Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

গেইল আসলে কে ?

ক্রীড়ালোক প্রতিবেদকঃ

সাদা পোশাকে তাঁরা আবৃত। দুই বন্ধু ব্যাট চালাচ্ছেন। বিপক্ষ দলের বোলারেরা একটু ভীত। দুই বাঁহাতির দুর্দান্ত সব শট।  উপভোগে স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শকেরা। অতি অবশ্যই টিভি সেটের সামনে দর্শকেরাও। হঠাত করেই একজনের সেঞ্চুরি হয়ে গেল। ব্যাট উঠিয়ে বুনো উল্লাসে তিনি মাতেন নি। মেতেছে নন স্ট্রাইকিং এ থাকা অপর বন্ধু। নাম তাঁর ওয়াভেল হাইন্ডস। বন্ধু গেইলের জন্য কি না করছে সে ! মাঠে থাকা দর্শক, ধারভাষ্যকার এবং টিভি সেট কেন্দ্রিক দর্শকেরা ভাবছেন, এমন কেন করছে? এবার গেইলও উচ্ছ্বাসে ভাসলেন। ছুটে গেলেন আরেক বন্ধু মারলন স্যামুয়েলেসের কাছে। তিনি আবার দলের স্কোয়াডেই নেই। দর্শকের সারিতে বসে আছেন। এমন ব্যতিক্রমি উৎযাপনে তিন বন্ধু। ক্রিস গেইলের জীবনের প্রথম সেঞ্চুরি। হয়তো সে কারণেই বন্ধুরা জানতো, ক্রিস এসছে বিশ্বকে শাসন করতে। সেটির শুরুর জন্য অন্যভাবেও হোক সব কিছু। কারণ, সে কঠোর শাসক। কঠোর সেই শাসনের গল্প শোনাতে মহাকাব্য রচনার মত করেই ধারাভাষ্যে যেতে হবে। আপাতভাবে তাই, তিনি কেমন ছিলেন ও আছেন, এগোন যাক।


ক্রিস্টোফার হেনরি গেইল, ক্রিকেটে এক ধ্রুবতারার নাম। বোলারদের কাছে যিনি রীতিমতো যমদূত। শুধু ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জেই নয়—- নিজের ক্রিকেটীয় সামর্থ্যের জানান দিয়েছেন পুরো ক্রিকেট দুনিয়ায়। বিশ্বের প্রায় ৭টি দেশে টি-টুয়েন্টি আসরে হচ্ছে। দলে ভিড়াতে কাড়ি কাড়ি টাকা নিয়ে ক্রিস গেইলের দরজায় ধরনা দেয় তখন ফ্র্যাঞ্জাইজিগুলো। কথা রাখেন গেইলও। ব্যাট হাতে চার ছক্কার ফুলঝুরিতে ঝড় তোলেন ২২ গজে।


এদিকে ‘ইউনিভার্সাল বস’ এর অতীতটা ছিলো রঙচটা। থাকতেন একটা টিনের ঘরে। খাবারের জন্য কুড়াতেন পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল। সূত্রমতে, অর্থের অভাবে একবার চুরিও করেছিলেন!

১৯৭৯ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর জ্যামাইকার কিংস্টন- এ এক হতদরিদ্র পরিবারে গেইলের জন্ম। বাবা ডুডলি গেইল ছিলেন পেশায় একজন পুলিশ। তারা ছিলেন মোট ছয় ভাইবোন। তার মায়ের ছিলো দুইটি বিয়ে। ক্রিস গেইল ছিলেন পিতা মাতার পঞ্চম সন্তান। তবে বাবা পুলিশ হলেও তাদের মাঝেমধ্যে অনাহারে থাকতে হতো। দুবেলা-দুমুঠো মুখে তুলতে কষ্ট হত। অনেক সময় ধরনা দিতে হতো প্রতিবেশিদের দরজায়। কখন পার্কে বাদাম ও বাচ্চাদের খাবার জিনিস বিক্রি করতেন। এমন শেকড় থেকে জন্ম নেয়া ক্রিস গেইল আজ ক্রিকেট দুনিয়ার সর্বকালের সেরা অন্যতম তারকা ক্রিকেটার।

গেইলের উত্থান স্থানীয় লোকাস ক্রিকেট ক্লাব থেকে। তার অসাধারন ব্যাটিং ধরণ দেখে তাকে ক্লাবে ভর্তি নেন। আর একসময় জ্যামাইকার নির্বাচকদের নজর কেড়ে সুযোগ পান অনূর্ধ্ব ১৯ দলে। সেখানে দুর্দান্ত পারফর্মে ১৯৯৯ সালে একদিনের ম্যাচে জাতীয় দলের হয়ে খেলতে নামেন।


জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২০০০ সালের ১৬ মার্চ সাদা পোশাকে মাঠে নামেন গেইল। ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট দলে নেতৃত্ব দিয়েছেন ক্রিস গেইল। ১৮২ ইনিংসে করেছেন ৭২১৪ রান। ১৫ শতক আর অর্ধ শতক ৩৭ টি। দলের হয়ে খেলেছেন সর্বোচ্চ ৩৩৩ রানের ইনিংস। বল হাতেও কম যান নি গেইল। ৯৭.৩৮ স্টাইকরেটে নিয়েছেন ৭৩ উইকেট। গেইল ট্রিপল সেঞ্চুরি করবার পরেই জানান দেন, ক্যারিবিয়ান বোর্ড ঠিক থাকলে আমি একাধিক বড় ইনিংস খেলবার প্রয়াসে যাব। কিন্তু, তাঁর মত করে কিছুই হয় নি। ডিসিপ্লিন না থাকার দরুন, গেইলকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ কার্যত কাজে লাগাতে পারেনি। অভিমান তাই গেইলেরও ছিল ও আছে।


একদিনের ক্রিকেটে ২৯৪ ম্যাচ খেলে করেছেন ১০৪৮০ রান। শতক ২৫টি আর অর্ধশতক ৫৪টি। ৩৭.৮৩ এভারেজে গেইলের সর্বোচ্চ ইনিং ২১৫ রানের। বল হাতে নিয়েছেন ১৭ উইকেট। অধিনায়ক হিসেবে তিনি ৩০ ম্যাচে ১৭টিতে জয়ের দেখা পান। ব্রায়ান লারা’র পর দ্বিতীয় ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান হিসেবে ক্রিস গেইল একদিনের আন্তর্জাতিকে ৯,০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন গেইল।


অন্যদিকে ২০০৬ সালে ক্রিকেটের ক্ষুদ্রতম সংস্করণ টি টুয়েন্টিতে শুরু হয় তার স্বর্ণময় যুগ। এরপরে কেটে গেছে দীর্ঘ ১৪ বছর। ব্যাট হাতে বোলারদের বিপক্ষে ছড়ি ঘুরিয়ে করেছেন দুর্দান্ত সব রেকর্ড। টি টুয়েন্টি ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ২০টি শতক একমাত্র গেইলের নামের পাশেই এখনও শোভা পাচ্ছে। এছাড়া সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত রান ও বাউন্ডারি আর দ্রুততম শতকের রেকর্ডটি তার ঝুলিতে পোরা।

জাতীয় দলের হয়ে টি টুয়েন্টিতে ৫৪ ম্যাচে ৩২.৫৪ এভারেজে গেইল করেছেন ১৬২৭ রান। দুইটি শতক আর ১৩টি অর্ধশতক বাদেও বল হাতে নিয়েছেন ১৭ উইকেট। অধিনায়ক হিসেবে গেইল বেশ সফল। ১০টি ম্যাচে জয় পেয়েছেন ৭টি তেই! তবে ক্রিকেটের এই সংস্করনে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের হয়ে ১২৫ ম্যাচে ৬টি শতক আর ২৮টি অর্ধশতকে করেছেন ৪৪৮৪ রান। ৪১.১৪ এভারেজে ব্যাট করা গেইলের সর্বোচ্চ ইনিংস ছিলো ১৭৫ রানের। বল হাতে নিয়েছিলেন ১৮টি উইকেট।

ক্রিস গেইল ওরচেস্টারশায়ার কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাব, ওয়েস্টার্ন ওয়ারিয়র্স, বরিশাল বার্নার্স এবং কলকাতা নাইট রাইডার্স দলের পক্ষ নিয়ে খেলেছেন।
বর্তমানে তিনি ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগ বা আইপিএল ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের হয়ে খেলছেন। বিগ ব্যাশ লীগে গেইল সিডনি থান্ডার দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে জামাইকা দলে খেলছেন। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগে ঢাকা গ্লেডিয়েটর্স দলের অন্যতম ক্রিকেটার। এসব দলের হয়ে যা যা করেছেন তা করার ক্ষমতা অন্যদের হয়েছে বা হবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েই যায়।

বর্তমানে সময়ে বিভিন্ন ফ্রাঞ্জাইজি যেখানে অর্থ নিয়ে হাটু গেড়ে বসে পরে সেই গেইল এক সময় অর্থাভাবে কুড়িয়েছেন বোতল! তবে আধুনিকতার জাকজমকে ভোলেননি শৈশব। নিজের অর্থে ইংলান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজে গড়ে তুলেছেন ‘ক্রিস গেইল ক্রিকেট একাডেমি’।
গেইল আসলে কে ? কেন তিনি নিজেই একদিন নিজেকে ‘ইউনিভার্সাল বস’ বললেন ? যেখানে ব্র্যায়ান লারা, ভিভ রিচারডস কিংবা ডন ব্র্যাডমানেরা নিজেদেরকে নিয়ে মেতে থাকেন নি । গেইল জানে তাঁর সামর্থ্য সকলের চেয়েই বেশি ছিল। টেস্ট ক্রিকেট থেকে ওয়ান ডে ক্রিকেট— দুই ভার্সনেই তিনিও সফল ছিলেন। ক্যারিবিয় ক্রিকেট বোর্ড ও তাঁদের প্রজন্মের কারোর সাথেই বনিবনা না হওয়া স্যামি, মারলন, ব্র্যাভো, রাসেলেরা তাই জিদ করেই বিশ্বকে মাতায়। গেইলও সেই সড়কের প্রথম পথিক, অন্যরা পরে এসছে। কিন্তু ক্রিকেটের প্রথম সুপারস্টার যদি ডন ব্র্যাডম্যান হন, তিনি কি গেইলের মত তিন ভার্সনেই ক্রিকেট খেলেছিলেন? তিনি কি গেইলের চেয়ে আক্রমনাত্মক ব্যাটসম্যান ছিলেন ? না, তেমন করে স্বপ্ন দেখাও পাপ হবে। তিন মোড়লের এক মোড়ল তাই ব্র্যাডমানকে নিয়ে মিডিয়াতে আজীবন মাতলেও ক্রিকেট শুধু এক ভার্সনের খেলা নয়। প্রজন্মকে ধরে রেখেই আজ তিন উপায়েই তো খেলা হচ্ছে। অন্যদিকে তাঁর স্বদেশী ভিভ কিংবা লারাকে নিয়ে মিডিয়ার আগ্রহ কখনই কম ছিল না। গেইল এখানেই দুঃখ পেয়েছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, ভিভ কি আমার চেয়েও অতি ভয়ংকর ছিল কিনা ? লারাকে নিয়ে গেইলের আক্ষেপ নেই, কারণ, লারার সামর্থ্য ও খেলার আদলটা তাঁর সঙ্গে কখনই মিল হয় না, হবেও না। লারা একজন শিল্পী, সেই শিল্পী টি-২০ ফরম্যাটে সেভাবে মানিয়ে নিতে পারেনি। সেখানেই গেইল বলে উঠেছেন, তাহলে সর্বকালের বস টা কে ? আমিই ! এটিই আমার পরিচয় ! ‘ইউনিভার্সাল বস’ !


নিহে/ক্রী/০০১