Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

গড়ে দেয়া চিত্রনাট্যে মহানায়ক মেসি !

বিশেষ প্রতিবেদনঃ

দুর্নীতি সুশাসনের অন্তরায়। কিন্তু দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে নেমে পড়লে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের অপকর্ম প্রমাণ করাটাও দুরহ হয়ে পড়ে। ঠিক কোন খেলা পাতানো আয়োজনে নিষ্পত্তি হতে থাকলে আমি ও আপনি তা ধরতে পারবো কি করে ! তবে সন্দেহ, শংকা এবং বাস্তবতার সংমিশ্রণে ‘বিবেক’ নামক অনুষঙ্গ মনকে প্রশ্ন করায়, যা হচ্ছে তা নকল না তো ? সত্যি তো ?

এমনই অনুসন্ধানের খোরাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসিকে চিন্তা করবার সময় এসেছে। কেন তিনি এক পয়েন্টের খেলোয়াড় হয়েও ছয় বারের ব্যালন জয়ী, কেন তিনি লা লীগায় গোলের পর গোল পেয়ে যাচ্ছেন? কেন লা লীগায় ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনা এতবার করে শিরোপা জিতেই যাচ্ছে? কেন তিনি ম্রিয়মাণ থেকেও ফুটবল বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হচ্ছেন? এমন নয় যে, লিওনেল মেসি ডান পায়ে গোল করতে সিদ্ধহস্ত, হেড করে গোলের দেখা পাচ্ছেন অহরহ— তাহলে মাঠের ডানদিক দিয়ে ঢুকে বাম পায়ের মাধ্যমে কয়েকজনকে কাটিয়ে গোলের নিশানা বের করে নিচ্ছেন যুগের পর যুগ—– বিষয়টি নিয়ে চলুন, আজকের প্রতিবেদনটি পড়ে নেয়া যাক।

শনিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) এইবারকে ৫-০ গোলে হারিয়েছে বার্সেলোনা । ম্যাচে মেসি একাই করেছেন চার গোল । সাম্প্রতিক সময়ে পারফর্মেন্স নিয়ে চাপে থাকা বার্সেলোনা আর মেসির জন্য এই ম্যাচ ছিল স্বস্তির । সবই ঠিক আছে , কিন্তু এই ম্যাচে প্রথম চারটি গোলেই প্রতিপক্ষের ডিফেন্স এড়াতে পারবে না নিজেদের দায় । প্রতিটা গোলের সময়েই মনে হয়ে এইবারের ডিফেন্সের ভঙ্গুর দশা । যেন আরেকটু সতর্ক হলেই নাও হতে পারত গোলগুলো ।

মেসি এবং বার্সেলোনার সাম্প্রতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে অবশ্য এইবারের বিপক্ষে মেসির চার গোল পাওয়া নিয়ে খুব বেশী অবাক হতে হয় না । এবার বরাবর মেসির প্রিয় প্রতিপক্ষ । এখন পর্যন্ত এইবারের বিপক্ষে ১১ ম্যাচে মেসির সব মিলিয়ে গোলের সংখ্যা ২০টি । গড় ১.৮২ ! সেভিয়ার বিপক্ষে মেসি সবচেয়ে বেশী ৩৮ ম্যাচে ৩৭টি গোল করেছেন । কিন্তু সেখানে তার গোলের গড় ০.৯৭ । অর্থাৎ লা লীগায় ম্যাচ প্রতি গোলের ক্ষেত্রে এইবার মেসির সবচেয়ে প্রিয় প্রতিপক্ষ । এর আগেও ২০১৭ সালের অক্টোবরে এইবারের বিপক্ষেই চার গোল করেছিলেন মেসি ।

স্পেনে মেসির প্রিয় প্রতিপক্ষ খুঁজতে গেলে সেভিয়া কিংবা এইবার ছাড়াও চলে আসবে ওসাসুনা , লেভান্তে , মায়োর্কা আর গ্রানাডার নাম । এদের প্রত্যেকের বিপক্ষে ম্যাচ প্রতি একটির বেশী গোল করার রেকর্ড মেসির । মোদ্দা কথা হচ্ছে , এই নির্দিষ্ট প্রতিপক্ষের বিপক্ষে গোল করার উৎসবে মেসি সব সময়েই সিদ্ধহস্ত । প্রায় প্রতি মৌসুমেই এই কয়েকটি দলের বিপক্ষে দুইবার করে দেখায় ১৫-১৬ গোল করা মেসির যেন ডাল-ভাত । আর মৌসুম শেষে এই গোলগুলোই মেসিকে এনে দিচ্ছে পিচিচি কিংবা ইউরোপিয়ান গোল্ডেন-বুটের মত পুরস্কার । এইরকম ছয় দলের বিপক্ষে গোলের নিশ্চয়তাই মেসিকে এগিয়ে দিচ্ছে অন্যদের চেয়ে ।

চলতি বছরে তো মেসি অনেকটাই পিছিয়ে ছিলেন ইউরোপের অন্য প্রতিপক্ষদের চেয়ে । কিন্তু এইবারের বিপক্ষে সর্বশেষ ম্যাচে চার গোল করে তিনি আবার চলে এসেছেন আলোচনায় । চলতি মৌসুমেই বার্সেলোনার ম্যাচ আছে মায়োর্কা , লেগানেস , ওসাসুনা আর সেভিয়ার বিপক্ষে । এই সমস্ত মেসি আরও কিছু গোল করবেন , সেটা নিশ্চিত । আবার তিনি হয়ত জিতে যাবেন স্পেনের সেরা গোলদাতার পুরস্কার , এমনকি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন-বুটটাও ।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে , এইসবন দলের বিপক্ষেই মেসি কিংবা বার্সেলোনা কেন এত জ্বলে ওঠে ? উত্তর অবশ্য সোজাসুজি দেয়ার উপায় নেই , আছে সন্দেহ । স্পেনের ফুটবলে সাম্প্রতিক সময়ে বার্সেলোনার আধিপত্যে অনেকেই নানারকম সন্দেহ প্রকাশ করেন । কেউ মনে করেন , কাটালুনিয়া প্রদেশ নিয়ে স্পেনে যে রাজনৈতিক উত্তেজনা ; তার অনেকটা প্রভাব আছে এর পেছনে । বার্সেলোনাকে খেলাধুলায় সাফল্য এনে দিয়ে কাটালুনিয়ার স্বাধীনতাকামীদের একটু আয়ত্তে রাখার চেষ্টা করছে স্পেন সরকার । তাই রেফারি থেকে শুরু করে লা লীগা কমিটি কিংবা স্পেনের ফুটবল ফেডারেশন প্রায়শই হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে বার্সেলোনার বিপদে । সেটা খেলার মাঠে মাঝেমাঝেই কিন্তু প্রত্যক্ষ করা যায় । গত এক দশকের বেশী সময়ে বার্সেলোনার অনেক জয় নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে । বার্সেলোনার খেলায় রেফারির কালো-বাঁশি তাদের পক্ষে যাবার অভিযোগ নতুন কিছু না ।

আবার মেসির প্রতিও রয়েছে স্পেনের ফুটবল ফেডারেশনের বিশেষ মমতা । আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের হয়ে খেললেও মেসি আসলে বার্সেলোনার গড়ে তোলা সম্পদ । ছয়টি ব্যালন ডি অর’জয়ী মেসি লা লীগার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন । সেই কারণে মেসিকে সংরক্ষিত রাখার একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশ স্পেনের অন্য দলগুলোর কাছে দেয়া আছে বলে জানিয়েছেন ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী সাবেক তারকা ইমানুয়েল পেতিত । তিনি জানান , মেসিকে স্পেনের ফুটবলে বিশেষ নিরাপত্তা দেয়া হয় । সেই কারণেই তিনি সেখানে সফল । স্পেন ছাড়া অন্য কোথাও তিনি সফল হবেন না ।

মেসিকে নিয়ে এমন মন্তব্য অনেকেই করেছেন । আর বিশ্লেষণ করলে তার সত্যতাও পাওয়া যায় । গত দুই চ্যাম্পিয়ন্স লীগের এএস রোমা আর লিভাপুলের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল বার্সেলোনা । নিজেদের মাঠে প্রথম লেগে ভাল ব্যবধানে জিতেও পরের লেগে তারা হেরে বসেছে আরও বড় ব্যবধানে । আবার এর উল্টো ঘটনাও দেখা গেছে । ১০১৬-১৭ মৌসুমেই পিএসজির মাঠে এক হালি গোল খেয়েছিল বার্সেলোনা । কিন্তু নিজেদের মাঠে রেফারির প্রত্যক্ষ মদদে ফ্রান্সের দলটিকে ছয় গোল দিয়ে দেয় বার্সা । অর্থাৎ আবারও সেই ঘরের মাঠে বাঘ বার্সার পরিত্রাতা হিসেবে সামনে চলে আসেন রেফারি । দুইটি পেনাল্টি আর প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত সময় খেলিয়ে সেবার বার্সাকে রক্ষা করা হয় । এমন ঘটনা অনেক আছে ।

মেসি অনেক বড় খেলোয়াড় , তাতে কোন সন্দেহ নেই । কিন্তু সেরার প্রশ্নে তাকে নিয়ে নিঃসন্দেহ হওয়ার উপায় নেই । শুধু বাম পায়ের কারিশমা আর এক পয়েন্ট দিয়ে খেলা মেসির সামর্থ্য আসলেই সীমিত । আবার সেই সীমিত সামর্থ্য নিয়ে দিনের পর দিন সেরাদের সাথে লড়াই করে যাওয়ার কারণে টা তাকে শ্রদ্ধা না করেও উপায় নেই । কিন্তু তাই বলে কি তিনি সবার সেরা ?

হ্যাঁ , মেসির দলীয় কিংবা ব্যক্তিগত ট্রফির সংখ্যার দিকে তাকালে তাকে সেরা না বলে উপায় নেই । কিন্তু শুধুমাত্র লা লীগা আর স্পেনে বার্সেলোনার হয়ে পাওয়া সাফল্যের কারণে তার এত ট্রফি নিয়েও তোলা যায় প্রশ্ন । ক্লাব ফুটবলেই ইউরোপের অন্য যে কোন মাঠে মেসি খুব বেশী সফল , সেটা বলা যাবে না । বরং ইদানিং তো অ্যাওয়ে ম্যাচ হলেই তাকে আর্জেন্টিনার খুদে যাদুকরকে খাবি খেতে দেখা যাচ্ছে । গেলো মৌসুমেই সেরা গোলদাতা ছিলেন মেসি চ্যাম্পিয়ন্স লীগে । অনেক দিন পর নক আউট পর্ব থেকে সেমি পর্যন্ত করেছেন চার গোল । কিন্তু একটিও প্রতিপক্ষের মাঠে না । অর্থাৎ ন্যু ক্যাম্পে পাওয়া সাফল্য দিয়েই মেসি গেলবার জিতেছেন ব্যালন আর ফিফা’র বর্ষসেরা পুরস্কার । যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অবশ্যই যুক্তির বাইরে না ।

আসলে মেসির ক্যারিয়ারে এমনই হয়ে আসছে । আন্তর্জাতিক ম্যাচে কিংবা বার্সেলোনার হয়ে স্পেনের বাইরে খুব বেশী সাফল্য না পেয়েও হয়ে যাচ্ছেন সেরা । এটা খুব অদ্ভুদ । এই ক্ষেত্রে মেসিকে ফিফার বরপুত্র বললেও কম বলা হবে না । সর্বশেষ ফিফা’র বর্ষসেরা পুরস্কারের ক্ষেত্রে মেসির পক্ষে ফিফার ভোটচুরির অভিযোগ এসেছে প্রকাশ্যে । এমন অভিযোগ করেছে খোদ কয়েকটি জাতীয় দলের কোচ ও অধিনায়ক।

সুদানের কোচ দ্রাভকো লুগারিসিচের দাবি ছিল , তিনি মিশরের মোহাম্মদ সালাহকে ভোট দিয়েছিলেন । কিন্তু সেটা দেখানো হয়েছে মেসির পক্ষে । শুধু সুদানিজ কোচ নন, ফিফার দিকে ভোট কারচুপির আঙুল তুলেছেন মিসরের অধিনায়ক আহমেদ এল মোহামাদি। জানিয়েছেন, তিনিও প্রথম পছন্দ হিসেবে ভোট দিয়েছেন সতীর্থ সালাহকে। কিন্তু তার ভোটটি নিবন্ধিত (গণ্য) হয়নি।

নিকারাগুয়ার দলের অধিনায়ক হুয়ান বারেরা জানিয়েছিলেন , তিনিও মেসিকে ভোট দেন নি । কিন্তু অবাক হয়েছেন মেসির পক্ষে তার ভোট দেখানোয় ! এমন ভূতুড়ে ঘটনা আগেও ঘটেছে মেসির ক্ষেত্রে । কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু হয় নি । ফিফার আশীর্বাদ নিয়ে মেসি হয়ে গেছেন বিজয়ী ।

ফুটবলের ইতিহাসে সব মিলিয়ে মেসিকে ‘সেরা’ না হলেও সবচেয়ে ভাগ্যবান ঠিকই বলা যায় । ফিফা আর স্পেনের গড়ে দেয়া চিত্রনাট্যে তিনি এখন মহানায়ক । তবে সেটা হয়ত শুধু সময়ের জন্যই । কারণ এক সময় সত্যিকার ইতিহাস বিশ্লেষণ হবে । সেই সময়ে ইতিহাসের কোন জায়গায় মেসি অবস্থান করবেন , সেটা ভবিষ্যৎ বলে দেবে ।

আহাস/ক্রী/০০৪