Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

মাঝপথে জমজমাট ইউরোপের লীগ লড়াই

আহসান হাবীব সুমন/ক্রীড়ালোকঃ

বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা যে ফুটবল , এই নিয়ে বোধ করি তর্ক করতে যাবেন না কেউ । যদিও বাংলাদেশে এখন ফুটবলের জনপ্রিয়তায় ভাগ বসিয়েছে ক্রিকেট । কিন্তু তাই বলে এই দেশে ফুটবলের ভক্ত কমে গেছে , এমন ভুল ভাবনাতেও থাকা উচিৎ না কারো । হয়ত আন্তর্জাতিক ফুটবলে ব্যর্থতার কারণে ধ্বস নেমেছে দেশীয় ফুটবলের জনপ্রিয়তায় । কিন্তু এখনও রাত জেগে ইউরোপের প্রতিদ্বন্দ্বিতামুলক লীগ ফুটবলের খেলা দেখা দর্শকের কোন অভাব নেই এই দেশে । এমনকি ক্রিকেটের জনপ্রিয়তার সময়ে চলমান বঙ্গবন্ধু বিপিএল যেখানে দর্শক পাচ্ছে না , সেখানেও হুমড়ি খেয়ে পড়ছে বাংলাদেশের ফুটবল ভক্তরা ইউরোপের লীগের খেলা দেখতে টেলিভিশনের সামনে । প্রতি মুহূর্তে খবর রাখছে , কোন দেশের লীগে কোন দল এগিয়ে আছে শিরোপা যুদ্ধে । ব্যক্তিগত ফুটবল-শৈলীতে কোন খেলোয়াড় এই মুহূর্তে এগিয়ে আছেন অন্যদের চেয়ে ।

জনপ্রিয়তার নিরিখে ইউরোপের সেরা পাঁচ লীগ হচ্ছে – ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লীগ , স্পেনের লা লীগা , ইটালির সিরি ‘এ’ , জার্মানির বুন্দেস লীগা আর ফ্রান্সের লীগ ওয়ান । ইতোমধ্যেই এই পাঁচ লীগের ২০১৯-২০ মৌসুম পেরিয়ে এসেছে অর্ধেকটা পথ । এই সময়ে শিরোপা লড়াই নিয়ে আগাম কথা বলাটা একটু বোকামি । কারণ এইসব লীগে এতটাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় যে , শিরোপা নিস্পত্তি বেশীরভাগ সময়ে হয়ে থাকে একেবারে শেষ দুই এক ম্যাচে । তবু  সর্বশেষ  কোন দেশের লীগে কোন দল কি অবস্থানে আছে সেটা নিয়ে আলোচনা করাই যায় ।

লিভারপুলের ঘরেই যাচ্ছে ইপিএল শিরোপা ?

প্রথমেই আলোচনায় আসা যাক ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ । বিশ্বসেরা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো , লিওনেল মেসি , কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা নেইমার জুনিয়রের মত জনপ্রিয় ফুটবলার এখানে খেলেন না । কিন্তু তাতে কি ! এখনও সারা বিশ্বে দর্শক বিবেচনায় ইপিএল সবচেয়ে আগে । যদিও চলমান মৌসুমে ইপিএলের শিরোপা লড়াই হতে চলেছে প্রায় একপেশে ।

গত মৌসুমেও ইপিএলের শিরোপা শেষ ম্যাচে এসে জিততে হয়েছিল ম্যানচেস্টার সিটিকে । আর শেষ মুহূর্তে রানার্স আপ হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় লিভারপুলকে । পরে যারা জিতেছিল উইয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ । আর এবার লীগ শিরোপার দৌড়ে যোজন এগিয়ে গেছে অল রেডরা ।

এখন পর্যন্ত লীগে ২০টি খেলা শেষ করেছে লিভারপুল । যার মধ্যে জিতেছে ১৯টি আর ড্র একটি । লীগের একমাত্র অপরাজিত দল লিভারপুল ৫৮ পয়েন্ট নিয়ে আছে সবার আগে । ২১ খেলায় ৪৫ পয়েন্ট নিয়ে লিচেস্টার সিটি দুইয়ে আর সমান ম্যাচে ৪৪ পয়েন্ট নিয়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ম্যান সিটি আছে তিনে ।

এখনই এক ম্যাচ খেলে ১৩ পয়েন্ট এগিয়ে আছে লিভারপুল নিকট প্রতিপক্ষের চেয়ে । তাদেরকে ধরা অসম্ভব না হলেও খুব কঠিন , এমনটা মেনে নিয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বী দলের অনেকেই । ম্যান সিটির কোচ পেপে গুয়ার্দিওলা তো মনে করছেন , লীগ শিরোপা চলেই গেছে লিভারপুলের ঘরে !

আসলেই তাই । কারণ এই মুহূর্তে সাদিও মানে , রবার্ট ফির্মিনিও আর মোহাম্মদ সালাহরা যে ফর্মে আছেন , তাতে তাদের আটকে দেবার ক্ষমতা খুব কম দলের আছে ইংল্যান্ডে । ইউর্গেন ক্লপসের অধীনে খুব হিসেব-কষে খেলছে লিভারপুল । যেখানে পা হড়কাবার সম্ভাবনা কমে আসছে দিন দিন । আর হড়কালেই বা কত ? এখন যে অবস্থায় আছে লীগের পয়েন্ট টেবিল , তাতে অন্যদের সুযোগ দিতে লিভারপুলকে হারতে হবে কমপক্ষে পাঁচ ম্যাচ ! আর অন্যদের জিততে হবে সব ম্যাচ । বর্তমান অবস্থায় এমন কিছু ঘটবে বলে আশা করাটাও বোকামি । তাই এবার ইপিএল শিরোপা যে লিভারপুল জিতছে , সেটা আগেভাগেই বলে দিলে খুব বেশী সাহসের কাজ হবে না ।

লিভারপুল শিরোপা জিতলে সেটা হবে প্রকৃতির ন্যায্য বিচার । কারণ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের (২০) তারাই সবচেয়ে বেশী জিতেছে ইংলিশ লীগ (১৮ বার) । অথচ সেই দলটি সর্বশেষ লীগ শিরোপা পেয়েছে ১৯৮৯-৯০ মৌসুমে । এই সময়ে একাধিকবার ইউরোপসেরা হয়েছে তারা । একাধিকবার কাছাকাছি গেছে লীগ শিরোপার । কিন্তু সেটা পাওয়া হয় নি । এবার সেটা পেয়ে গেলে লিভারপুলের নতুন প্রজন্মের ভক্তদের জন্য হবে দারুণ পাওয়া । আর পুরনো পাঁড় ভক্তরাও মেতে উঠতে পারবেন স্মৃতিচারণে ।

লা লীগা যাবে কার ঘরে ?

স্প্যানিশ লা লীগায় ১৯টি করে ম্যাচ খেলে ফেলেছে বেশীরভাগ দল । কিন্তু শীর্ষে থাকা দুই দল বার্সেলোনা আর রিয়েল মাদ্রিদ সমানে সমান লড়াই করছে ৪০ পয়েন্ট নিয়ে । নতুন বছরের প্রথম ম্যাচে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন বার্সেলোনা ড্র করেছে এস্পানিওলের সাথে । আর রিয়েল জিতেছে গেটাফের বিপক্ষে । তাতে আবারও দুই দলের পয়েন্ট সমান ।

আগামীতে বার্সেলোনার চেয়ে খানিকটা সুবিধায় আছে রিয়েল মাদ্রিদ । কারণ নিজেদের ২১তম ম্যাচে বার্সেলোনা খেলতে যাবে ভ্যালেন্সিয়ার মাঠে । ম্যাচটি পয়েন্ট টেবিলের ছয়ে থাকা ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে সহজ হবে না কাটালানদের জন্য । বিশেষ করে ভ্যালেন্সিয়া লড়ছে আগামী চ্যাম্পিয়ন্স লীগে জায়গা পাওয়ার জন্য । আবার ২৩তম ম্যাচেও বার্সেলোনাকে খেলতে যেতে হচ্ছে রিয়েল বেটিসের মাঠে ।

আবার রিয়েল তাদের পরবর্তী ম্যাচ খেলবে চারে থাকা সেভিয়ার বিপক্ষে । তবে নিজেদের মাঠে খেলা বলে এই ম্যাচে জিনেদিন জিদানের দল বাড়তি সুবিধা কিছু পাচ্ছেই । ২২তম ম্যাচেও রিয়েল খেলবে নিজেদের মাঠে নগর প্রতিপক্ষ এথলেটিকও মাদ্রিদের বিপক্ষে । এই দুই ম্যাচে প্রত্যাশিত জয় পেলে রিয়েলের সামনে থেকে দূর হবে কঠিন বাঁধা ।

রাউন্ড ছাব্বিশে মুখোমুখি হবে বার্সেলোনা আর রিয়েল মাদ্রিদ । এটাও হবে রিয়েলের মাঠ স্যান্টিয়াগও বার্নাব্যুতে । এখানেও ঘরের মাঠে এগিয়ে থাকার কথা রিয়েলের ।

সব মিলিয়ে আগামী কয়েকটা রাউন্ডেই পরিস্কার হয়ে যেতে পারে লা লীগার শিরোপা লড়াইয়ের সার্বিকচিত্র । নিজেদের ঘরের মাঠে বড় ম্যাচগুলোয় পয়েন্ট না হারালে এবার কিন্তু রিয়েল মাদ্রিদের ঘরে লীগ শিরোপা যাবার সম্ভাবনা বেশী । বিশেষ করে আগামীদিনে বার্সেলোনার কয়েকটা বড় আর কঠিন ম্যাচ আছে প্রতিপক্ষের মাঠে । আর চলতি মৌসুমে এওয়ে ম্যাচে বার্সেলোনার ফল খুব ভাল না , মাথায় রাখতে হবে এটাও ।

এদিকে সেরা গোলদাতার দৌড়েও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বার্সেলোনা আর রিয়েলের মধ্যেই । এখন পর্যন্ত ১৩ গোল করা বার্সা অধিনায়ক মেসি আছেন সবার আগে । অন্যদিকে রিয়েলের  করিম বেঞ্জেমা করেছেন ১২ গোল । আবার ১১ গোল করা সুয়ারেজ নেই পিছিয়ে । ফলে  চলতি মৌসুমের ‘পিচিচি’ নিয়েও চলছে দারুণ লড়াই । 

কঠিন অবস্থা ইটালিতে –

ইটালিয়ান সিরি ‘এ’ তে চলছে ত্রিমুখী লড়াই । যদিও ১৭ ম্যাচে সমান ৪২ পয়েন্ট করে নিয়ে লীগ শিরোপা জয়ের দৌড়ে খানিকটা এগিয়ে আছে ইন্টার মিলান আর গত আটবারের চ্যাম্পিয়ন জুভেন্টাস । কিন্তু এক ম্যাচ কম খেলে ৩৬ পয়েন্ট পাওয়া ল্যাৎজিও পিছিয়ে নেই খুব একটা । নিজেদের পরবর্তী ম্যাচে ব্রেসিয়ার বিপক্ষে জয় পেলেই শীর্ষ দুই দলের সাথে পয়েন্টের ব্যবধান তিনে নেমে আসবে ল্যাৎজিওর । ফলে তাদের একেবারেই রাখা যাচ্ছে না লীগ শিরোপা লড়াইয়ের বাইরে ।

ল্যাৎজিওর কিরো ইমোবেল আছেন দারুণ ফর্মে । ১৭ গোল নিয়ে তিনি এখন লীগের শীর্ষ গোলদাতা । এছাড়া ইন্টারের রুমেলু লুকাকু করেছেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১২ গোল । জুভেন্টেসের মহাতারকা রোনালদো পেয়েছেন ১০গোল । আগামী দিনে এই ফুটবলারদের জ্বলে ওঠা নির্ধারণ করবে লীগের ভাগ্য ।

জার্মানিতে শেষ হচ্ছে বায়ার্ন মিউনিখের আধিপত্য?

ইটালিতে যেমন চলছে জুভেন্টাস যুগ , ঠিক তেমন জার্মানিতে একচ্ছত্র রাজত্ব চালাচ্ছে বায়ার্ন মিউনিখ । গত সাত মৌসুমে বাভারিয়ানরা লীগ শিরোপা জয়ের সুযোগ দেয় নি অন্য কাউকে । কিন্তু এবার তাদের পড়তে হচ্ছে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে । এই মুহূর্তে ১৭ ম্যাচে ৩৩ পয়েন্ট নিয়ে লীগ টেবিলের তিনে আছে বায়ার্ন । আর সমান ম্যাচে ৩৭ পয়েন্ট পাওয়া লেইপজিগ আছে শীর্ষে । দুইয়ে থাকা মঞ্চেনগ্লাডবাখ পেয়েছে ৩৫ পয়েন্ট । বুরুশিয়া আছে চারে সমান ম্যাচে ৩০ পয়েন্ট নিয়ে । একই অবস্থানে রয়েছে শালকে-০৪ ।

তবে বায়ার্নের জন্য এমন অবস্থা নতুন না । গত মৌসুমেও তারা লীগের মাঝপথে অনেকটা পিছিয়ে ছিল বুরুশিয়ার চেয়ে । কিন্তু শেষের দিকে নিজেদের ফিরে পেয়ে দুই পয়েন্টের ব্যবধানে লীগ জয় করে তারা ।

এবারেও তেমন কিছু হবে না কে বলতে পারে । বিশেষ করে বড় ম্যাচে বায়ার্নের জ্বলে ওঠার রেকর্ড বেশ পুরাতন ।

লীগ শিরোপার সাথে সেরা গোলদাতা হবার প্রশ্নেও দারুণ লড়াই চলছে বায়ার্নের রবার্ট লেভেন্ডস্কি আর লেইপজিগের টিমো ওয়ার্নারের মধ্যে । এখন পর্যন্ত ১৯ গোল করে শীর্ষে আছেন পোলিশ ফরোয়ার্ড লেভেন্ডস্কি । আর ১৮ গোল করে তার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন ওয়ার্নার ।

ফ্রেঞ্চ লীগ ওয়ানে হ্যাট্রিকের সম্ভাবনায় পিএসজি –

এবারেও লীগ ওয়ানের শিরোপা চলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে প্যারিস সেইন্ট জার্মেইয়ের ঘরে । গত দুই আসরের টানা চ্যাম্পিয়নরা গড়তে পারে শিরপার হ্যাট্রিক । এই মুহূর্তে ১৮ ম্যাচে ৪৫ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে আছে তারাই । আর এক ম্যাচ বেশী খেলা অলিম্পিক মার্সেই ৩৮ পয়েন্ট নিয়ে আছে দুইয়ে ।

আসলে গত কয়েক মৌসুম ধরেই পিএসজির তুলনায় শক্তির বিচারে লীগ ওয়ানের অন্যরা বড্ড বেশী পিছিয়ে । কেইলর নাভাসের মত কিপার আছে তাদের পোস্টের নীচে । আছে থিয়াগো সিলভা আর থমাস মুনিয়েরের মত রক্ষণসেনা । এছাড়া যে দলে নেইমার , এমবাপ্পে , আনহেল ডি মারিয়া , মাউরো ইকার্দি আর এডিসন কাভানিদের মত আক্রমণভাগের খেলোয়াড় আছে , তাদের শুধু নিজ দেশে লীগ নয় ; জেতার কথা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ !

তবে পিএসজির মহাতারকাদের ভিড়ে এবার চমক দেখাচ্ছেন মোনাকোর উইসাম বেন এডার । ১৩ গোল নিয়ে তিনি আছেন লীগ ওয়ানে সবার শীর্ষে । আর পিএসজির এমবাপ্পে ১১ গোল নিয়ে দুইয়ে । একই দলের ইকার্দি নয়টি আর নেইমার পেয়েছেন আট গোলের দেখা । পিএসজির বিশ্বতারকাদের পেছনে ফেলে উইসাম যদি সেরা গোলদাতা হয়ে যান , সেটাও হবে বড় বিষয় !

শেষ কথা –

আগেই বলা হয়েছে , এখনও ইউরোপের সেরা পাঁচ লীগের অর্ধেক পথ মাত্র পাড়ি দেয়া হয়েছে দলগুলোর । এখনই কোন দল কোন লীগে শিরোপা জিতবে সেটা বলা মুশকিল । শুধুমাত্র ইপিএল আর হয়ত ফ্রেঞ্চ লীগ লীগ ওয়ান সম্পর্কে কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে আগাম সিদ্ধান্তে আসার একটা চেষ্টা করা যায় । কিন্তু বাকী তিন লীগে শেষ পর্যন্ত কি হবে সেটা বলা সত্যিই মুশকিল । এইক্ষেত্রে শেষ পরিনতি জানার জন্য লীগের খেলাগুলোর দিকে নিবিড় নজর রাখাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ । আমরা না হয় সেটাই করি ।

আহাস/ক্রী/০০৫