Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

টেস্ট খেলার আত্মবিশ্বাসই নেই ব্যাটসম্যানদের

আহসান হাবীব সুমন/ক্রীড়ালোকঃ

টেস্ট ক্রিকেট মানেই ধৈর্যের পরীক্ষা । যেহেতু খেলাটা পাঁচদিনের , তাই এখানে ব্যাটসম্যানদের মুল লক্ষ্যই মাটি কামড়ে টিকে থাকা । তাতে যেমন প্রতিপক্ষের বোলারদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে , তাদের বোলিং ক্রমশ ভোঁতা হবার সম্ভাবনা দেখা দেয় । তেমনি ব্যাটসম্যানরাও সুযোগ পায় রান বাড়িয়ে নেয়ার । কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা টেস্ট ক্রিকেটে এখানেই ব্যর্থ । তাইতো দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের বেশী সময় পাড়ি দিয়ে আসা বাংলাদেশের টেস্ট সামর্থ্য নিয়ে ওঠে প্রশ্ন ।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে লড়ছে অ্যান্টিগায় । দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্টে অবশ্য যথারীতি নিশ্চিত পরাজয়ের অপেক্ষায় বাংলাদেশ । ম্যাচের চতুর্থ দিন জয়ের জন্য স্বাগতিকদের প্রয়োজন মাত্র ৩৫ রান । আর হাতে আছে সাত উইকেট । ম্যাচের এমন অবস্থায় বাংলাদেশের পক্ষে বাজী ধরার মত আসলে কিছু নেই । বরং শুরুর দিন থেকে ব্যাকফুটে থাকা বাংলাদেশ অ্যান্টিগা টেস্টের খেলা চারদিনে টেনে নিয়ে যেতে পেরেছে , এতেই বরং তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলা যেতে পারে !

বৃহস্পতিবার (১৬ জুন) থেকে মাঠে গড়িয়েছিল বাংলাদেশ আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যকার দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্ট । ঘাসযুক্ত বাউন্সি উইকেটে টস হেরে বাংলাদেশকে ব্যাট করতে পাঠান ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক ক্রেইগ ব্রেথওয়েট । নিজ দেশের ন্যাড়া আর স্পিন সহায়ক পিচে খেলে অভ্যস্ত বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে এমন উইকেটে সব সময়েই বাড়তি চিন্তা থাকে । অ্যান্টিগায় যার ব্যতিক্রম হয় নি । ব্যাটসম্যানদের আসা-যাওয়ার প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস শেষ হয়েছিল ১০৩ রানে । বাংলাদেশের ছয় ব্যাটসম্যান রানের খাতাই খুলতে পারেন নি । অধিনায়ক সাকিব আল হাসান হাফসেঞ্চুরি (৫১) করে বাংলাদেশের মুখ কিছুটা হলেও রক্ষা করেছেন ।

অবশ্য অ্যান্টিগাতেই চার বছর আগে বাংলাদেশ অল আউট হয়েছিল নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে সর্বনিম্ন ৪৩ রানে । সেই তুলনায় বরং এই যাত্রায় উন্নতি হয়েছে ব্যাটসম্যানদের , এমন ভেবে নিলে কষ্ট কমে যাবে টাইগার ভক্তদের ।

বাংলাদেশের বোলাররা ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসে নিজেদের সেরা চেষ্টা করেছে । স্বাগতিকদের আটকে দিয়েছে ২৬৫ রানে । কিন্তু তাতেও ক্যারিবিয়ানরা লিড নেয় ১৬২ রানের । আসলে ব্যাটসম্যানদের পুঁজি এত কম ছিল যে , তা নিয়ে বিশ্বের যে কোন বোলিং লাইন আপের পক্ষেই লড়াই করা প্রায় অসম্ভব । কিন্তু তা স্বত্বেও মেহেদি হাসান মিরাজ চার উইকেট , খালেদ আর এবাদত দুই উইকেট এবং মুস্তাফিজুর রহমান আর সাকিব এক উইকেট নিয়ে ‘অসম’ হয়ে পড়া লড়াইটাকে কিছুটা ‘ভদ্রস্ত’ চেহারা দেয়ার চেষ্টা করেছেন ।

প্রথম ইনিংসের ব্যর্থতা ঝেড়ে ঘুরে দাঁড়াতে দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের কাছে প্রত্যাশা ছিল অনেক । আশা ছিল , একাধিক ব্যাটসম্যান লম্বা ইনিংস খেলবেন । তাতে বাংলাদেশ ম্যাচে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলবে । অপরদিকে আশংকাও ছিল , প্রথম ইনিংসের মত ব্যর্থ হলে তিনদিনেই না শেষ হয় টেস্ট । বাংলাদেশের কপালে না জোটে ইনিংস পরাজয় !

না , আশংকার কোনটা সত্য হয় নি । বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংসে করেছে প্রথম ইনিংসের দ্বিগুণের বেশী রান । আর তাতে ছোটখাটো লিড নেয়া যেমন হয়েছে , তেমনি ম্যাচটাও গড়িয়েছে চতুর্থ দিনে । আহ , শান্তি ! আবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতেই তিন উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের বোলাররা সুযোগ করে দিয়েছেন আক্ষেপে মাতার । ইস , বাংলাদেশ যদি ব্যাটিংটা আরেকটু ভাল করত !

এখানেই তো যত সমস্যা । বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মাঝে টেস্ট ম্যাচ উপযোগী ব্যাটিং করার সামর্থ্যের যেমন অভাব আছে , তেমনি আছে টেস্ট খেলতে পারা ব্যাটসম্যানদের ফর্মহীনতা আর ধারাবাহিকতার অভাব । আছে ইনিংস বড় করতে না পারার ব্যর্থতা । তামিম ইকবাল খান বাংলাদেশের মাটিতে শ্রীলংকার বিপক্ষে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে পা রেখেছিলেন ক্যারিবিয় দ্বীপে । সেখানেও অনুশীলন ম্যাচে পেয়েছিলেন তিন অংকের ম্যাজিক ফিগারের দেখা । কিন্তু টেস্টের মুল মঞ্চে দুই ইনিংসেই আশা জাগানিয়া শুরুর পর ধরেছেন প্যাভিলিয়নের পথ । প্রথম ইনিংসে ২৯ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে করেছেন ২২ রান । আর দুই ইনিংসেই একইভাবে আলজারি জোসেফের বলে উইকেটের পেছনে জশুয়া ডি সিলভার হাতে ধরা পড়েছেন তিনি ।

প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ছয়জন ‘ডাক’ মেরেছিলেন । দ্বিতীয় ইনিংসে অবশ্য তেমন হয় নি । ওপেনার হিসেবে তামিমের সঙ্গী মাহমুদুল হাসান জয় বেশ ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে করেছেন ১৫৩ বলে ৪২ রান । কিন্তু তিনিও ইনিংস টেনে নিতে পারেন নি । হাফসেঞ্চুরি থেকে বেশ দূরে কেমার রোচের বলে খোঁচা দিয়ে কট বিহাইন্ড হয়েছেন ।

সদ্য সাবেক অধিনায়ক মুমিনুলের কথা যত কম বলা যায় ততই ভাল । এক সময় টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রধান ভরসা ছিলেন মুমিনুল হক । টেস্ট ক্রিকেটে ১১ সেঞ্চুরির মালিক মুমিনুল শেষ করবে হাফসেঞ্চুরি পেয়েছেন , সেটা হয়ত নিজেই ভুলে গেছেন । পরিসংখ্যান বলছে , টেস্টের সবশেষ নয় ইনিংসে কোন হাফসেঞ্চুরির দেখা পান নি বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক । অ্যান্টিগায় প্রথম ইনিংসে ‘ডাক’ মারার পর দ্বিতীয় ইনিংসে করেছেন ২ রান । পরিস্থিতি বলছে , টেস্ট ক্রিকেটের কঠিন প্রতিযোগিতায় নিজেকে ফিরে পেতে মুমিনুলের সম্ভবত খানিকটা ‘বিশ্রাম’ দরকার !

সহ-অধিনায়ক লিটন দাস প্রথম ইনিংসে ১২ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে আউট হয়েছেন ১৭ রানে । মুশফিকুর রহমান ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে নেই । হজ্বব্রত পালনের কারণে তিনি ছুটি নিয়েছেন এই সফরে । অভিজ্ঞ মুশফিকের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের ইনিংস গড়ার দায়িত্ব ছিল তামিম , মুমিনুল আর লিটনদের উপরে । কিন্তু প্রথম টেস্টে কেউই পারেন নি ভরসার প্রতিদান দিতে ।

তবে দুই ইনিংসেই বাংলাদেশের মুখ রক্ষা করেছেন সাকিব । তৃতীয়বারের মত টেস্ট দলের অধিনায়কত্ব পাওয়া সাকিব দুই ইনিংসেই অর্ধশতকের দেখা পেয়েছেন । দ্বিতীয় ইনিংসে উইকেট কিপার নুরুল হাসান সোহানকে নিয়ে যোগ করেছেন ১২৩ রান । সপ্তম উইকেটে এই জুটিই বাংলাদেশকে ইনিংস পরাজয় থেকে বাঁচিয়েছে । যদিও দিনের শেষে আফসোস থেকে যাচ্ছে জুটিটা আরও বড় না হওয়ার ।

সাকিব ৯৯ বল খেলে ছয়টি চারে করেছেন ৬৩ রান । আর সোহান ৬৪ রান করেছেন ১৪৭ বলে । মেরেছেন ১১টি চার ।

দ্বিতীয় ইনিংসে কেমার রোচ পাঁচ উইকেট নিয়ে ছিলেন সেরা বোলার ।

জয়ের জন্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে লক্ষ্য মাত্র ৮৪ রানের । এত কম লক্ষ্যে আর যাই হোক , জয়ের স্বপ্ন দেখা যায় না যদি অলৌকিক কিছু না ঘটে ! তবে সেই অলৌকিক কিছু ঘটিয়ে দেবার মতই কাণ্ড যেন শুরু করে দিয়েছিলেন খালেদ আহমেদ । দিনের শেষভাগে বল হাতে নিয়েই তিনি শিকার করেন তিন উইকেট । ক্যারিবিয়ানদের স্কোরবোর্ডে তখন জমা পড়েছে মাত্র ৯ রান !

অসম্ভব কিছুর সপ্নে নড়েচড়ে বসা বাংলাদেশের ভক্তদের অবশ্য পরবর্তীতে হতাশ করেছেন জন ক্যাম্পবেল আর জার্মেই ব্ল্যাকউড । অবিচ্ছিন্ন চতুর্থ উইকেটে ৪০ রান জুড়ে তারা শেষ করেছেন দিনের বাকী সময় । যেখান থেকে চতুর্থ দিনে বাংলাদেশের পক্ষে দুই একটা চমক জাগানিয়া মুহূর্ত ছাড়া খুব বেশী আশা করার মত কিছু নেই আসলে ।

এখন পর্যন্ত যা খেলা হয়েছে , তাতে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরাই থাকবে কাঠগড়ায় । উইকেট রান তোলার জন্য সহজ ছিল না , সত্যি । কিন্তু নিজেরা ভুল না করলে এই উইকেটে টিকে থাকা সম্ভব , সেটা দ্বিতীয় ইনিংসে দেখিয়েছেন মাহামুদুল হাসান জয় আর সোহানরা । আসলে ধৈর্যের পরীক্ষা আর বলের মেরিট চিনতে ভুল করাই বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানদের মুল সমস্যা । সাথে আছে আলগা বলে অহেতুক ব্যাট চালাবার প্রবণতা । আর এসবই আত্মবিশ্বাস না থাকার লক্ষণ ।

তৃতীয় দিনের ম্যাচ শেষে বাংলাদেশ প্রধান কোচ রাসেল ডোমিঙ্গোর কন্থেও ছিল একই অভিযোগ, ‘ ব্যাটসম্যানরা সবাই আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিতে ভুগছে। আমাদের অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানদের মধ্যেই এই প্রবণতা লক্ষণীয় । ক্রিকেটে আত্মবিশ্বাস অনেক বড় ব্যাপার। এই মুহূর্তে ছেলেদের ব্যাটিংয়ে কোনো আত্মবিশ্বাস নেই।’

বাংলাদেশ দুই ইনিংসে তিনটি হাফসেঞ্চুরির দেখা পেয়েছে । যার দুইটি করেছেন সাকিব , আরেকটি সোহান । কিন্তু একটি ইনিংসও সেঞ্চুরিতে পরিনত হয় । অথচ টেস্ট ক্রিকেটে সম্মানজনক সংগ্রহের জন্য কাউকে না কাউকে বড় ইনিংস খেলতে হবে । এই নিয়ে বাংলাদেশের কোচ স্বাভাবিকভাবেই ভাবছেন , সোহান আর সাকিব – দুজনের একজন সেঞ্চুরি করলে ম্যাচের ছবিটা ভিন্ন হতে পারত । তিনি বলেছেন , ‘ দুজনেই ভাল ব্যাট করেছে এবং হাফসেঞ্চুরি পেয়েছে । ঠিক আছে । কিন্তু তারা তাদের ইনিংস আরও বড় করতে পারত । । ৬০ রানের ইনিংস আমাদের টেস্ট জেতাবে না। আমাদের সেঞ্চুরি করতে হবে। এটাই আসল কথা । ‘

বোলারদের প্রশংসায় ডোমিঙ্গো জানিয়েছেন , ‘বোলাররা সবাই দুই ইনিংসেই দারুণ বোলিং করেছে। প্রথম ইনিংসে আমার দেখা ওদের সেরা বোলিংটাই করেছে। এই উইকেটে ২৬০ রানে রাখা সহজ কথা নয়। গত দুই দিন বোলারদের পারফরম্যান্সে আমি খুবই গর্বিত।’

কোচের কথা সাথে দ্বিমত করার সুযোগ নেই কারো । এই ম্যাচ শেষে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে ব্যাটসম্যানদেরই । কারণ কঠিন হলেও উইকেট না খেলতে পারার মত অসম্ভব ছিল না । কিন্তু ব্যাটসম্যানদের আত্মবিশ্বাস তলানিতে থাকলে বিশ্বের সেরা ব্যাটিং উইকেট হয়ে পড়ে নরকতুল্য । বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে অ্যান্টিগায় ।

আহাস/ক্রী/০০১