Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

ক্রিকেটে জাপানের নতুন সূর্যোদয়

আহসান হাবীব সুমন/ক্রীড়ালোকঃ 

দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে শুরু হয়েছে আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেট । ওয়ানডে ফরম্যাটে শুরু হওয়া এই বিশ্বকাপের দ্বিতীয় দিনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামছে এশিয়ার দেশ জাপান । শনিবার (১৮ জানুয়ারি)  পচেস্ট্রমে অনুষ্ঠিত হবে এই ম্যাচ ।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে যুব বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচটি জাপানের জন্য হতে চলেছে ঐতিহাসিক এক মুহূর্ত । কারণ ক্রিকেটের বিশ্ব পর্যায়ে এই ম্যাচের মাধ্যমেই অভিষেক হতে চলেছে জাপানের । এর আগে জাপান কখনই ক্রিকেটের কোন  বিশ্বমঞ্চে  খেলার সুযোগ পায় নি ।

ক্রিকেটে জাপানের এটা প্রথম বিশ্বকাপ । অথচ সূর্যোদয়ের দেশে ক্রিকেট এসেছিল বহু আগেই । বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মত জাপানেও ইংলিশ বনিকরা ক্রিকেটের প্রচলন করে । জানা যায় , ১৮৬৩ সালে এখানে প্রথম ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় । আর প্রথম ক্রিকেট ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭০ সালে । যদিও ইংরেজদের এই খেলার প্রতি স্থানীয় জাপানীরা খুব বেশী আগ্রহ দেখায় নি । বরং ১৮৮০ সালের দিকে জাপানে আমেরিকানদের হাত ধরে চলে আসে বেইস-বল । সেটাই বরং স্থানীয়দের কাছে হয়ে ওঠে তুমুল জনপ্রিয় । এছাড়াও ফুটবলের ভক্ত জাপানীরা ক্রিকেটকে তেমনভাবে গ্রহণ করে নি কখনই ।

ক্রিকেট জাপানে জনপ্রিয়তা না পাওয়ার মূল কারণ মনে করা হয় ‘ লম্বা সময় ধরে খেলা চলাকে’ । জাপানের নাগরিক জীবন খুবই ব্যস্ত আর ব্যয়বহুল । এখানে নষ্ট করার মত সময় কারো হাতে  নেই । ফলে পাঁচদিন ধরে খেলা ক্রিকেট (এক সময়ে শুধু টেস্ট ছিল) মনোযোগ কাঁড়তে পারে নি জাপানিদের ।

তবে ইদানিং পরিস্থিতি কিছুটা বদল হয়েছে । ওয়ানডে আর বিশেষ করে টি-২০ ফরম্যাট চালুর পর চেষ্টা করা হচ্ছে জাপানে ক্রিকেট খেলা  প্রসার ঘটাবার ।

জাপান ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের (জেসিএ) অপারেশন্স প্রধান অ্যালান কার জানিয়েছেন , ‘ জাপানে ক্রিকেট একটা আজব ব্রিটিশ খেলা হিসেবে পরিচিত ছিল !  যা খেলতে অনেক লম্বা সময় , এমনকি কয়েকদিন লাগে ! তবে এখন ক্রিকেট অনেক অল্প সময়ে শেষ হচ্ছে । একটা টি-২০ ম্যাচের জন্য বেইস-বলের মতই ঘণ্টা তিনেকের মত লাগে । এই সময়ের বিষয়টি ধরেই আমরা জাপানে ক্রিকেটের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাবার চেষ্টা করছি । ‘

অ্যালান কার নিজে একজন ব্রিটিশ । জেসিএ’র জুনিয়র ক্রিকেট প্রোগ্রামের প্রোজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে তিনি জাপানে আসেন ২০১৪ সালে । বর্তমানে জাপান ক্রিকেট বোর্ডের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি তিনি । তার সময়েই ক্রিকেট ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে জাপানে ।

জাপানের চলতি যুব বিশ্বকাপে খেলা ছিল অনেকটাই নাটকীয় । ২০১৯ সালের ২ থেকে ৮ জুন , জাপানের সানোতে অনুষ্ঠিত হয় ইস্ট এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের বাছাই পর্ব । স্বাগতিক জাপান ছাড়াও পাপুয়া নিউগিনি, ভানুয়াতু, ফিজি ও সামোয়ার মধ্যে এ বাছাই পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। জাপান ৩ টি খেলায় সরাসরি জয়লাভ করে । কিন্তু পাপুয়া নিউগিনি সাথের জাপানের ম্যাচটিতে পাপুয়া নিউগিনির পর্যপ্ত খেলোয়ার না থাকায় জাপানকে জয়ী ঘোষণা করা হয় । ফলে জাপান প্রথম বারের মত ক্রিকেট বিশ্বকাপের কোন ইভেন্টে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে ।

উল্লেখ্য , ডিসিপ্লিন ইস্যুতে পাপুয়া নিউগিনি জাপানের সাথে ম্যাচের আগে তাদের দলের ১৪ জন খেলোয়ারের মধ্যে ১১ জনকে সাসপেন্ড করলে খেলোয়ার সংকটে পড়ে । আর তাতেই ওয়াক ওভার পাওয়া জাপানের প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপ খেলা নিশ্চিত হয় ।

ইতিহাসের প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপে জাপান যুব দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন অ্যাশলে থারগেট । এখনও ১৭ বছর পুরো হয় নি তার । বাম হাতে ব্যাট করলেও ডান হাতে করেন মিডিয়াম পেস বোলিং । দলের ১৬ বছর বয়সী কুজুমাসা তাকাশি আর রেইজি সুতোরা ক্রিকেট শুরু করেছেন মাত্র তিন-চার বছর হল । কিন্তু ক্রিকেট এখন তাদের নেশা । যা তাদের নিয়ে এসেছে যুব বিশ্বকাপের মঞ্চে । এভাবেই অতি  পরিশ্রমী জাপানীরা দ্রুত উঠে আসছে বিশ্ব ক্রিকেটে । 

জাপান শিল্প-বানিজ্য কিংবা অর্থনীতিতে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ হলেও সামাজিকভাবে রক্ষণশীল । বিশেষ করে নিয়মের বাইরে যাওয়ায় এখানকার মানুষ খুব অভ্যস্ত না । নতুন কিছু গ্রহণ করতে এদের একটু সময় লাগে । ক্রিকেটের ক্ষেত্রেও তাই ।

এই নিয়ে ইংলিশম্যান কার জানান , ‘ ক্রিকেটের মত অপ্রচলিত খেলার প্রতি জাপানীদের আগ্রহ জাগাতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে । আমরা যে পুরো সফল হয়েছি , সেই দাবী অবশ্যই করা যাবে না । কিন্তু জাপানের শিশুদের অনেকেই ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে , এটা অনেক বড় স্বস্তির কথা । এখন এইসব শিশুদের গড়ে তোলাই বড় চ্যালেঞ্জ । ‘

জাপান শুধু যুব বিশ্বকাপেই না , অংশ নিতে চায় পরবর্তী ওয়ানডে বিশ্বকাপে । ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত হবে সেই বিশ্বকাপের বাছাই পর্ব ।

কার জানান , ‘ প্রথমবারের মত যুব বিশ্বকাপে খেলছে জাপান । কিন্তু এটাকে আমরা শুধু শুরু হিসেবেই দেখছি । আমরা চেষ্টা করব ২০২৩ সালের পরবর্তী ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলতে । আমরা খুব পরিকল্পনা-মাফিক ভবিষ্যতের দিকে এগুচ্ছি । ‘

কার জানিয়েছেন , জাপানের ঘরোয়া ক্রিকেটে অংশ নেয়া ক্রিকেটারদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে । জাপানে এখন নিয়মিত প্রিমিয়ার লীগ আর বিভিন্ন ডিভিশনের খেলা অনুষ্ঠিত হয় । সাথে চলছে মেয়েদের ক্রিকেট লীগ । এইসব লীগে স্থানীয়দের সাথে  জাপানে অভিবাসীরা অংশ নিচ্ছেন । যা জাপানের জন্য বয়ে আনছে সুফল । রেজুয়ানুর কবির , আশিক চৌধুরী , কুলদ্বীপ বিশান্ত , অশোক তেলাং – এরা সবাই জাপানে নাগরিকত্ব পাওয়া প্রবাসী ক্রিকেটার । এরা প্রত্যেকেই জাপানের ঘরোয়া ক্রিকেটে বড় তারকা ।

এছাড়া জাপানের যুব দলে আছেন তুষার চতুর্বেদী , ম্যাক্স ক্লেমেন্ট , নীল শৈলেস দাঁতে , ঈশান ফাতিয়াল আর দেবাশিষ সাহুর মত খেলোয়াড় , যারা আসলে বিদেশী বংশোদ্ভূত ।

২০১২ সালেই ক্রিকেটে এক বিশ বছর মেয়াদী পরিকল্পনা নিয়েছিল জাপান । তাদের লক্ষ্য ছিল , যথা সম্ভব কম সময়ে জাপানের পাঁচটি বড় শহরে অন্তত অন্তত পাঁচ হাজার ক্রিকেটার তৈরি বা খুঁজে বের করা । যে কাজ এখনও চলছে ।

কার জানান , ‘ জাপানে ক্রিকেট যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে , সেটা খুব বিস্ময়কর । এক সময় ক্রিকেটে পিছিয়ে থাকা আয়ারল্যান্ড আর আফগানিস্তান চমক দেখাচ্ছে । আমরাও সেই আশায় আছি । হয়ত দক্ষিণ আফ্রিকায় যুব বিশ্বকাপেই আমরা বড় কোন চমক দেখাতে পারব ।

সদ্য শুরু হওয়া যুব বিশ্বকাপে জাপান খেলছে ‘এ’ গ্রুপে । যেখানে নিউজিল্যান্ড ছাড়াও আছে ভারত আর শ্রীলঙ্কা । গ্রুপটি জাপানের জন্য অবশ্যই শক্তিশালী । কিন্তু এখানে জাপান যদিও কোন একটি দলকে রুখে দিতে পারে , সেরা হবে বড় ঘটনা ।

আহাস/ক্রী/০০৩