Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

একজন সত্যিকার ক্রীড়াপ্রেমিক ছিলেন এরশাদ

ক্রীড়ালোক প্রতিবেদকঃ

তাঁর কথা আলাদা করে না বললেই নয়। পল্লীবন্ধু হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের কথাই বলা হচ্ছে। যিনি রবিবার (১৪ জুলাই) সকাল ৮টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিচার করলে ইতিহাসের পাতায় সাবেক এই সেনা শাসকের নামের সাথে স্বৈরাচার তকমা জুড়ে থাকলেও নিজের ব্যক্তিত্ব, রাজনীতি, সরলতার দিকগুলো নিয়ে একসূত্রে একাকার হলে তাঁকে ঘিরে অন্তিম মন্তব্যের দিকে ছুটতে হলে বলতে হবে, বড় ভাল লোক ছিল ! শরীরটাকে ফিট রাখার মাঝে এই এরশাদের সবচেয়ে বড় গুন ছিল, তিনি খেলাধুলাকে ভালবাসতেন। বিকেএসপি( বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই জানান দিয়েছিলেন, আমার চাইতে বড় ক্রীড়াপ্রেমি আর কে দেশে ?

জেনারেল এরশাদের গড়ে তোলা বিকেএসপি বাংলাদেশের খেলাধুলায় কত বড় অবদান রেখে চলেছে , সেটা সবারই জানা । আজকের বিশ্বসেরা অল রাউন্ডার সাকিব আল হাসান বিকেএসপিতে অনুশীলন করেছেন এক সময় । মাগুরার স্থানীয় ক্রিকেট থেকে তাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিকেএসপি’র আছে বড় অবদান ।

সাকিব ছাড়াও বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের অধিনায়ক নাইমুর রহমান দুর্জয় , আব্দুর রাজ্জাক , মুশফিকুর রহিম আর কমনওয়েলথ সোনাজয়ী আসিফ হোসেনের মত ক্রীড়াবিদ এই বিকেএসপি থেকে উঠে আসা । ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বিকেএসপি এখন সারা বাংলাদেশের উঠতি খেলোয়াড়দের আশা ভরসার প্রতীক । যা এরশাদের অবদান ।

১৯৮৪ সালে শুরু হয় সাফ গেমসের আসর । এই সাফ গেমস শুরুর পেছনেও রয়েছে এরশাদ সরকারের ভুমিকা ।  সাফের  ১৯৮৫ সালের দ্বিতীয় আসর ছিল ঢাকায় । ব্যাপক প্রস্তুতিতে সেই সাফের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় এরশাদ আর্মি স্টেডিয়াম । প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ ৯টি সোনা , ১৭টি রুপা আর ৩৮টি তাম্র পদক নিয়ে তৃতীয় হয় । যা বাংলাদেশের খেলাধুলার জগতে ছিল আশার আলো ।

এরশাদের শাসনকালে ফুটবল ছিল জনপ্রিয়তার শীর্ষে । সেই সময়ে ঢাকার লীগে খেলে গেছেন বিশ্বকাপের তারকা  ফুটবলাররা  । সারা দেশে ছিল মোহামেডান আবাহনীর মত ক্লাবের জন্য মানুষের তোলপাড় করা ভালবাসা । সেই সময়ে থাইল্যান্ড , ইন্দোনেশিয়ার মত দলকে হারাবার কৃতিত্ব দেখিয়েছে বাংলাদেশ । আর এই দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ক্লাব মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব তো গন্য হত এশিয়ার সেরা দশটি ক্লাবের একটি হিসেবে ।

এরশাদ আমলের শেষের দিকে ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ ফাইনালে দক্ষিণ কোরিয়ার ইউনিভার্সিটি দলকে হারিয়ে ঢাকায় জিতে নেয় প্রেসিডেন্ট গোল্ড কাপ । সেবারের আসরে খেলেছিল ইরান আর থাইল্যান্ডের যুব দল ।

বর্তমান সময়ে ক্রিকেটের চলছে রমরমা অবস্থা । বাংলাদেশ এখন ক্রিকেট বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত শক্তি । অথচ এরশাদ আমলেই ওয়ানডে স্ট্যাটাস পাওয়ার আগে বাংলাদেশে জিতেছিল প্রথম কোন আন্তর্জাতিক আসরের শিরোপা । ১৯৮৪ সালে ঢাকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ১ম দক্ষিন এশীয় ক্রিকেট আসরে রকিবুল হাসানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল ফাইনালে হংকংকে(১৫১) তিন উইকেটে হারিয়ে দিয়ে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি জয় করেছিলো বাংলাদেশ দল । অর্থাৎ আজকের ক্রিকেটের উঠে আসার পেছনে সেই সময়ের অবদান কোনভাবেই ভোলার মত না ।

১৯৮৭ সালে নিয়াজ মোরশেদ দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দাবাড়ু হিসেবে অর্জন করেন সর্বোচ্চ গ্র্যান্ড মাস্টার শিরোপা । সেই সময়ে নিয়মিত দাবার বিভিন্ন ঘরোয়া আর আন্তর্জাতিক আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে এই দেশে । যার ফল ছিল নিয়াজের বিশ্বসেরাদের কাতারে আসা । সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে প্রথম আন্তর্জাতিক সুপারস্টার ছিলেন নিয়াজ ।

১৯৯০ সালে আতিকুর রহমান আর আবদুস সাত্তার কমনওয়েলথ গেমসের শ্যুটিং বিভাগে স্বর্ণ জিতে হইচই ফেলে দেন । সেই সাফল্য ছিল এরশাদ আমলে তাদেরকে দেয়া সুযোগ সুবিধার ফসল ।

১৯৮৫ আর ১৯৮৭ সালের সাফ গেমসে দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুততম মানব হয়েছিলেন প্রয়াত শাহ আলম । যে ধারা বজায় রাখেন বিমল চন্দ্র তরফদার ১৯৯১ দক্ষিণ এশীয় গেমসে ১০০মিটার স্প্রিন্টে স্বর্ণ পদক জিতে । এই বিমল নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন স্বৈরাচার খ্যাত এরশাদের আমলেই ।

এরশাদ নিজেও ছিলেন ক্রীড়াবিদ । তার গলফের প্রতি ভালবাসার কথা সবাই জানে । এরশাদের শাসনামলে বাংলাদেশে নিয়মিত হয়েছে বিভিন্ন গলফ আসর । যেখানে এরশাদ খেলেছেন নিয়মিত ।

এখানে একটা কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য , যে কোন দেশের খেলাধুলার উন্নতি নির্ভর করে সরকারের সুযোগ সুবিধার উপর । আজ যেমন সরকারী পর্যায়ে সর্বোচ্চ সহায়তা পেয়ে ক্রিকেট উঠছে উন্নতির শিখরে । কিন্তু এরশাদ আমলে লক্ষণীয় বিষয় ছিল , সব খেলার প্রতি সমান মনোযোগ । ১৯৮৫ সালে ঢাকায় এশিয়া কাপ হকির আসর বসিয়ে তিনি দেন চমক । যেখানে বাংলাদেশের দারুণ পারফর্মেন্সে সৃষ্টি হয় হকির জোয়ার । পরবর্তী সময়ে যা ধরে রাখা যায় নি ।

এরশাদ আমলে দেশের প্রতিটা খেলাধুলার ফেডারেশন ছিল শক্তিশালী আর দক্ষ । যে কারণে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়েছে ফুটবল , ক্রিকেট , হকি , ব্যাডমিন্টন , দাবার লীগসহ অন্যান্য সব প্রতিযোগিতা । ঢাকার বাইরে খেলাধুলা ছিল নিয়মিত । আর সেটা সম্ভব হয়েছে তৎকালীন সরকারের খেলাধুলার প্রতি ভালবাসার কারণে । যার নেতৃত্বে ছিলেন এরশাদ ।

এরশাদকে অনেকেই হয়ত ‘স্বৈরাচার শাসক’ হিসেবে ভুলে যেতে চাইবে । কিন্তু সত্যিকার অর্থে একটি দেশের খেলাধুলার ক্ষেত্রে স্বৈরাচার সরকার যেমন অবদান রাখতে পারে , গনতান্ত্রিক সরকার সেই হিসেবে সফলকাম হয় না । যেমন- একটা সময়ে রোমানিয়া , হাঙ্গেরি , চেকোস্লোভাকিয়া কিংবা রাশিয়া ছিল বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের প্রতিষ্ঠিত শক্তি । কিন্তু সেটা কখন ? যে সময়ে তাদের দেশে স্বৈর-শাসন চলছিল ।

এই কথার মানে কিন্তু স্বৈর-শাসনকে সমর্থন করা নয় । বরং স্বৈর-শাসক সবক্ষেত্রে খারাপ , এমন ধারণার বিপরীতে কিছু ভালো দিক তুলে ধরার প্রয়াস । আমাদের এরশাদের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য । তার অনেক দোষত্রুটি থাকতে পারে । কিন্তু একজন প্রকৃত ক্রীড়াপ্রেমী হিসেবে বাংলাদেশের খেলাধুলার উন্নতিতে তার যে ব্যাপক অবদান আছে , সেটা অস্বীকার করা যাবে না ।

আহাস/ক্রী/০০৫