Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

ইউর্গেন ক্লপস এখন রুপকথার নায়ক

ক্রীড়ালোক প্রতিবেদকঃ

একটা সময় ইংল্যান্ডের ফুটবলে সেরা ক্লাব ছিল লিভারপুল এফসি । নব্বই দশকের আগ পর্যন্ত বলা চলে , ইংল্যান্ডের ফুটবলে ছিল লিভারপুলের একক আধিপত্য । কিন্তু নব্বইয়ের পর ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ ফুটবল চালুর পর থেকেই একদিকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের নবজাগরণ আর আর্সেনাল , চেলসি এবং হালের ম্যানচেস্টার সিটির দাপটে ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে শুরু করে লিভারপুল । বনেদিয়ানা নিয়ে ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে দাপট থাকলেও বিস্ময়করভাবে ইংল্যান্ডের ঘরোয়া লীগে লিভারপুল পরিনত হয় এক দুর্ভাগা দলে ।

অথচ ইংলিশ লীগের বিবেচনায় লিভারপুল এখনও ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় সেরা সফল দল । ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড যেখানে ২০ বার লীগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে , সেখানে এই মৌসুমের আগ পর্যন্ত লিভারপুল লীগ শিরোপা জিতেছিল ১৮বার । কিন্তু অবাক করা তথ্য হচ্ছে , ১৯৮৯-৯০ মৌসুমের পর লিভারপুল আর কখনই লীগ চ্যাম্পিয়নের মর্যাদা পায় নি । এমনকি ১৯৯২-৯৩ মৌসুমে প্রিমিয়ার লীগ প্রবর্তনের পর তারা কখনই শিরোপা পায় নি ইংল্যান্ডের ঘরোয়া আসরে । সব মিলিয়ে লীগ চ্যাম্পিয়ন হবার আনন্দ কা’কে বলে সেটা জানার সুযোগ পায় নি লিভারপুলের নতুন প্রজন্মের সমর্থকরা । আর বয়স্ক সমর্থকরা ত্রিশ বছর শুধু তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছেন স্মৃতি-রোমন্থন করে ।

তার মানে এই না যে , লিভারপুল দল হিসেবে ফেলনা হয়ে গিয়েছিল । ১৯৯০ সালের পর থেকে চারবার তারা দ্বিতীয় হয়ে শেষ করে লীগ মৌসুম । আর ২০১৮-১৯ সালে তো ৯৭ পয়েন্ট নিয়েও চ্যাম্পিয়ন হতে পারে নি অল রেডরা । ৯৮ পয়েন্ট নিয়ে ম্যান সিটি বাজীমাৎ করে আগের মৌসুমে । অথচ সেই সময়েই তারা জয় করে ইউরোপের সবচেয়ে বড় ক্লাব ফুটবলের আসর উইয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ । তারও আগে ২০১৫ সালেও লিভারপুল জিতেছিল চ্যাম্পিয়ন্স লীগ । কিন্তু ধরা দিচ্ছিল না শুধু প্রিমিয়ার লীগের সেরার সম্মান ।

গেলো মৌসুমে একটুর জন্য ব্যর্থ হওয়া লিভারপুল সমর্থকরা হয়ত ভাবতেই শুরু করেছিলেন , আর বুঝি প্রিমিয়ার লীগ অভিশাপ থেকে বেরিয়ে আসা হচ্ছে না তাদের প্রিয় দলের । বারবার আশাভঙ্গের বেদনা নিয়েই বুঝি শেষ করতে হবে লীগ মৌসুম ।

কিন্তু না , ২০১৯-২০ মৌসুমে শেষ হয়েছে লিভারপুলের আক্ষেপ । একের পর এক রেকর্ড গড়ে তারা প্রথমবারের মত জিতেছে প্রিমিয়ার লীগ । আর সব মিলিয়ে ১৯তম লীগ শিরোপা । রেকর্ড সাত ম্যাচ হাতে রেখে শিরোপা জয় নিশ্চিত করায় বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সারারাতব্যাপি লিভারপুল শহরে চলেছে আতশবাজি ফুটিয়ে সমর্থকদের উল্লাস । ত্রিশ বছরের অপেক্ষার অবসান হওয়ায় বাঁধ ভেঙ্গেছে সমর্থকদের উল্লাসের জোয়ার ।

লিভারপুলকে তিন দশক পর লীগ শিরোপা এনে দিয়ে ‘রুপকথার নায়ক’ বনে গেছেন ইউর্গেন ক্লপস । এই জার্মান ভদ্রলোকের হাত ধরেই যে একক আধিপত্য দেখিয়ে প্রিমিয়ার লীগের শিরোপা ঘরে তুলেছে লিভারপুল । ১৮ বছর আগে পাঁচ ম্যাচ বাকি থাকতে শিরোপা জিতেছিল স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড গড়ল ক্লপসের লিভারপুল সাত ম্যাচ বাকী থাকতে শিরোপা জিতে ।

লীগ শিরোপা জয়ের পথে কত না রেকর্ড জন্ম দিয়েছে লিভারপুল । ইউরোপের সেরা পাঁচ লীগে প্রথম ২১ ম্যাচে ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী পয়েন্ট পাওয়ার রেকর্ড গড়ে অল রেডরা । ১১ জানুয়ারি টটেনহামকে হারাবার পর ২১ ম্যাচে তারা পেয়েছিল ৬১ পয়েন্ট । টটেনহামের বিপক্ষে পাওয়া ওই জয় প্রিমিয়ার লিগে সর্বশেষ ৩৮ ম্যাচে রেকর্ড ১০৪ পয়েন্ট এনে দেয় লিভারপুলকে। এর আগে টানা ৩৮ ম্যাচে সর্বোচ্চ ১০২ পয়েন্ট পেয়েছিল ম্যানচেস্টার সিটি ও চেলসি।

এছাড়া গত মৌসুম মিলিয়ে এই মৌসুমে টানা ২৩ হোম ম্যাচে জয়ের রেকর্ড গড়ে লিভারপুল । ২০১১–১২ মৌসুমে ঘরের মাঠে টানা ২০ ম্যাচ জিতেছিল ম্যানচেস্টার সিটি। শুধু কি তাই ? ক্লাবের ১২৭ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম শীর্ষ লিগের বাকি ১৯টি দলকেই হারিয়েছে লিভারপুল। আর লিভারপুলের এসব সাফল্যই এসেছে ক্লপসের নিবিড় পরিচর্যা এবং তুখোড় পরিকল্পনায় ।

অথচ ২০১৫ সালের অক্টোবরে ব্রেন্ডন রজার্সের জায়গায় দায়িত্ব পাওয়া ক্লপসের লিভারপুল লীগ শেষ করে অষ্টম হয়ে । পায় নি চ্যাম্পিয়ন্স লীগে খেলার সুযোগ । এমনকি ২০১৯ সালের আগ পর্যন্ত দলকে কোন শিরোপাই এনে দিতে পারেন নি ক্লপস । যদিও প্রতি মৌসুমে তাঁর দলের খেলায় উন্নতি ছিল স্পষ্ট । পরের দুই লীগে চতুর্থ হয়ে শেষ করে ক্লপসের লিভারপুল । এছাড়া ২০১৬ সালে উইয়েফা ইউরোপা লীগের ফাইনালে ওঠে ক্লপসের শিষ্যরা । সেবার ফাইনালে স্পেনের সেভিয়ার কাছে হারতে হয়েছিল অল রেডদের । আবার ২০১৮-১৮ মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনালেও রিয়েল মাদ্রিদের কাছে হেরেছিল লিভারপুল ।

ক্লপসের লিভারপুল চূড়ান্ত সাফল্য পাওয়া শুরু করে ২০১৮-১৯ মৌসুমে । একাধারে দলটি জয় করে নেয় উইয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ , উইয়েফা সুপার কাপ আর ফিফা বিশ্ব ক্লাব কাপ । কিন্তু এক পয়েন্টের জন্য লীগ শিরোপা না পাওয়ার বেদনায় ঠিকই নীল হয় সমর্থকরা । যা ভুলতে সময় লাগল আরও এক বছর ।

ক্লপসের জন্য লীগ শিরোপা এটাই প্রথম নয় । ২০১০-১১ আর ২০১১-১২ মৌসুমে টানা দুইবার তিনি বুরুশিয়ার হয়ে জিতেছেন জার্মানির বুন্দেস লীগা । তিনবার তিনি জার্মানির বর্ষসেরা কোচ হয়েছেন । জিতেছেন একবার করে ইংল্যান্ড , ফিফা , ব্যালন আর উইয়েফার বর্ষসেরা কোচের খেতাব ।

তবে সব কিছু ছাপিয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ শিরোপা জয়েই বুঝি বেশী স্বস্তি পাবেন ক্লপস । পেশাদার ফুটবল শুরুর আগে (১৮৯২ থেকে ১৯৯২ সাল ) ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ ফুটবল প্রতিযোগিতা ছিল প্রথম বিভাগ লীগ , যা লিভারপুল ১৮ বার জিতে একক জয়জয়কারের নিশান উড়িয়েছিল । কিন্তু পেশাদার প্রিমিয়ার লীগের যুগে সেই দলকেই ধুঁকতে দেখেছে সবাই । একটি শিরোপার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে ত্রিশ বছর । সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছেন ক্লপস । সমর্থকদের কাছে তাই তিনি এখন সাক্ষাৎ দেবদূত ।

লীগ শিরোপা  জয়ের পর উল্লসিত ক্লপস জানিয়েছেন , ‘  এই সাফল্যের স্বপ্ন  অনেকদিন ধরে দেখছি । আমার দলের খেলোয়াড়সহ সকলের অক্লান্ত পরিশ্রমে শেষ পর্যন্ত আমরা সফল হয়েছিল । এই সাফল্য দলের  সকলের  । ‘ 

আহাস/ক্রী/০০২