Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

আবার উত্তাপ ছড়াক মোহামেডান আবাহনীর লড়াই

আহসান হাবীব সুমন/ক্রীড়ালোকঃ

চলমান বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ (বিপিএল) ফুটবলে মুখোমুখি হচ্ছে দেশের দুই জনপ্রিয় দল মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব আর আবাহনী ক্রীড়া চক্র লিমিটেড । বাংলাদেশের ফুটবলে যা ‘ঢাকা ডার্বি’ নামে পরিচিত । বুধবার (২২ জুন) স্থানীয় সময় বিকেল চারটায় কুমিল্লার শহীদ ধিরেন্দ্রনাথ স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দল ।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্ম ফুটবল মানেই বোঝে বার্সেলোনা-রিয়েল মাদ্রিদ , ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার লড়াই । তাদের মনন আর চিন্তায় কেবল ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো আর লিওনেল মেসি । অথচ একটা সময় ছিল , বাংলাদেশের ফুটবল ভক্তদের কাছে মোহামেডান আর আবাহনী ছিল প্রথম এবং শেষ কথা । মোহামেডান আর আবাহনীর লড়াই মানেই ছিল সারা দেশের দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাওয়া । খেলা হচ্ছে ঢাকায় । কিন্তু টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া সেই ম্যাচের উত্তাপে উন্মাতাল । সারা দেশের আকাশ জুড়ে পতপত করে উড়েছে দুই দলের পতাকা । পেলে-ম্যারাডোনা কিংবা রোনালদো-মেসি নয় ।  তর্ক বেঁধেছে সালাউদ্দিন , বাদল , সালাম , মোনেম মুন্না , কায়সার , সাব্বির , আসলামদের মধ্যে কে সেরা । সেই তর্ক কখনও কখনও রুপ নিয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত হিংসাত্মক ঘটনায় । আর স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে হাঙ্গামা না হলে তো ম্যাচই জমতো না যেন ! 

সেই মোহামেডান আর আবাহনী ফের মুখোমুখি হচ্ছে ফুটবলে । অথচ এই ম্যাচ নিয়ে মানুষের আগ্রহ খুব একটা নেই বললেই চলে । আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একের পর এক ব্যর্থতায় দেশের মানুষ ফুটবল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে অনেক আগেই । ফিফা র‍্যাংকিংয়ে পেছন দিকে ছুটতে থাকা বাংলাদেশের ১৯০ এর পরে অবস্থান এখন শুধুই হতাশা সৃষ্টি করে । যার প্রভাব স্পষ্ট পড়েছে ক্লাব ফুটবলে । এমন না যে বাংলাদেশ দল এক সময় নিয়মিত আন্তর্জাতিক শিরোপা ঘরে তুলত । কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে ছিল সালাউদ্দিন , বাদল , সাব্বির , জোসি , মনুদের মত তারকা ফুটবলার , যাদের খেলা দেখতে মাঠে ছুটে যেত দর্শক । বর্তমান ফুটবলে এমন কোন তারকা নেই , যাকে দেখার জন্য মাঠে ছুটে যেতে আগ্রহী হবে ভক্তরা ।

আবার দল হিসেবে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ক্রমাবনতিও ‘ঢাকা ডার্বি’ থেকে সাধারণের আগ্রহ হারিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ । একটা সময় ছিল যখন মোহামেডান যে কোন প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হওয়াকে ভাবতো ব্যর্থতা বলে , সেখানে এই সময়ে  সাধারণ কোন ম্যাচেও জয়ের নিশ্চয়তা না পাওয়া হতাশায় ডুবিয়েছে ভক্তদের ।  বিস্ময়কর হলেও সত্য ,  পেশাদার ফুটবল  লীগের যুগে মোহামেডান কখনও শিরোপা জিততে পারে নি । ২০০২ সালে সর্বশেষ ঢাকা লীগ জিতেছিল সাদাকালো শিবির । আর ২০১৪ সালে জিতেছিল স্বাধীনতা কাপ ।সেটাই এখন পর্যন্ত ঢাকা মোহামেডানের সর্বশেষ সাফল্য । অথচ কে বলবে , এই মোহামেডান দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৯বার জিতেছে লীগ শিরোপা । খেলেছে এশিয়ান ক্লাব কাপের চূড়ান্ত পর্বে । ফেডারেশন কাপ মোহামেডানের ঘরে উঠেছে দশবার ।সাথে অন্যান্য শিরোপা তো আছেই । 

চলতি বিপিএলেও মোহামেডান নেই শিরোপা লড়াইয়ে । ১৫ ম্যাচে ২২ পয়েন্ট নিয়ে ষষ্ঠ অবস্থানে আছে মোহামেডান । কিছুদিন আগেই কোচ শেন লি দায়িত্ব ছেড়েছেন নানা অভিযোগে । মোহামেডানের নতুন কোচ এখন শফিকুল ইসলাম মানিক । এবারেই প্রথম মোহামেডানের কোচ হন নি মানিক । আগেও তিনি দুই দফায় মোহামেডানের ডাগ আউটে দাঁড়িয়েছেন ।লীগের  বাকী সাত ম্যাচে মানিকের লক্ষ্য , ‘দল এখন যে অবস্থায় আছে সেখান থেকে আরও ভাল কিভাবে করা যায় সেটাই লক্ষ্য থাকবে। ‘ 

নতুন দায়িত্বে আবাহনীর বিপক্ষে কঠিন ম্যাচ দিয়েই হতে চলেছে মানিকের প্রথম পরীক্ষা । ম্যাচটির উত্তাপ এখন আর আগের মত না থাকলেও কাগজে-কলমে ‘মর্যাদা’র অবশ্যই । যদিও মাঠের লড়াইয়ে বর্তমানে আবাহনীর চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে মোহামেডান । বিপিএলে সবচেয়ে বেশী ছয়বার শিরোপা জিতেছে আবাহনী । চলতি মৌসুমে আবাহনীর ঘরে গেছে স্বাধীনতা আর ফেডারেশন কাপ । পর্তুগিজ কোচ মারিও লেমাসের অধীনে বিপিএলের লীগ টেবিলে দুইয়ে থাকলেও শিরোপা লড়াইয়ে অবশ্য কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে আবাহনী । এই মুহূর্তে ১৫ ম্যাচে ৩২ পয়েন্ট নিয়ে লীগ টেবিলের দুইয়ে আছে আকাশী-হলুদ শিবির । আর ১৬ ম্যাচে ৪১ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে বসুন্ধরা কিংস । শিরোপা লড়াইয়ে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে মোহামেডানের বিপক্ষে জয় ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই আবাহনীর সামনে ।

মোহামেডানের বিপক্ষে সাম্প্রতিক ইতিহাসে আবাহনী অনেকটাই এগিয়ে । চলতি লীগের প্রথম দেখাতেও আবাহনী চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের বিপক্ষে জিতেছে ১-০ গোলে । আর মোহামেডান সর্বশেষ আবাহনীর বিপক্ষে জয় পেয়েছিল ২০১৯ সালে । দল হিসেবেও আবাহনী বর্তমান সময়ে মোহামেডানের চেয়ে অনেক বেশী সমৃদ্ধ । এই দলে আছে কোস্টারিকার হয়ে বিশ্বকাপ খেলা ড্যানিয়েল কলিন্দ্রেস , ব্রাজিলের ডরিয়েলটন , রাফায়েল আগুস্তো আর ইরানের মিলাদ শেখ সোলাইমানি । দেশীদের মধ্যে আছে জাতীয় দলের টুটুল হোসেন বাদশাহ , সোহেল রানা , রাকিব হোসেনরা । আছেন নাবিব নেওয়াজ জীবন আর জুয়েল রানা । যারা প্রত্যেকেই জাতীয় দলে খেলার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ।

অন্যদিকে মোহামেডানের জাফর ইকবাল সর্বশেষ বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে খেলেছেন । তবে দলের মুল তারকা আসলে মালির ফরোয়ার্ড সোলেমান দিয়াবাতে । মালির এই ফরোয়ার্ড এখন পর্যন্ত ১২ গোল করে লীগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা । বলতে গেলে , লীগে মোহামেডানের পাওয়া প্রতিটা পয়েন্টের পেছনে অবদান  ছিল  দিয়াবাতের  । মোহামেডানের বিদেশিদের মধ্যে মেসিডোনিয়ার জেসমিন কার্ড সমস্যার কারণে খেলতে পারবেন না । একই কারণে খেলা হবে না উগু ওবে মানিকের । তাই আবাহনীর বিপক্ষে মোহামেডানের বিদেশী বলতে সোলেমান দিয়াবাতের সাথে আছে শুধু অস্ট্রেলিয়ার অ্যারন রিয়ার্ডন । এছাড়া শাহেদ হোসেন আর শাহরিয়ার ইমনদের উপর থাকবে ভরসা ।

কুমিল্লায় মোহামেডানের বিপক্ষে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান আর দলীয় শক্তির বিচারে আবাহনী স্পষ্ট ফেভারিট । তবে ম্যাচে কে জিতবে সেটা আসলে এখন বড় কথা না । বড় কথা হচ্ছে , ম্যাচটি দর্শকদের মনোযোগ পাবে কিনা । খেলা ঢাকা স্টেডিয়ামে হলে কি হত বলা মুশকিল । কিন্তু কুমিল্লায় দুই দলের গ্যালারিতে দর্শক কম হবে না বলেই আশা করা যায় । কারণ গেল বছরেও এই একই মাঠে আবাহনী-মোহামেডানের ম্যাচে এসেছিলেন ১৫ হাজার দর্শক। এই নিয়ে দেশের সাবেক তারকা ফুটবলার আশরাফউদ্দীন আহমেদ চুন্নু বলেছিলেন , ‘ ‘মানুষজন ফুটবল থেকে মুখ ফেরায়নি, ঢাকার ফুটবল থেকে মুখ ফিরিয়েছে। ঢাকার বাইরে এখনও ফুটবল বেশ জনপ্রিয়। আবাহনী-মোহামেডানের সমর্থক এখনো সারা দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।’

চুন্নু মনে করেন , ‘এখনও আবাহনী আর মোহামেডানের জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনা সম্ভব যদি এখানে ভালো মানের খেলোয়াড় তুলে আনা যায়। যাদের নামের কারণে, খেলোয়াড়ী দক্ষতার কারণে আবার দর্শক ফিরে আসবে। তবে মোহামেডানেরও দায় আছে। তাদেরকেও ক্লাব হিসেবে আবার হারানো গৌরব ফেরাতে হবে। তবে যদি পরিস্থিতির উন্নতি হয়।’

চুন্নুর কথা সত্যি । আবাহনী তবু সাধ্যের মধ্যে সেরাদের নিয়েই দল গড়ছে আর সাফল্যও পাচ্ছে । কিন্তু মোহামেডানের বড় দৈন্যদশা চলছে । অনেক বছর হয়ে গেল , মোহামেডান এমন একটি স্কোয়াড তৈরি করতে পারে নি যা দিয়ে বসুন্ধরা কিংস কিংবা আবাহনীকে চ্যালেঞ্জ জানানো সম্ভব । আগামীতে যদি মোহামেডানের কর্মকর্তারা একটি শক্তিশালী স্কোয়াড গঠন করতে পারে , তবে দলের সমর্থকরাও জেগে উঠবে । তারাও ধীরে ধীরে মাঠে ফিরতে শুরু করবে । তাতে কিছুটা হলেও উত্তাপ ফিরে পাবে আবাহনী-মোহামেডান লড়াই ।

আহাস/ক্রী/০০১