Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

শ্রীলঙ্কার সাফল্যেও শিখবে না বাংলাদেশের কর্তারা ?

ক্রীড়ালোক প্রতিবেদকঃ

আবারও ফাইনালের একেবারে কাছে গিয়ে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে বাংলাদেশের । শ্রীলঙ্কায় চলমান প্রাইম মিনিস্টার রাজাপাক্সে টুর্নামেন্ট থেকে বাংলাদেশ বিদায় নিয়েছে স্বাগতিকদের কাছে হেরে ।

মঙ্গলবার (১৬ নভেম্বর) কলম্বোর রেসকোর্স মাঠে অনুষ্ঠিত ম্যাচে বাংলাদেশ ১-২ গোলে হেরেছে শ্রীলঙ্কার কাছে । অথচ এই ম্যাচে ড্র করলেও বাংলাদেশ ফাইনালে খেলার সুযোগ পেত । কিন্তু হেরে যাওয়ায় শ্রীলঙ্কার সমান তিন ম্যাচে চার পয়েন্ট নিয়েও ‘হেড টু হেড’ বিবেচনায় বাদ পড়েছে বাংলাদেশ । ফাইনালের অন্য দল সেশেলস ।

ম্যাচটি নিয়ে বাংলাদেশ অনেক অভিযোগ করতে পারে । হয়ত শেষ মুহূর্তে শ্রীলঙ্কার পাওয়া পেনাল্টি ‘ন্যায্য’ ছিল না , যা ডুবিয়েছে বাংলাদেশকে । কিন্তু গোটা ম্যাচে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের গোল মিসের মহড়া , প্রথম গোলে রক্ষণের ভুল – এসব কিছুতেই উপেক্ষা করা যাবে না । আবার তপু বর্মণের পেনাল্টি মিসকেও হয়ত বাফুফে কর্মকর্তারা ‘নিছক দুর্ভাগ্য’ বলে আয়েশ করতে চাইবেন !

কিন্তু সত্যি কি শুধু দুর্ভাগ্য আর রেফারির ‘পক্ষপাতিত্ব’তে বাংলাদেশের ফলাফল বিপর্যয় ? বিষয়টা এত সহজভাবে দেখছেন না সমালোচকরা । বরং বাংলাদেশের ফুটবল যে বহু বছর ধরে উল্টো পথে চলছে আর শ্রীলংকায় বাংলাদেশের করুণ বিদায় – সেই ধারাবাহিকতায় এটা পরিস্কার ।

বাংলাদেশ দলে একজন ফরোয়ার্ড নেই , যার কাঁধে গোল করার দায়িত্ব দিয়ে নির্ভার হওয়া যায় । এই দেশের ঘরোয়া ফুটবলে দেশীয় ফরোয়ার্ডদের খুঁজে পাওয়া যায় না । সব দলেই গোল করার মুল দায়িত্ব বিদেশীদের । এমন অবস্থায় নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার এলিটা কিংসলে হতে পারতেন বাংলাদেশের ভরসা । যিনি ২০১৬ সালে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করে ২০২১ সালের মার্চ মাসে এই দেশের নাগরিকত্ব পান । সেপ্টেম্বরে পেয়েছেন বাংলাদেশের পাসপোর্ট । অর্থাৎ তিনি এখন বাংলাদেশী । কিন্তু বাংলাদেশের হয়ে এলিটার আন্তর্জাতিক ম্যাচে খেলার প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্র এখনও জোগাড় করতে পারে নি বাফুফে !

প্রতিটা দেশেই এখন বিদেশী খেলোয়াড়দের নাগরিকত্ব দিয়ে খেলার নিয়ম পুরনো হয়ে গেছে । ফ্রান্সের বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন দলেই এমন খেলোয়াড় একাধিক । জার্মানিতেও তাই । কিন্তু এলিটার বিষয়ে বাফুফে’র মনোভাব রয়ে গেছে এখনও বিমাতাসুলভ ।

একই পরিস্থিতি প্রবাসী খেলোয়াড়দের নিয়েও । বাংলাদেশ দলে এই মুহূর্তে সেরা খেলোয়াড় জামাল ভুঁইয়া । তিনি দলের অধিনায়কও । তিনি সুইডেনে জন্ম নেয়া বাংলাদেশী । কিন্তু এই জামাল ভুঁইয়া ছাড়া আর কোন প্রবাসী খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে সদয় নয় দলের কর্তারা । অথচ বাংলাদেশের বর্তমান স্কোয়াডে ওবাইদুর রহমান নবাব , তিনি কাতার প্রবাসী । ২২ বছরের এই স্ট্রাইকার সর্বশেষ মৌসুমে ছিলেন বসুন্ধরা কিংসে । যদিও ইনজুরির কারণে খেলতে পারেন নি দুই ম্যাচের বেশী । এখন তিনি ফিট । দলের সাথে গেছেন শ্রীলঙ্কায় । কিন্তু কোচ মারিও লেমাস একটি ম্যাচেও পরীক্ষা করে দেখেন নি তাকে ।

নবারের ফুটবলার হিসেবে বেড়ে ওঠা কাতারের অ্যাসপায়ার ফুটবল একাডেমিতে।অ্যাসপায়ার ফুটবল একাডেমি থেকেই কাতারের বয়সভিত্তিক জাতীয় দলেও জায়গা পেয়ে যান এই বাংলাদেশি তরুণ। মাঠের পার্ফরমেন্স দিয়েই সুযোগ পান কাতারের শীর্ষ স্থানীয় ক্লাব আল দুহাইলের অনূর্ধ্ব-২৩ দলে হয়ে খেলার। খেলেছিলেন আল দুহাইলের মূল দলেও। তবে খুব বেশি না, মাত্র দুই ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন এই ২২ বছর বয়সী ফুটবলার। অথচ সেই নবাবকে এখন বাংলাদেশের জার্সি গায়ে মাঠে নামার আগে দিতে হচ্ছে ধৈর্যের পরীক্ষা ।

বাংলাদেশের সাবেক হয়ে যাওয়া কোচ জেমি ডে সর্বপ্রথম উপলব্ধি করেছিলেন , এই দেশের ফুটবলের উন্নতিতে প্রবাসী ফুটবলার প্রয়োজন । সেই মোতাবেক তিনি উদ্যোগ নিয়েছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের জাতীয় দলের জন্য জড়ো করার । জামাল ভুঁইয়াদের পর তারিক কাজী , তাহমিদ ইসলাম ও রাহবার খানরা বিভিন্ন সময় সুযোগ পেয়েছেন জাতীয় দলের স্কোয়াডে । যদিও পর্যাপ্ত সুযোগ দেয়া হয় নি কাউকেই ।

এদিকে ফ্রান্স থেকে উড়ে আসা নায়েব মো. তাহমিদ ইসলামকে সুযোগ দেন নি জেমি ডে ফিটনেসের অজুহাতে । এছাড়া ইংল্যান্ড প্রবাসী মাহদি ইসুফ খানকে নিয়েও ভাবা হয়েছিল । 

বাংলাদেশ যেখানে প্রবাসী খেলোয়াড়দের ব্যবহার করতে ব্যর্থ হচ্ছে , সেখানে শ্রীলংকা বাজীমাৎ করেছে প্রবাসীদের দিয়ে । শ্রীলংকা দলে ওয়াসিম রাজিক এখন ‘সুপারস্টার’ । এই আসরেই মালদ্বীপের বিপক্ষে আকাই করেন চার গোল আর বাংলাদেশের বিপক্ষে দুইটি । রাজিক লেবাননের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে করেন জোড়া গোল। বর্তমানে শ্রীলঙ্কার ক্লাবে নাম লেখানোর আগে খেলেছেন জার্মানির বার্লিনের আঞ্চলিক চতুর্থ স্তরের দল বার্লিনার একে ০৭ দলে।

শ্রীলংকা দলে আরও আছেন ডিলন ডি সিলভা ও মারভিন হ্যামিলটন – এরাও প্রবাসী । যাদের নিয়ে শ্রীলংকা দল ঘুরে দাঁড়াচ্ছে । অথচ বাংলাদেশের ফুটবল কর্তাদের ঘুম ভাঙ্গার কোন লক্ষণ নেই ।

এদিকে সমস্যা আছে আরও । জাতীয় দলের খেলোয়াড় বাছাই করার ক্ষেত্রে কর্তাদের মধ্যে দেখা যায় বিশেষ ক্লাব-প্রীতি । ম্যানেজার সত্যজিত দাস রুপুর বিপক্ষে অনেকদিন ধরেই অভিযোগ , তিনি ঢাকা আবাহনী লিমিটেডের ফুটবলারদের জাতীয় দলে বিশেষ সুযোগ দেন তিনি ! এমনকি সর্বশেষ দুই কোচ অস্কার ব্রুজেন আর মারিও লেমাস সাফ টুর্নামেন্ট আর রাজাপাক্সে আসরে নিজ নিজ খেলোয়াড়দের আসন্ন মৌসুমের জন্য ঝালিয়ে নিয়েছেন , এমন অভিযোগ দেখা যাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায় ।

তবে যাই হোক না কেন , কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাফুফে কর্তাদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে । এমনিতেই দেশের ফুটবল আছে সর্বনাশের শেষ ধাপে । সেখান থেকে উত্তরণে দেশীয় খেলোয়াড়দের সাথে এলিটার মত বিদেশী আর নবাবদের মত প্রবাসীদের সুযোগ দিতে হবে । এটা করতে হবে দেশের স্বার্থেই ।

আহাস/ক্রী/০০৩