাল’ নামে পরিচিত ।

ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ১৯৯০ সালে ইতালিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ খেলতে এসেছিল আর্জেন্টিনা । যদিও প্রথম ম্যাচেই ক্যামেরুনের কাছে হেরে বিশ্বকাপ ধরে রাখার মিশনের শুরুটা আলবেসেলেস্তেদের জন্য ছিল দুঃস্বপ্নের মত । পরের ম্যাচে সোভিয়েত রাশিয়াকে হারালেও শেষ গ্রুপ ম্যাচে ড্র করে রুমানি য়ার বিপক্ষে । ‘বি’ গ্রুপে তিন পয়েন্ট (এই সময় জয়ের জন্য ছিল দুই পয়েন্ট) ন্যে আর্জেন্টিনা ছিল চার দলের মধ্যে তৃতীয় অবস্থানে । কিন্তু টুর্নামেন্টের ফরম্যাটের কারণে সেরা তিন দলের একটি হয়ে নক আউট পর্বে পা রাখে আর্জেন্টিনা । আর সেখানে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল । আসরের হট ফেভারিট ব্রাজিল টানা তিন ম্যাচ জিতেই পা রাখে নক আউট পর্বে ।

নক আউট পর্বে দুঙ্গা , অ্যালেমাও , ক্যারেকা আর মুলাররা একচেটিয়া প্রাধান্য বিস্তার করে খেলে আর্জেন্টিনার উপর । মুহুর্মুহু আক্রমণ করেও গোল করতে না পারার মাশুল ব্রাজিল দেয় শেষভাগে । ৮১ মিনিটে ম্যারাডোনার পাস থেকে খেলার একমাত্র গোলটি করেন ক্লদিও ক্যানিজিয়া । ফুটবল গোলের খেলা । ম্যাচের পুরো সময় আধিপত্য বিস্তারে ব্রাজিলের পক্ষে যা হয় নি মুহূর্তের ম্যাজিকে সেটা করে এখান ক্যানিজিয়া , ম্যারাডোনার অসাধারণ একটি পাস থেকে । তাতে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় ঘটে ব্রাজিলের ।

তবে সেই ম্যাচে ব্রাজিলের বিদায়ের ঘটনা নয় , আলোচিত হয়ে আছে ‘হলি ওয়াটার স্ক্যান্ডাল’ ! ১০ জুন তুরিনে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে ব্রাজিলের ডিফেন্ডার ব্রাংকোর উপর দায়িত্ব ছিল বিশ্বসেরা ম্যারাডোনাকে আটকে রাখার । যে কাজটা ব্রাংকো করছিলেন দুর্দান্তভাবে । সত্যি কথা বলতে , লেফটব্যাক ব্রাংকোসহ ব্রাজিলের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডাররা কড়া পাহাড়ায় রাখায় ম্যারাডোনা ঠিক সুবিধা করতে পারছিলেন না। ফাঁকি দিতে পারছিলেন না ব্রাংকোকেও । তবে পুরো ম্যাচ একভাবে খেলতে পারেন নি ব্রাংকো ।দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার পেদ্রো ত্রগলিও আহত হলে বেশ কিছুক্ষণ খেলা বন্ধ থাকে । সেই সময় ব্রাংকো আর্জেন্টিনার ফিজিও মিগুয়েল ডি লরেঞ্জোর কাছ থেকে এক বোতল পানি নিয়ে পান করেছিলেন আর সেটার পরেই নাকি তার মাথা ঝিমঝিম করছিলো এবং তিনি অসুস্থতা বোধ করছিলেন! সেই বিরতির পর থেকেই ব্রাংকোর খেলায় ছন্দপতন দেখা দিয়েছিল । যে ব্রাংকো সারা খেলায় ম্যারাডোনাকে দারুণভাবে আটকে রেখেছিলেন, সেই ব্রাংকোকেই খেলার ৮১ মিনিটে অনায়াসে ফাঁকি দিয়ে ডানপ্রান্ত দিয়ে বল নিয়ে এগিয়ে গেলেন ম্যারাডোনা। হুট করে ব্রাংকো এভাবে খেই হারানোয় পুরো ম্যাচে অসাধারণ ডিফেন্স করা ব্রাজিলের ডিফেন্সিভ সেটআপ গেলো ভেঙ্গে। ম্যারাডোনাকে ঠেকাতে গিয়ে ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডাররা তাকে ঘিরে ধরলে আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড ক্লদিও ক্যানিজিয়া হয়ে যান আনমার্কড। ম্যারাডোনাও তাই বল বাড়িয়ে দিলেন ক্যানিজিয়ার দিকে। ব্রাজিলের গোলকিপার তাফারেলকে একা পেয়ে বল জালে জড়াতে ভুল করলেন না ক্যানিজিয়া। পুরো খেলায় ব্রাজিলিয়ানরা দাপট দেখালেও স্রোতের বিপরীত দিক থেকে গোল করে এগিয়ে গেলো আর্জেন্টিনা। ম্যারাডোনার অ্যাসিস্টটা আসলেই অসাধারণ ছিল।

কিন্তু গোলের পর থেকেই ব্রাংকোকে অজানা এক কারণে উত্তেজিত দেখাচ্ছিলো, তিনি যেন তার সতীর্থদের কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন। ওদিকে মেজাজ হারিয়ে খেলার ৮৫ মিনিটে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন ব্রাজিলের অধিনায়ক রিকার্ডো গোমেজ। শেষপর্যন্ত ম্যারাডোনার ওই দুর্দান্ত অ্যাসিস্টেই ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে চলে যায় আর্জেন্টিনা।

ম্যাচ শেষে ব্রাংকো অভিযোগ করেন , আর্জেন্টিনার ফিজিওর কাছ থেকে পানির বোতল নিয়ে পান করার পর থেকেই অসুস্থ বোধ করছিলেন তিনি । তিনি দাবী করেছিলেন , পানিতে কিছু মেশানো ছিল । যদিও সেই অভিযোগ নিয়ে বিতর্ক হলেও বিষয়টা প্রমাণ করা যায় নি তখন । কিন্তু ২০০৫ সালে এক সাক্ষাৎকারে ম্যারাডোনা নিজেই স্বীকার করে নেন , ব্রাংকোকে দেয়া পানিতে মেশানো ছিল ট্র্যাঙ্ক্যুলাইজার ড্রাগ! যদিও আর্জেন্টাইন ফুটবল এসোসিয়েশন কখনোই এই স্ক্যান্ডালের দায় নেয়নি।

২০০৫ সালে এক সাক্ষাৎকারে ব্রাংকোর পানিতে ঘুমের ঔষধ মেশানোর কথা স্বীকার করে রীতিমত বোমা ফাটান ম্যারাডোনা । এই ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারী কে ছিল এটা জানতে সাংবাদিকরা ছুটে যান ১৯৯০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কার্লোস বিলার্দোর কাছে। এই প্রশ্নের উত্তরে বিলার্দো বলেন, ‘আমি কিছু জানি না এ ব্যাপারে, তবে আমি এটাও বলছি না যে এরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি!’

ম্যারাডোনার স্বীকারোক্তির পর ব্রাংকো তো আর্জেন্টিনার ফুটবল ফেডারেশনকে কাঠগড়ায় নেওয়ার হুমকিও দিয়ে বসেন। আর ব্রাজিলের সেই সময়ের কোচ সেবাস্তিও ল্যাজারনি বলেছিলেন , ‘এটা কিছুতেই স্পোর্টসসম্যানশিপের অংশ হতে পারে না, এটা সম্পূর্ণ নোংরা একটা খেলা। ঘটনা ১৪ বছর আগে হোক বা ১৪ দিন, ফিফার উচিত এই ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টদের কঠিন শাস্তির আওতায় এনে একটা উদাহরণ স্থাপন করার। কে নিশ্চয়তা দিতে পারে আর্জেন্টিনা অন্য কোনো দলের বিপক্ষে এমন কোনো নোংরা খেলে খেলেনি?’

যাই হোক , সেই ঘটনা ম্যারাডোনা ছাড়া আর্জেন্টিনার আর কেউ স্বীকার করে নি । ব্রাজিলের তরফ থেকে ক্ষোভ প্রকাশ করা হলেও কোন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করা হয় নি । তবে বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে এই ঘটনা ঠিকই বিশেষভাবে ‘কলংকের চিহ্ন’ হয়ে আছে । আর মজার ব্যাপার হচ্ছে , হলি ওয়াটার কেলেঙ্কারিকে ২০১৭ সালে মনে করিয়ে দিয়েছিল পেরু । রাশিয়া বিশ্বকাপ বাছাইয়ের সেই ম্যাচটি অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল আর্জেন্টিনার মাঠে । সেই ম্যাচের আগে পেরু ফুটবল ফেডারেশন ঘোষণা দেয় , ‘ ম্যাচ খেলতে যাওয়ার সময় খাবার পানি ও অন্যান্য পানীয় নিয়েই আর্জেন্টিনায় পা রাখবে পেরুর জাতীয় ফুটবল দল। ‘

কারণ সেই বাছাই ম্যাচে আর্জেন্টিনার পানি পান করলে ব্রাজিলের মত দশা হবে না সেটা নিয়ে নিশ্চিত ছিল না পেরু । সেই কারণে নিজ দলের খেলোয়াড়দের আর্জেন্টিনায় কোন পানি কিংবা ড্রিংকস জাতীয় জিনিস পান না করার নির্দেশনা দিয়েছিল পেরুর ফেডারেশন !

আহাস/ক্রী/০০১